ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

চাই নামাজ উপযোগী কোরআন শিক্ষা

ঈমানদার মুসলমান হলেও আমাদের অনেকে—১. যথাযথ সহিহভাবে কোরআন পড়তে জানেন না। শৈশবে শিখলেও পরবর্তীকালে নানাবিধ ব্যস্ততার কারণে না পড়ায় এখন মাঝে মধ্যে পড়লেও আগের মতো আর সহিহ-শুদ্ধ হয় না।

২. কোরআন আগে শিখলেও না পড়ার কারণে ভুলে গেছেন।

৩. ভুলে গেছেন মনে করে এখন আর কোরআন পড়েন না এবং সহিহ-শুদ্ধতা যাচাইয়ের ব্যাপারে কারও শরণাপন্নও হন না বা কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করেন না এবং

৪. এমনও অনেকে আছেন যারা কোরআন পড়া মোটেই শিখেননি, কোরআন পড়তেই জানেন না।

এ দেশের বেশিরভাগ মুসলমান শুনে শুনে নামাজ আদায়ের উপযোগী কিছু সূরা-কেরাত শিখে তা দিয়ে নামাজ আদায় করে তৃপ্তি লাভ করে থাকলেও সূরা-কেরাতগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের জন্য কাউকে শোনানোর প্রয়োজন মনে করেন না। অথচ নামাজ যথারীতি আদায় করলেও নামাজের মধ্যে কেরাত অশুদ্ধ পড়লে, সূরা অশুদ্ধ পড়লে যে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়, নামাজ হয় না, এটুকু তিনি জানার প্রয়োজনও মনে করেননি, কেউ হয়তো যথাযথ গুরুত্ব সহকারে তা তাকে জানায়নি। যারা সমাজসেবক হিসেবে সমাজসেবায় আর শিক্ষানুরাগী হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে কিছুটা হলেও অবদান রাখছেন, সমাজসেবার আর শিক্ষার অংশ হিসেবে কোরআনবিমুখ আর কোরআন শিক্ষা বঞ্চিত অসহায় ও হতভাগ্যদের ব্যাপারে সমাজসেবী আর শিক্ষানুরাগীদের, জনপ্রতিনিধিদের, বিভিন্ন পর্যায়ের প্রধানদের বিশেষ করে সরকারের ন্যূনতম কিছুই কি করণীয় নেই?

যারা অর্থ সম্পদের মালিক এবং ক্ষমতা কর্তৃত্বের অধিকারী তাদের সমাজসেবায় আর শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের পাশাপাশি ধর্মের ব্যাপারেও কাজ করতে হবে। কারণ স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির প্রয়োজনে দুনিয়ার কথা যেমনি বলেছেন, তেমনি বলেছেন আখেরাতের কথাও। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে বলে—হে আমাদের প্রভু! এ দুনিয়াতেই আমাদের দাও। বস্তুত আখেরাতে তার জন্য কোনো অংশ নেই। তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যে বলে, হে আমাদের প্রভু! এ দুনিয়াতে আমাদের কল্যাণ দাও এবং আখেরাতের কল্যাণও দাও আর আমাদের দোজখের আগুন থেকে রক্ষা কর। এদের জন্য অংশ রয়েছে এরা যা অর্জন করেছে তাতে’ (সূরা বাকারা : ২০০ থেকে ২০২ আয়াত)।

কাজেই ধর্মের জন্য, কোরআনের শিক্ষার জন্য, ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে, বিশেষ করে নামাজ সহিহভাবে আদায় উপযোগী শিক্ষায় সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, কর্মসূচি চালু করতে হবে। বিত্তশালী এবং কর্তৃত্বের অধিকারীরা ধর্মের ব্যাপারে ন্যূনতম কিছু কাজ না করলে শেষ পরিণতি হবে আফসোসের। আল্লাহর আগাম ঘোষণা হচ্ছে, ‘হায়! মৃত্যুই যদি আমাকে শেষ করে দিত! আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজেই এলো না। আর আমার ক্ষমতা-প্রতিপত্তিও আমার থেকে বরবাদ হয়ে গেল’ (সূরা হাক্কাহ : ২৭ থেকে ২৯ আয়াত)।

কোরআন শিক্ষাসহ ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে এবং নামাজ শেখার ব্যাপারে সরকার, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগীসহ সংশ্লিষ্ট সবার নজর দেয়া অতীব প্রয়োজন। কোনোরকম অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই ওই কাজটি অনায়াসে আনজাম দেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে যা জরুরি তা হচ্ছে শুধু একটু সচেতনতা, একটু উদ্যোগ, একটু চিন্তা-ফিকির। পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সময়-সুযোগের আলোকে কাজটি শুরু করার ক্ষেত্রে নিজের পদ্ধতিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। কর্মসূচির আওতায় যা থাকবে তা হচ্ছে স্রেফ নামাজ সহিহভাবে আদায় উপযোগী ব্যবস্থা তথা আরবি ২৯টি হরফের পরিচয়, সূরা ফাতিহাসহ ৪ থেকে ১০টি সুরা (দুর্বল ব্যক্তিবিশেষের জন্য প্রয়োজনে সূরা ফাতিহা ও মাত্র ৪টি সূরা), তাকবিরে তাহরিমা (নামাজ শুরুর আল্লাহু আকবার) থেকে নামাজ শেষের আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্ পর্যন্ত ভেতরের প্রয়োজনীয় দোয়া-দরুদগুলো শেখানোর ব্যবস্থা; সঙ্গে থাকবে সহজ সরল বাংলা, গণিত (সাধারণ হিসাব-নিকাশ) এবং ইংরেজি (ব্যক্তিবিশেষের জন্য) শিক্ষা। কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৈনিক বাঁধাধরা সময় নির্ধারণ না করে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে দৈনিকের পরিবর্তে অর্ধ-সাপ্তাহিক বা সাপ্তাহিক সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা সময়ের জন্য।

ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রাইমারি, হাই স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বয়স্ক শিক্ষার আদলে এ কার্যক্রম শুরু করে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গকে ইমাম, মোয়াজ্জিন এবং শিক্ষকদের কাজে লাগাতে পারে, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা এবং উপজেলা কর্মকর্তাদের তদারকির দায়িত্বও দেয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক অফিসে, বিভিন্ন ক্লাবে, সামাজিক সংগঠনের অফিসে, বাজারে ও মসজিদে এ কর্মসূচি চালু করা যায়। এনজিওদের সব কাজ ঠিক রেখে সঙ্গে সরকার নিয়ম করে দিয়ে ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দিতে বা অনুরোধ করতে পারেন। যিনি সহিহভাবে কোরআন পড়তে পারেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি বাড়িতে, পরিবারে, অফিসেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে দুটি বর্ণনা অতীব জরুরি—

১. আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, একদিন রাসুল (সা.) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নামাজ পড়ে বসলেন। এ সময় এক ব্যক্তি এসে তাড়াতাড়ি রুকু-সিজদা করে নামাজ পড়ল। রাসুল (সা.) বললেন, তোমরা ওই ব্যক্তিকে দেখতে পাচ্ছ? সে যদি এ অবস্থায় মারা যায় তবে মোহাম্মদের (সা.) উম্মতের বহির্ভূত অবস্থায় মারা যাবে (সহিহে আবু বকর বিন খুজাইমা)।

২. হজরত হুযায়ফা (রা.) এক ব্যক্তিকে দেখলেন ভালোভাবে রুকু-সিজদা না করে নামাজ পড়ছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এভাবে কতদিন যাবত্ নামাজ পড়ছ? সে বলল, ৪০ বছর। তিনি বললেন, ‘তুমি ৪০ বছর যাবত্ কোনো নামাজই পড়নি। এ অবস্থায় মারা গেলে তুমি অমুসলিম অবস্থায় মারা যাবে।’

কোরআন ও হাদিসের আলোকে এটুকু সুস্পষ্ট যে কোরআন শেখা সহজ। এছাড়া আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তিন কারণে আরবিকে ভালোবাস—১. আমি আরাবি, ২. কোরআনের ভাষা আরবি ও ৩. জান্নাতিদের ভাষা আরবি’ (হাদিস)।

আমরা জানি চ এর স্থলে ঋ দিলে নাম্বার পাওয়া যায় না, ব-এর স্থলে ভ দিলে অর্থ পাল্টে যায়, আরবি হরফ একটির স্থলে আরেকটি পড়লে কি সওয়াব পাওয়া যাবে? কাজেই মুসলমান হিসেবে মাত্র ২৯টি আরবি হরফ সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে, জানাতে হবে, নামাজ আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য হলেও আমাদের কোরআন শিখতে হবে। নামাজ পড়া এবং পরিবার-পরিজনকে, অধিনস্থদের নামাজের আদেশ দেয়া আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ। আল্লাহ বলেন, ‘পরিবার-পরিজনকেও নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এতে অবিচল থাক’ (সূরা ত্বহা ১৩২ আয়াত)।

আল্লাহ আমাদের ওই ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করার, কাজ করার, নামাজ উপযোগী কোরআন শিক্ষা কর্মসূচি চালু করার এবং সহিহ তরিকায় নামাজ শেখার ও শিক্ষা দেয়ার তৌফিক দিন। আমিন।