ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

কোরবানির মাসয়ালা

কোরবানি ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। কুরআন ও হাদিসে এর ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। মিশকাত শরিফের হাদিসে বর্ণিত আছে, একদা হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম রা: রাসূলে করিম সা:-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা:, কোরবানি কী? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করলেন, কোরবানি হচ্ছে তোমাদের আদি পিতা হজরত ইবরাহিম আ:-এর জীবনাদর্শ। সাহাবি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, কোরবানির ফজিলত কী? রাসূল সা: বললেন, পশুর পশমের পরিবর্তে একেকটি করে নেকি দেয়া হয় (মিশকাত শরিফ : ১/১২৯)।

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সা: পবিত্র মদিনায় দশ ১০ বছর জীবনযাপন করেছেন। প্রত্যেক বছরই তিনি পশু কোরবানি করেছেন (তিরমিজি শরিফ : ১/১৮৯)।
রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই কোরবানিদাতার কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায় এবং তার অতীতের সব গুনাহ মোচন করে দেয়া হয় (তিরমিজি শরিফ : ১/১৮০)।

কোরবানির মাসায়িল : ঢালাওভাবে সবার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। শুধু নেসাব পরিমাণ মালের মালিকের ওপর কোরবানি ওয়াজিব।

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব :

১. ঈদুল আজহার দিন প্রয়োজনীয় খরচ ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপা কিংবা সমপরিমাণ সম্পদ যার কাছে থাকবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ মাল পূর্ণ এক বছর থাকা জরুরি নয়, কোরবানির শেষ দিন সূর্যাস্তের আগেও যদি কেউ নেসাব পরিমাণের মালিক হয়, তাহলে তার ওপরও কোরবানি ওয়াজিব।

২. জীবিকা নির্বাহের জন্য যে পরিমাণ জমি ও ফসলের দরকার তা থেকে অতিরিক্ত জমি ও ফসলের মূল্য অথবা যেকোনো একটির মূল্য নেসাব পরিমাণ হলেও কোরবানি ওয়াজিব।

৩. একই পরিবারের সব সদস্য পৃথক পৃথকভাবে নেসাবের মালিক হলে সবার ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব।

৪. কোনো উদ্দেশ্যে কোরবানির মানত করলে সে উদ্দেশ্য পূর্ণ হলেও কোরবানি করা ওয়াজিব। অতএব প্রত্যেক স্বাধীন, ধনী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক নর-নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব।

কোরবানির পশু ও বয়স : ইসলামি শরিয়তে গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা, উট কোরবানি করাকে বৈধতা দান করেছে। তবে ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক ব্যক্তির প থেকে আদায় করা চলবে কিন্তু গরু, মহিষ, উট সাত ব্যক্তি শরিক হতে পারবে। শর্ত একটাইÑ শরিকদার সবার নিয়ত বিশুদ্ধ থাকতে হবে।
এদের মধ্যে একজনেরও যদি লোক দেখানো বা গোশত খাওয়া উদ্দেশ্য হয় তাহলে কারো কোরবানি কবুল হবে না।

ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, এক বছর বয়সী হওয়া আবশ্যক। তবে যদি ছয় মাসের দুম্বা ও ভেড়া এরূপ মোটাতাজা হয় যে, দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে ওই ভেড়া ও দুম্বা দিয়ে কোরবানি করা যাবে। আর ছাগল যত বড়ই হোক না কেন এক বছর পরিপূর্ণ হওয়া জরুরি, একদিন কম হলেও কোরবানি জায়েজ হবে না। গাভী, মহিষ দুই বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি। উট পাঁচ বছরের হওয়া জরুরি, একদিন কম হলেও কোরবানি হবে না। কোরবানির জন্য মোটা, তরতাজা, সুস্থ পশু হওয়া আবশ্যক। আতুর ল্যাংড়া, কানা, কানকাটা, লেজকাটা, দুর্বল পশু দিয়ে কোরবানি বিশুদ্ধ হবে না।

কোরবানির দিন : কোরবানি তিন দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কোরবানির দিন হলো ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ। এ তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দিন কোরবানি করা জায়েজ আছে। তবে উত্তম দিন হচ্ছে প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ। কোনো কারণ ছাড়া বিলম্ব না করা ভালো।

কোরবানির সময় : জিলহজের দশম দিন ঈদের নামাজ পড়ার পর থেকে জিলহজের ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। তবে ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা যাবে না। ঈদের নামাজ পড়ে এসে কোরবানি করতে হবে। যদি শহরের একাধিক স্থানে ঈদের নামাজ হয় তাহলে যেকোনো এক স্থানে নামাজ আদায় হয়ে গেলে সব স্থানেই কোরবানি করা জায়েজ হবে।

জবেহ : কোরবানিদাতা নিজেও জবেহ করতে পারবে এবং কোনো আলেম তথা জানলেওয়ালা কাউকে দিয়ে কোরবানি করাতে পারবেন। তবে উত্তম হচ্ছে নিজের কোরবানি নিজে করা। মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে নিয়ত করা জরুরি নয়, বরং অন্তরের নিয়তই যথেষ্ট। জবেহ করার সময় অবশ্য অল্লাহর নাম নিতে হবে।

কোরবানির গোশত : কোরবানির গোশত নিজে খাবে এবং গরিব-মিসকিনদের খাওয়াবে। উত্তম পন্থা হচ্ছে গোশত তিন ভাগে ভাগ করা, এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে দান করা। এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেয়া এবং এক অংশ নিজ পরিবারের জন্য রাখা।

চামড়া : কোরবানির চামড়া নিজে ব্যবহার, অন্যকে হাদিয়া এবং কওমি মাদরাসার লিল্লাহ ফান্ডে দিতে পারবে। কিন্তু কোরবানির চামড়া বিক্রি করে কোনো মাদরাসার শিক, মসজিদের ইমামের ভাতা দেয়া যাবে না। বিক্রি করলে চামড়ার টাকা একমাত্র গরিব-মিসকিনকেই দান করতে হবে। সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে কওমি মাদরাসার গরিব ফান্ডে দান করা।

শেষ কথা : কোরবানি একটি উত্তম ইবাদত। এ ইবাদতও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া চাই। কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার নিকট কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত কিছুই কবুল হয় না, তবে আমার নিকট পৌঁছে একমাত্র তাকওয়া (হজ : ৩৭)।