ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

জুমাবারের খুতবা

খুতবা অর্থ বক্তৃতা, ভাষণ, নির্দেশনা। এখানে ‘ইয়াউমুল জুমুয়া’ বা জুমাবারের খুতবা বলতে প্রতি শুক্রবারের জুমার সালাতে দেয়া খুতবাকে বোঝানো হয়েছে। জুমুয়া মানে সমবেত হওয়া। কুরআন কারিম এই দিনটিকে ইয়াউমুল জুমুয়া বলেছে এবং পাশাপাশি মুমিনদেরকে নির্দেশ করেছে এভাবে ‘হে মুমিনগণ! যখন জুমার দিনে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। আর বেচাকেনা বর্জন করো। এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ সূরা আল-জুমুয়া (০৯)।

এ নির্দেশ পালন করা প্রত্যেক বয়ঃপ্রাপ্ত, সুস্থ ও মুসাফির নয় এমন মুমিন পুরুষের জন্য ফরজ করা হয়েছে। তাদের জন্য জোহরের সালাতের পরিবর্তে দুই রাকাত জুমার সালাত ফরজ করা হয়েছে। আর নারীদের জন্য জোহরের সালাতের বিধানই বহাল রাখা হয়েছে। তবে নারীরা জুমার সালাতে শরিক হলে আলাদাভাবে জোহরের সালাত আদায় করতে হবে না। সহি হাদিসের বর্ণনা মতে, জুমাবারের অনেক গুরুত্ব ও মর্যাদা। এ দিনকে ‘সাইয়্যেদুল ইয়াওম’ বা সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিন বলা হয়েছে। এ দিনটি আমাদের মাঝে সপ্তাহে একবার এবং বছরে ৫২ বার এসে থাকে। আমরাও জুমাবারকে সপ্তাহের অন্য দিনের চেয়ে একটু ভিন্ন ভাবতে এমনিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি এটি আমাদের মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য।

সারা সপ্তাহ যাদের নানা সঙ্গত-অসঙ্গত কারণে মসজিদে যাওয়া হয়ে ওঠে না, তারা অনেক কষ্ট করেই এ দিনটিতে সন্তানসন্ততিসহ মসজিদে হাজির হতে চেষ্টা করেন। কিছু কিছু মসজিদে মেয়েদের সালাতের ব্যবস্থা থাকায় সেখানে অনেকে সপরিবারে জুমার সালাতে শরিক হন। আর কোনো কারণে জুমার সালাতে উপস্থিত হতে না পারলে তাদের মাঝে বেশ কষ্টবোধও দেখা যায়। আর এ ক্ষেত্রে রমজানের জুমার দিনগুলো ভিন্নমাত্রা লাভ করে, বিশেষ করে রমজানের শেষ জুমাটিতে। আমরা যাকে ‘জুমাতুল বিদা’ বলে থাকি, যদিও এ দিনটির বিশেষত্ব নিয়ে ইসলামী শরিয়তে কিছু আছে বলে জানা নেই। তাই রমজানের শেষ জুমার দিনটিকে সে মাসের অন্যান্য জুমার দিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা সঠিক। উল্লেখ্য, সময়ের দাবি অনুযায়ী দেশের প্রতিটি জামে মসজিদে নারীদের জন্য জামাতে শরিক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা; এমনকি দুই ঈদের জামাতেও।

কুরআনি নির্দেশনাপ্রসূত জুমার সালাতের অন্যতম প্রধান দিক ইমাম বা খতিব সাহেবের দেয়া খুতবা। এখন জানার বিষয় এ খুতবাটির বিষয়বস্তু কী হবে, সেটি কখন কিভাবে দিতে হবে; আর সেটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই বা কী? এসব বিষয়ের উত্তর আমরা সহি হাদিস থেকে সহজেই জানতে পারি। আর তা হলো জুমাবারের খুতবার মূল লক্ষ্য হলো ইমাম বা খতিবের পক্ষ থেকে আগত মুসল্লিদের কাছে সাপ্তাহিক নির্দেশনা তুলে ধরা। আর তা হবে মুসল্লিদের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়; দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণবহ সব বিষয়ের কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা।

মানুষ কী করবে এবং কী করবে না এসব বিষয়ের ভালো-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন। খুতবার বিষয় হিসেবে ইসলামের বিশেষ কোনো দিককে গ্রহণ বা বর্জন করা ইসলামসিদ্ধ নয়; একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধানের সব দিকই এর মধ্যে আসতে হবে। আমাদের সমাজে এ বিষয়ে খতিব, মুসল্লি ও মসজিদ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের মাঝে রয়েছে কাক্সিক্ষত জ্ঞানের অভাব। ফলে মসজিদগুলোর মিম্বার থেকে ইসলামের সময়োচিত আহ্বান থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। এ সম্পর্কে অধিক জানার জন্য রাসূলুল্লাহ সা: ও তাঁর খুলাফায়ে রাশেদিনের খুতবার বিষয়বস্তুকে অনুসরণ করা আবশ্যক।

সাধারণত আমরা খুতবার মধ্যে মৌলিক ইবাদত তথা আল্লাহর হক, নেক আমলের ফজিলত, অনেক গল্প-কাহিনী, পরকালীন শাস্তি, বেহেশত-দোজখের সুখ-দুঃখের বর্ণনা সম্পর্কিত বিষয়ের প্রাধান্য দেখতে পাই। অবশ্যই এ বিষয়গুলো মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, অন্যায়-অপরাধ থেকে নিবৃত করে। তবে দুনিয়ার জীবনে তাকে কর্তব্যপরায়ণ করতে প্রয়োজন আরো জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়কে আলোচনায় আনা। জুমাবারের আলোচনায় তুলনামূলকভাবে প্রাত্যহিক জীবনের করণীয়-বর্জনীয় নিয়ে ইসলামী নির্দেশনাপ্রসূত আলোচনা আমরা কমই শুনে থাকি। সেখানে বান্দার হক নিয়ে প্রয়োজনমতো কথা আসা জরুরি। এ দিনের আলোচক ও শ্রোতাদের ভালোভাবে মনে রাখা উচিত যে, ইসলাম ফিতরাত বা মানবপ্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অতি বাস্তবানুগ জীবনব্যবস্থা এবং বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী মানুষের জীবনে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া সব ঘটনার সঠিক পথ দেখাতেই এসেছে ইসলাম। চির-আধুনিক ধারার এ জীবনবিধান; জীবন নিয়ে এক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো সুযোগই এখানে নেই।

এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, কুরআন কারিম মানুষকে প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করতে বলেছে। কল্যাণ মানে সদার্থক পরিবর্তন। আর কল্যাণময় জীবন এক স্থানে থেমে থাকে না। এ ছাড়া ইসলামের মৌলবিধানের ওপর ভিত্তি করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মেলামেশা ও লেনদেনের (মুয়ামালাত-মুয়াশারাত) সুন্দর দিকনির্দেশনা এখানে রয়েছে। যেমন বিবাহ রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নত। এখানে সামর্থ্যানুযায়ী শর্তহীন উপঢৌকন প্রদান ও গ্রহণ বৈধ, আতিথেয়তা ও আনন্দ-উল্লাসের অনুমতিও রয়েছে; নেই সামাজিকতা রক্ষায় কোনো রকম বাধা যার রীতিপদ্ধতি হাদিসের গ্রন্থগুলোতে পরিষ্কারভাবে বলা আছে।

কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনে তা প্রতিপালিত না হওয়ার অন্যতম একটি কারণ সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকা। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা বা আনন্দের নামে স্থান করে নিয়েছে নানা অপসংস্কৃতি, ইসলামবিরুদ্ধ নানা নিয়ম। ফলে একটি পরিবারের সূচনাই হচ্ছে ইসলামী অনুশাসনকে উপেক্ষা অথবা অমান্য করার মধ্য দিয়ে। বিষয়টিকে মোটেই খাটো করে দেখার নয়। এমনিভাবে ওঠাবসা, লেনদেন, আত্মীয়তা রক্ষা, জনকল্যাণ সাধন, পরোপকার, পরমতসহিষ্ণুতা, উত্তম চরিত্র, রোগীর সেবা, বড়কে সম্মান করা এবং ছোটকে ভালোবাসতে শেখা, লোভ- ক্রোধ, হিংসা-বিদ্বেষ-জিঘাংসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, জ্ঞানার্জন ও প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে ধারাবাহিক নির্দেশনা জুমাবারের খুতবা থেকে আসতে পারে। সর্বোপরি জুমাবারের খুতবা হবে আদর্শ ব্যক্তি ও পরিবার, প্রীতিপূর্ণ সমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের নির্দেশনা প্রদানের অন্যতম মাধ্যম।

সম্মানিত খতিব ও মসজিদ পরিচালনার সাথে জড়িত দ্বীনসচেতন সবাইকে গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা জুমাবারকে আমাদের জন্য বিশেষ নিয়ামতপূর্ণ দিন হিসেবে প্রদান করেছেন। এ দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেক বক্তব্য রয়েছে। একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘সূর্যের নিচে সর্বোত্তম দিন হলো জুমাবার।’ (সহি মুসলিম)। তাই প্রতিটি জুমাবারের মসজিদকেন্দ্রিক কর্মসূচিকে সাজাতে হবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে। আগত মুসল্লিদের মাঝে সাপ্তাহিক মিলন ও সংহতি প্রকাশের চেতনা সৃষ্টির প্রচেষ্টা রাখতে হবে যা সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কেননা প্রতি ওয়াক্তের সালাতের চেয়ে জুমার সালাতে মসজিদে মুসল্লি আগমন কয়েকগুণ বেশি হয়ে থাকে। তারা একটি বিশেষ আবেগ ও গুরুত্ব নিয়েই এ দিন মসজিদে সমবেত হন। বেশির ভাগ মানুষই নিজ নিজ সন্তানাদি নিয়ে এসে থাকেন। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ সপ্তাহের এ দিনে মসজিদে আসাকে একটি বড় দায়িত্ব বলে মনে করেন যাদের অনেকে হয়তো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায় করতে অভ্যস্তও নন। মুসল্লিদের এ আবেগকে সঠিক ও সময়োচিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাদের সবার মনের খোরাক মসজিদের মিম্বার থেকে অবশ্যই আসতে হবে।

গতানুগতিক চিন্তা ও উদ্যোগ থেকে এ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। একটি নির্দিষ্ট খুতবার বই থেকে পড়ে পড়ে মুসল্লিদের শোনানোর মধ্য দিয়ে তাদের এ প্রয়োজন কখনোই মিটবে না। সমাজের সজাগ ও কর্মতৎপর মানুষ হিসেবে সম্মানিত খতিবগণের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব জুমাবারের খুতবার বিষয়বস্তু বস্তুনিষ্ঠ, অধিকতর কুরআন-সুন্নাহর তথ্যনির্ভর, জীবনঘনিষ্ঠ ও সময়োচিত করা। আর মসজিদ পরিচালনার সাথে জড়িত দ্বীনদার মুসলিমদের অন্যতম দায়িত্ব নিজ নিজ মসজিদের খতিবকে জুমাবারের আলোচনার বিষয় নির্ধারণে সহযোগিতা করা। তবেই জুমাবারের খুতবা হয়ে উঠবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনার পথনির্দেশক; আর অনন্ত জীবনের পথচলার বাতিঘর। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত করতে জুমাবারের প্রতিটি খুতবা হতে পারে অন্যতম সহায়ক।