ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

গিবত : জঘন্যতম অপরাধ

গিবত একটি সামাজিক অপরাধ। এ অপরাধের ক্ষতি অনেক দূর পর্যন্ত ব্যাপৃত। আজকাল খুব স্বাভাবিকভাবেই সমাজের সর্বত্র গিবত ছড়িয়ে যাচ্ছে। শুধু নারীরাই নয়, এ গিবত চর্চা পুরুষদের মাঝেও ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে যার মতো গিবত করে বেড়াচ্ছে—তা যেন কোনো পাপই নয়। অথচ গিবত একটি মারাত্মক অপরাধ এবং গোনাহের কাজ। আল্লাহপাক এ গিবতের অপকারিতা বর্ণনা করে তা ছেড়ে দিতে পবিত্র কোরআনের সূরা হুজরাতে নির্দেশ করেছেন।

মানুষ সাধারণত যখন অলস সময় কাটায়, হাতে কোনো কাজ থাকে না তখন তারা অন্যের সমালোচনা ও পরনিন্দা করে, পরের দোষ বলে বেড়ায়। অসাক্ষাতে দুর্নাম বা কারও দোষ বলাকে শরিয়তের পরিভাষায় গিবত বলে। অর্থাত্ কোনো মানুষের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা শুনলে সে মনে কষ্ট পায়, তাকেই গিবত বলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যার মধ্যে কোনো দোষ-ত্রুটি আছে তা অপরের কাছে তার অগোচরে বর্ণনা করাই গিবত।’ তিনি আরও বলেন, ‘তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলেই সেটা হবে গিবত। আর যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে, সে ক্ষেত্রে সেটা হবে বুহতান বা অপবাদ।’

সমাজে সুখ-শান্তিতে সবাই মিলেমিশে বসবাস করতে চায়। এ বসবাস চিরন্তন ও শাশ্বত করার লক্ষ্যে সমাজ থেকে গিবত পরিহার করতে হবে। গিবতের মতো অন্যান্য অপরাধ যেমন—পরনিন্দা, হিংসা-বিদ্বেষ, উপহাস, পরচর্চা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ইত্যাদি থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। কারণ এগুলো সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, উন্নতি-অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। সমাজকে বিনষ্ট ও ধ্বংস করে ফেলে।

গিবত সামাজিক শান্তি ব্যাহত করে। একজনের দোষ অন্যজনের কাছে বললে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট হয় এবং সেখানে শত্রুতা, হিংসা, অনৈক্য বিদ্বেষ ইত্যাদি দেখা দেয়। এর দরুন সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং সমাজে শান্তি বিনষ্ট হয়। তাই গিবতের কুফল বর্ণনা করে গিবত না করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের গিবত কর না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে পছন্দ করেন? বস্তুত, তোমরা তো একে ঘৃণাই কর’ (হুজরাত : ১২)।

গিবত অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি বদঅভ্যাস। অন্যের গিবত করা মৃত ভাইয়ের গোস্ত খাওয়ার শামিল। গিবতকারীকে সমাজে কেউ বিশ্বাস করে না। যে গিবত করে সে সমাজের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার সৃষ্টি করে। ফলে সমাজের কেউ তাকে বিশ্বাস করে না, ভালোবাসে না, বিপদে পড়লে কেউ এগিয়ে আসে না। বরঞ্চ সবাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। কোনো ব্যাপারে কেউ তার ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারে না। তাই গিবতের ব্যাপারে হজরত মোহাম্মদ (সা.) কঠোরভাবে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা গিবত কর না এবং তাদের দোষ অনুসন্ধান কর না। কারণ যে ব্যক্তি মুসলমানদের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন তাকে স্বগৃহেও লাঞ্ছিত করেন’ (কুরতুবি)।

গিবতকারী ব্যক্তি সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি। যিনি ভালো মানুষ তিনি সাধারণত অন্যের গুণ প্রকাশ করেন, দোষ বলে বেড়ান না। আর যারা খারাপ, নিকৃষ্ট মনের তারা অপরকে নিজেদের ন্যায় মনে করে। তারা অপরের কোনো গুণ প্রত্যক্ষ করতে সম্মত নয়। তারা কুত্সা করে বেড়ায় এবং সমাজের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে। এজন্য গিবতকারী কিয়ামতের দিবসেও অপমানিত হবে। তার জন্য রয়েছে সাংঘাতিক শাস্তি।

গিবতের কুফল বর্ণনা করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মিরাজের রাতে আমি কিছু লোককে দেখলাম, তাদের তামার নখ রয়েছে এবং তা দিয়ে তারা নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আচড়াচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেসব লোক যারা মানুষের গিবত করত এবং তাদের ইজ্জত-সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলত’ (আবু দাউদ)।

গিবত পরিহার করার জন্য ইসলামে কঠোর নির্দেশ রয়েছে। কেননা, এটা এমন একটা কুঅভ্যাস, যা মানুষের নেক আমলগুলো ধ্বংস করে দেয়। হাদিস শরিফে হজরত রাসুল (সা.) গিবতকে জ্বলন্ত কাঠের সঙ্গে তুলনা করে এ গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘আগুন যেমন কাঠ খণ্ডকে জ্বালিয়ে দেয়, হিংসা ও গিবত তেমনি নেকিগুলোকে জ্বালিয়ে দেয়।’ শুধু তাই নয়, এ গিবত এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যা প্রতিপক্ষের মাফ করে দেয়া ছাড়া মাফ হয় না। গিবতকারীর ইবাদত মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। রোজা রেখে গিবত করলে তাতে সওয়াব নষ্ট হয়। ফলে গিবত ইবাদতের মারাত্মক ক্ষতি করে। এতে বান্দার নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়। তাই মহানবী (সা.) মুমিনদের গিবত ত্যাগ করে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা গিবত করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না। পরস্পর কলহ-বিবাদ করবে না। হিংসা-বিদ্বেষ করবে না। অন্যের ক্ষতি সাধনে কৌশল অবলম্বন করবে না। তোমরা মহান আল্লাহর প্রকৃত বান্দা ও পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’

হজরত জাবেরের (রা.) বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, গিবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক গোনাহ। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিরূপে? তিনি বললেন, একব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়, কিন্তু যে গিবত করে তার গোনাহ প্রতিপক্ষের মাফ না করা পর্যন্ত মাফ হয় না (মাজহারি)। এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, গিবতের মাধ্যমে আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়ই নষ্ট করা হয়। তাই যার গিবত করা হয়, তার কাছ থেকে মাফ নেয়া জরুরি। কোনো কোনো আলেম বলেন, যার গিবত হয়, গিবতের সংবাদ তার কাছে না পৌঁছা পর্যন্ত বান্দার হক হয় না। তাই তার কাছ থেকে ক্ষমা নেয়া জরুরি নয় (রুহুল মায়ানি)।

গিবতের মধ্যে কোনো প্রতিরোধকারী থাকে না। নিচ থেকে নিচতর ব্যক্তি কোনো উচ্চতর ব্যক্তির গিবত অনায়াসে করতে পারে। এসব কারণে গিবতের নিষেধাজ্ঞার ওপর অধিক জোর দেয়া হয়েছে। সাধারণ মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য করা হয়েছে যে, কেউ গিবত শুনলে তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে সাধ্যানুযায়ী প্রতিরোধ করবে। প্রতিরোধের শক্তি না থাকলে কমপক্ষে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গিবত শোনাও নিজে গিবত করার নামান্তর। শিশু, উন্মাদ ও কাফের জিম্মির গিবতও হারাম। এ গিবত যেমন কথা দ্বারা হয়, তেমনি কর্ম ও ইশারা দ্বারাও হয়। তবে কোনো কোনো বর্ণনায় প্রমাণিত হয়, আয়াতে সব গিবতকেই হারাম করা হয়নি বরং কতক গিবতের অনুমতি আছে। যেমন—কোনো প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারও দোষ বর্ণনা করা জরুরি হলে তা গিবতের মধ্যে দাখিল নয়, তবে প্রয়োজন ও উপকারিতাটি শরিয়ত সম্মত হতে হবে।