ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

জনপ্রতিনিধির জনসেবা

সেবা একটি মহত্ কাজ। ইসলাম এতে উত্সাহ জোগায় এবং সেবকের জন্য পুরস্কারের ঘোষণাও করে অনেক জায়গায়। সেবার পরিসর ছোট বা বড় যাই হোক না কেন তা পুণ্যের কাজ। সেবক নিয়ত ও ইখলাছ অনুপাতে ছওয়াবের ভাগী হয়। বাহ্যত দুনিয়াবি কাজও অনেক সময় সত্ নিয়তের কারণে ছওয়াবের কাজে পরিণত হয়। আবার অনেক ধর্মীয় কাজও নিয়তজনিত ত্রুটির কারণে ভেস্তে যায়।

জীবনের নানা সময়ে, নানা আনুকূল্য ও সেবার প্রয়োজনেই মানুষের সমাজবদ্ধ বসবাস। মানুষের লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সেবাই সমাজব্যবস্থা সচল থাকে। সেবার সে মানসিকতা লোপ পেলে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে যায়। সমাজে বিশৃংখলা, নৈরাজ্য ও শোষণের মহামারী পরিলক্ষিত হয়। ইতিহাস সাক্ষী? ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে অঞ্চল ও গোত্রসর্বস্ব সমাজ বিদ্যমান থাকলেও তা ছিজনপ্রতিনিধির জনসেবা
আ ব দু ল্লা হ মু কা র র মল আধিপত্য বিস্তার, হিংসা-বিদ্বেষ এবং পরশ্রীকাতরতার ভয়াল থাবায় জরাজীর্ণ। সে সমাজে ‘আমি, আমার ও আমাদের’ ছাড়া আর কারও কথা ভাবার সুযোগই ছিল না। সে পৈশাচিক সমাজকে ইসলাম যখন মানবতার দীক্ষা দিল। ‘আমি ও আমরা’-এর সঙ্গে অন্যকে নিয়েও ভাবতে শেখাল? তখন সে সমাজের হিংস্র মানুষগুলো ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হলো। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে এল। সমাজ হলো কল্যাণমুখী।

আমাদের ঘুণেধরা এ জীর্ণশীর্ণ সমাজকে ফলপ্রসূ, সুশৃঙ্খল ও কল্যাণমুখী করতে সেবকের প্রয়োজন, যারা নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের নিয়েও ভাববে, বরং অন্যদের বিষয়কেই প্রাধান্য দেবে। নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, ‘জাতির নেতা তাদের সেবক’। আমাদের সমাজ ও সরকার ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য প্রচলিত ধারায় গণতান্ত্রিক নিয়মে কয়েকটি স্তরে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়। তাদের প্রধান পরিচয় ‘জনপ্রতিনিধি’। বিধিমতে জনসেবা করাই তাদের কাজ। জনগণের সমস্যা সমাধান করা, তাদের সার্বিক কল্যাণের পথকে সুগম করার লক্ষ্যে সরকারের উচ্চমহলের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে তাদেরই সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। নির্বাচনপূর্ব প্রচারণায় সবারই প্রতিশ্রুতি তাই প্রমাণ করে।

সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচন হতে চলেছে। আশা করা যাচ্ছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে শিগগিরই। তাই সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা সেবক হিসেবে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তারা তাদের সেবাকে সুন্দর ও সার্থক করতে অতীতের সে সব মহামনীষীগণের সেবাকর্ম দেখে নিতে পারেন, অদ্যাবধি পৃথিবীবাসী যাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। যাদের নিয়ে আমরা নিজেরাও গর্ব করি।

১. হজরত আবু বকর রা. ইসলামের প্রথম খলিফা। তিনি মক্কার বিশিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তার সমুদয় সম্পদ দ্বীনি কাজে ব্যয় করেছেন। খলিফা হওয়ার পরও ইসলামী খেলাফতের এ বাদশা জীবিকার সন্ধানে কাপড়ের গাট্টি মাথায় নিয়ে বাজারে ছুটছেন। পথে হজরত ওমরের সঙ্গে সাক্ষাত্। জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছেন? আপনি এখন রাষ্ট্রপ্রধান। ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের সব দায়িত্ব এখন আপনার। আপনি রাষ্ট্রের কাজে ব্যস্ত থাকবেন, আর রাষ্ট্র আপনার প্রয়োজন মেটাবে। এর পর তার যত্সামান্য ভাতা নির্ধারণ করা হয়। এর উপরই সন্তুষ্ট থেকে অবশিষ্ট জীবন পার করে দেন। অতঃপর মৃত্যুশয্যায় ওয়ারিশদের অসিয়ত করে গেলেন, ‘বায়তুলমাল থেকে গৃহীত সমুদয় ভাতা আমার সম্পত্তি থেকে ফিরিয়ে দেবে’। বাস্তবে হয়েছিলও তাই।

২.ক. হজরত ওমর রা.। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, অর্ধজাহানের সফল শাসক। তাঁর সাধারণ নিয়ম ছিল, রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে প্রজাদের প্রকৃত অবস্থা জানা। একদিন রাতে হাঁটছেন। দূরে খোলা ময়দানে কাতর কণ্ঠ শুনে এগিয়ে গেলেন। দেখেন, মুসাফির দম্পতি, স্ত্রী প্রসব ব্যথায় কাতরাচ্ছে। তাদের সহযোগিতার কেউ নেই এবং অতীব প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও নেই। স্বামী এ অবস্থায় স্ত্রীকে একা রেখে কোথাও যেতে পারছে না এবং কোন কিছুর ব্যবস্থাও করতে পারছে না। তাই কোনো ত্রাণকর্তার প্রতীক্ষায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পথ চেয়ে আছে। হজরত ওমর রা. দৌড়ে বাড়ি এসে স্ত্রীকে বললেন, চল চল, আজ তোমার মহাপুণ্যের সুযোগ হয়েছে। অতঃপর খলিফার স্ত্রী ধাত্রীর কাজ সমাধা করলেন আর খলিফা নিজে বাইরে অন্যান্য কাজের আন্জাম দিলেন।

খ. অন্য আরেক দিনের ঘটনা। প্রজাদের অবস্থা জানতে রাতে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এক ঘর থেকে বাচ্চাদের করুণ আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। শিশুদের অবিরাম আর্তনাদে মহিলাকে ওমর ভর্ত্সনা করলেন, তুমি কেমন মহিলা যে, মা হয়েও শিশুদের থামাতে পারছ না! ভেতর থেকে মহিলা গর্জে ওঠল, তুমি কে? তোমার পথে তুমি যাও। উপদেশ খয়রাত করতে হবে না। আমার ঘরে কয়েকজন এতিম শিশু আছে অথচ তাদের খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। আগুন জ্বালিয়ে খাবারের মিথ্যা দোহাই দিয়ে শিশুদের আর কতক্ষণ থামিয়ে রাখা যায়?
খলিফা ওমর দৌড়ে বায়তুল মালে গিয়ে প্রয়োজনীয় খাবার বস্তাভর্তি করে গোলামকে বললেন, এটা আমার কাঁধে তুলে দাও। গোলামের অবাক প্রশ্ন। হুজুর আমি থাকতে আপনি কাঁধে নেবেন কেন? তিনি বললেন, কিয়ামত দিবসে আমার বোঝা তুমি কাঁধে নেবে না। তাই দুনিয়াতেও আমার বোঝা আমাকেই বহন করতে দাও। খলিফা নিজে বস্তা কাঁধে নিয়ে মহিলার বাড়ি গিয়ে হাজির। অতঃপর বললেন, মা! তুমি রুটি সেঁকো আর আমি বানিয়ে দিচ্ছি। এভাবে শিশুদের খাইয়ে আনন্দরত অবস্থায় রেখে আসার সময় মহিলা বলছিল, খলিফা ওমর কোথায়? আজ যদি আমার ক্ষমতা থাকতো তবে খেলাফতের মসনদ থেকে তাকে নামিয়ে তোমাকেই সেখানে বসিয়ে দিতাম। মহিলা আদৌ জানতো না যে, বস্তাবাহী সে ব্যক্তিটিই খলিফা ওমর।

আমাদের সমাজের এ বেহাল দশায় সমাজ বিনির্মাণে এমন জনপ্রতিনিধির প্রয়োজন, যারা হবেন প্রকৃত নিষ্ঠাবান সমাজসেবক। সমাজের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি সদস্যের কামনা এমনই। পূর্বসূরিদের নিয়ে যারা গর্ব করেন, যাদের উত্তরসূরি হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন, তাদের কাছে অন্যদের ব্যতিক্রম কিছু প্রত্যাশা ও চাওয়া তো থাকতেই পারে।

আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে—মহানবী সা. ইরশাদ করেন, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে আপন দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেসিত হবে?