ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

গুনাহের নগদ শাস্তি

আল্লাহ পাক বান্দাকে যা করতে বলেছেন তা না করা এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তা করা হলো গুনাহ। গুনাহ দু’ভাগে বিভক্ত। ১. কবিরা গুনাহ বা মারাত্মক পাপ, ২. ছগিরা গুনাহ বা লঘু পাপ। গুনাহ ছোট হোক বা বড় হোক এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, যা ক্রমান্বয়ে ব্যক্তি ও সমাজকে অস্থির করে তোলে এবং জাতির ওপর নেমে আসে নানা রকমের বিপদ-আপদ ও বিপর্যয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি প্রভৃতি মানুষের ওপর আপতিত এসব প্রাকৃতিক বিপদ মানুষের গুনাহের কারণেই এসে থাকে। এগুলো তাদের কৃতকর্মের কিঞ্চিৎ সাজামাত্র। আর আখেরাতে তাদের জন্য সীমাহীন শাস্তি অপো করছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অসহ্যকর। রাসূল সা: বলেন, ‘এই উম্মতের মাঝে ভূমিধস, আকৃতি পরিবর্তন, সলিল সমাধি হবে’। কোনো এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, তা কখন হবে? তিনি বললেন, ‘যখন এই উম্মতের মাঝে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপান ব্যাপক হবে’ (তিরমিজি)।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের গুনাহের কারণে স্থলে এবং জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, তাদের কোনো কোনো গুনাহের শাস্তি আল্লাহ আস্বাদন করিয়ে থাকেন, যেন তারা (গুনাহ থেকে) ফিরে আসে’ (সূরা রুম : ৪১)।

আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী অনেক উম্মতকে গুনাহের কারণে পাকড়াও করেছেন, উচিত শাস্তি দিয়েছেন, সমূলে ধ্বংস করেছেন বিভিন্ন আজাব-গজবের মাধ্যমে। তিনি কওমে নুহকে প্লাবন দ্বারা, কওমে আদকে প্রচণ্ড বাতাস ও ঘূর্ণিঝড় দ্বারা, কওমে সামুদকে পাথর দ্বারা ধ্বংস করেছেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘তাদের প্রত্যেককেই অপরাধের কারণে শাস্তি দিয়েছিলাম, তাদের কারো প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে আঘাত করেছিল বিকট শব্দ, কাউকে বিলীন করে দিয়েছি ভূগর্ভে, আবার কাউকে পানিতে নিমজ্জিত করেছিলাম। আল্লাহ তাদের প্রতি কোনো জুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল’ (সূরা আনকাবুত : ৪০)। 

বর্তমান যুগে গুনাহের দরুন নগদ শাস্তির জ্বলন্ত প্রমাণ আমরা নিজেরাই। বালা-মুসিবত, ভূমিকম্প, ভূমি ও বিল্ডিং ধসা, আগুন লাগা, সলিল সমাধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পাকা ধান শিলাবৃষ্টি ও পোকার মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যাওয়াসহ নানা বিপর্যয়ে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাইতি ও তুরুস্কে গজব নাজিলের ঘটনা দু’টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

হাইতিতে খোদায়ি গজব : ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতিতে ৭৩ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। গ্রিনিচমান সময় ২১:৫৩টায় এক মিনিট স্থায়ী এ ভূমিকম্পে রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্স লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী থেকে মাত্র ১০ মাইল দূরে। দুই শতাধিক বছরের মধ্যে হাইতিতে এটিই সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ ভূমিকম্প। এতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ মারা যায়। ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি হারানো প্রায় ১৩ লাখ মানুষ রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে তাঁবুর নিচে বাস করে। ঘূর্ণিঝড় ও বৃষ্টির কারণে সেখানকার অবস্থা খুব নাজুক হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া কলেরায় দেশটিতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং ছয় হাজার সাত শ’র চেয়ে বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। (যুগান্তর, ৭ নভেম্বর ২০১০)

এ দুর্ঘটনার দু-এক দিন পর তাদের ওপর খোদায়ি গজবের কারণও পত্রিকায় প্রকাশিত হয় যে, সে দেশে পাপ ব্যাপকহারে বেড়ে গিয়েছিল।

তুরস্কে খোদায়ি গজব : ১৯৯৯ সালের ১৭ আগস্টের শেষ রাতে তুরস্কের গোলকুক নৌঘাঁটিতে শুরু হয় বিকট শব্দ, গর্জন ও ধ্বংসলীলা। প্রথমে মানুষের কান্নার আওয়াজ শোনা গেলেও পরে তা মাটির গভীর থেকে উত্থিত বিকট শব্দে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয় একজন জানায়, এ শব্দ এতই বিকট ও ভয়ঙ্কর ছিল যে, আমাদের হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আমাদের কাছে তা কিয়ামতের আলামত মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। স্থানীয় এক গায়ক জানান, ভূকম্পের এ শব্দ এক মিনিট স্থায়ী হলে লোকজন কেবল এ বিকট শব্দেই মারা যেত। তারপর মাটি গরম হওয়া শুরু হয় এবং কোনো কোনো স্থানে গরম বাষ্প বের হতে থাকে। অতঃপর আকস্মিকভাবে সমুদ্রের তলদেশে ফাটল ধরে এবং সেখান থেকে ব্যাপকহারে আগুন বের হতে থাকে। তখন আকাশ কমলা রঙ ধারণ করে। গোটা এলাকা আলোকিত হয়ে যায়। তারপর সমুদ্র থেকে বের হওয়া আগুন গোলকুক শহরে অবস্থিত ৬২ মিটার দৈর্ঘ্য উপকূলীয় নৌঘাঁটির ওপর এসে পড়ে। সেই সাথে শুরু হয় প্রচণ্ড ভূমিকম্প। ৮৫ সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূকম্পে মারমারা সমুদ্রের ঢেউ ৩০-৪০ মিটার উঁচু হয়ে ব্যাপক ধ্বংস করে। এতে গোলকুক নৌঘাঁটিসহ উপকূল ও তার সংলগ্ন অর্ধকিলোমিটার সম্পূর্ণ  ধ্বংস হয়ে যায়।

এক খবরে বলা হয়, উপকূলীয় গোলকুক শহরের কিছু অংশ মারমারা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। মার্কিন এক ডুবুরি নৌঘাঁটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে সমুদ্রের তলদেশের এক শ’ মিটার গভীরে গিয়েও নৌঘাঁটির ধ্বংসাবশেষের কোনো চিহ্নমাত্র পায়নি।

তবে সে বেশ কিছু ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছে, অস্ত্রসহ গাছের কাণ্ড জড়িয়ে ধরা বরফে জমাট বাঁধা অবস্থায় একজনকে দেখতে পায়। তার চেহারা শূকরের মতো, চোখ দু’টি বড় বড় হয়ে বের হয়ে এক ভীতিকর রূপ ধারণ করে আছে। এ ব্যক্তির হাতে একটি মদের বোতলও আঁকড়ে ধরা ছিল।

আরেকজনের চোখ আগেরজনের মতোই। কিন্তু তার চেহারা বানরের মতো এক বীভৎস অবস্থা ধারণ করে আছে। এ লোকের হাতে তাস জড়ানো ছিল। 

এসব ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখে ডুবুরি নিজেই হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং বলে নৌঘাঁটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে সমুদ্রের তলদেশে আমি আর কখনো যাবো না। তাদের এ দুর্ভোগের কারণ ছিল পাপাচার ও অনাচার। এ নৌঘাঁটিতে ওই সময় চলছিল অশ্লীলতা ও নৃত্যানুষ্ঠান। সেখানে পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, সাধারণ সৈনিক, নিরাপত্তারী, পরিবেশক ও নর্তকীসহ প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি উপস্থিত ছিল। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে কুরআন শরীফ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে নর্তকীদের পায়ের নিচে ফেলে দেয়া হয় এবং দাম্ভিকতার সাথে বলা হয় যে, কোথায় সে, যে কুরআন নাজিল করেছে? কোথায় সে আল্লাহ? যে কুরআন হেফাজত করবেন। (নাউজুবিল্লাহ)

১৯৯৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে পাগড়ি, জুব্বা ও মেয়েদের জন্য হিজাব-বোরকা পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সে দেশের সরকার। অনেক মাদরাসা বন্ধ করে দেয়। ১৪ বছর বয়সের নিচের শিশুদের ইসলামি শিা নিষিদ্ধ করে। (সরেজমিন রিপোর্ট, দৈনিক সংগ্রাম ১৯, ২৭, ২৮, ২৯ জানুয়ারি ২০০০)

এ ছাড়াও আল্লাহ তায়ালা পাপিষ্ঠকে দুনিয়াতেই বিভিন্নভাবে শাস্তি দিয়ে থাকেন। যেমন-

১. ইলম থেকে বঞ্চিত হওয়া।

২. রুজির টানাটানি হওয়া।

৩. কাজকর্মে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া।

৪. অন্তর অপরিষ্কার থাকা।

৫. হায়াত কমে যাওয়া।

৬. তওবা নসিব না হওয়া।

৭. সৃষ্টিজীবের মাধ্যমে তি সাধন হওয়া।

৮. স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া।

৯. আল্লাহ রাসূলের অভিশপ্ত হওয়া।

১০. ফেরেশতাদের দোয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া।

১১. লজ্জা-শরম কমে যাওয়া।

১২. নিয়ামত ছুটে যাওয়া।

১৩. বালা-মুসিবতে পতিত হওয়া।

১৪. সব সময় পেরেশানিতে থাকা।

১৫. মৃত্যুকালে কালেমা নসিব না হওয়া

১৫. দেহ ও আত্মা দুর্বল হয়ে যাওয়া।

১৬. আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য হতে বঞ্চিত হওয়া প্রভৃতি।