ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

কোরআন চর্চা শুরু হোক সকাল-সন্ধ্যায় প্রতি মসজিদে

আমি যাদের কিতাব দান করেছি, তাদের যারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে (যত গুরুত্বের সঙ্গে তা পাঠ করা উচিত), তারাই এতে বিশ্বাস স্থাপন করে। আর যারা তা প্রত্যাখ্যান করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।— (২.১২১)
যারা মুমিন, তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে হক (কোরআন) অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় ভক্তিবিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? এবং যাদের আগে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারা যেন তাদের মতো না হয়—তাদের ওপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হলো, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেল। তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী।— (৫৭.১৬)

তারা কি কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ? (৪৭.২৪) উড় ঃযবু হড়ঃ ঃযবহ বধত্হবংঃষু ংববশ ঃড় ঁহফবত্ংঃধহফ ঃযব ছঁত্থধহ, ড়ত্ ধত্ব ঃযবত্ব ষড়পশং ড়হ ঃযব যবধত্ঃং?

যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর জিকির (কোরআন) থেকে অন্ধ সাজে, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি, অতঃপর সে-ই তার সঙ্গী হয়ে যায়। শয়তানরাই মানুষকে সত্ পথ হতে বিরত রাখে, অথচ মানুষ মনে করে যে, তারা সত্পথে রয়েছে। — (৪৩.৩৬-৩৭)

আল কোরআনের সঙ্গে সদাসর্বদা সম্পৃক্ত থাকা; সর্বশেষ ও চূড়ান্ত এই আসমানি বাণীর প্রতিটি আয়াত, তাতে উল্লেখিত শব্দ সব ব্যাপ্তিতে পড়া, তার মর্ম অনুধাবন করা, তার সত্য-সৌন্দর্য আর রঙে জীবনকে রাঙিয়ে তোলা; আল্লাহর কিতাব বা রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করা ও বিচ্ছিন্ন না হওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি নানা আঙ্গিকে এরকম বহু আয়াতে উদ্ধৃত হয়েছে। কোরআনে ব্যবহৃত ‘হক’, ‘জিকির’ বলতে অনেক ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনকেই বোঝানো হয়েছে।

পৃথিবীতে স্রষ্টার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করণার্থে তাই সব শুভ কাজের অত্যন্ত মৌলিক ও সবচেয়ে গোড়ার কাজ আল কোরআনের ধারাবাহিক চর্চা শুরু হোক বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে সকাল-সন্ধ্যায়, প্রতিটি দিন, প্রতিনিয়ত এবং বিরামহীন। যেমন ফজরের সালাত শেষে যদি সুরা বাক্বারার প্রথম রুকু (বা এর সমপরিমাণ) পড়া হয়, তবে মাগরিব বা এশার সালাত শেষে সকালে পঠিত প্রথম রুকু ফের একবার মশক ও আলোচনা করে দ্বিতীয় রুকু পড়া হবে। পরবর্তী ফজরের সালাত বাদ অনুরূপ দ্বিতীয় রুকুর মশক ও আলোচনা করে তৃতীয় রুকু পড়া হবে। এভাবে শুক্রবার সন্ধ্যা হতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পঠিত রুকুর আয়াতগুলো শুক্রবার সকালে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘসময় নিয়ে পুনরালোচনা করা। একই প্রক্রিয়ায় কোরআনের ধারাবাহিক পাঠ চালু রাখা।

এর জন্য একটা প্রোগ্রামসূচি বানিয়ে নেয়া যেতে পারে। এতে কখন কোন রুকু পড়া হবে, তা পূর্বঘোষিত থাকবে, তাই আগ্রহী সবাই তার সাধ্যমত অধ্যয়ন করে কোরআনশিক্ষার এ অংশগ্রহণমূলক আসরে বসবে—যাতে ব্যয়িত সময়ের কার্যকারিতা সর্বাধিক এবং তা প্রাণবন্ত হয়। কেউই সেখানে অলস শ্রোতা হবে না, বরং সবাই হবে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

আল্লাহর ঘরে আসা মুসল্লিদের কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে মসজিদের ইমাম সাহেবরা বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার মধ্যেই এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। আমজনতার কাছে কোরআনের আলো ছড়িয়ে দিতে প্রতিনিয়ত এ চর্চা তাদের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে সম্মানিত মুসল্লিরা কোরআন শেখার প্রতি অপরিসীম আগ্রহ, উপস্থিতি এবং চেষ্টা-সাধনা প্রদর্শনের মাধ্যমে ততোধিক বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রয়োজনটা যতটা না ইমাম সাহেবের, তারচেয়ে অনেক বেশি তাদের; সুতরাং গরজ ও তাগিদটা তাদের পক্ষ থেকেই আসতে হবে।

উপস্থিত মুসল্লিদের বিভিন্নতাভেদে আলোচনার ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য থাকতে পারে, যাতে সবার চাহিদা পূরণের দিকে মোটামুটি ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। একটি আয়াত তেলাওয়াত করে তার বিশুদ্ধ পাঠের প্রয়োজনে যেমন অনেকবার মশক করা দরকার; একইভাবে আয়াতের অর্থ, ব্যাখ্যা, আলোচ্য রুকুর বিষয়ের সঙ্গে আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক জানাও প্রয়োজন। আয়াতের মর্ম আয়ত্ত করতে এতে উল্লেখিত শব্দ, বাক্যবিন্যাস, কোরআনের ভাষাভঙ্গি, ব্যাকরণ ও অলঙ্কার ইত্যাদি নিয়েও মাঝে মধ্যে আলোচনা হতে পারে। কোরআনের অনেক শব্দই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানা শব্দের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। শব্দমূল বা ক্রিয়ামূল (ইসম, মাছদার) উল্লেখ করে তার ব্যবহারগত সাযুজ্য ধরিয়ে দিতে পারলে যে কোনো কোরআনের পাঠক তাতে ব্যাপক উত্সাহ বোধ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতে ওই শব্দের অর্থ মনে রাখা তার জন্য সহজ হবে। পবিত্র কোরআনের সঙ্গে হৃদ্যতা বাড়বে, গভীর মমতা তৈরি হবে।

কোরআনের এই নিত্য অধ্যয়ন দিনে দিনে বোদ্ধা ও সমঝদার মুমিন-মুসলমান তৈরিতে বাস্তব ভূমিকা পালন করবে। আল কোরআনের নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের মাধ্যমেই এই মহিমান্বিত গ্রন্থের, আসমান-জমিনের একমাত্র নির্ভুল দলিলের ‘হাক্কা তিলাওয়াত’ বা ‘যথাযথ পাঠে’র হক কিছুটা আদায় হতে পারে, আর কেবল সেক্ষেত্রেই আমাদের ইমান-আমল পরিশুদ্ধ হওয়ার অবকাশ পাবে।

আল কোরআন সংলিপ্ততার এই ধারাবাহিকতায় আমরা তথা গোটা মানবজাতি ইহকাল-পরকালে কোরআনুল কারিমের পূর্ণ নেয়ামত লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হব ইনশাআল্লাহ।