ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

জুলুমের পরিণাম ভয়াবহ

ইসলাম ধর্মে সব ধরনের জুলুম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, হারাম। শুধু জুলুম নয়, জুলুমে সহযোগিতা করা এবং জালিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ও ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করাও হারাম। মানুষের ওপর জুলুম এমন এক ভয়াবহ গোনাহ যার শাস্তি কোনো না কোনো উপায়ে দুনিয়ার জীবনে পাওয়া শুরু হয়ে যায়। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখি ও প্রাণীর ওপরও জুলুম হারাম। জুলুমের ভয়ঙ্কর গোনাহর কারণে আখিরাতে দোজখে প্রবেশ করতে হবে। আমরা এ প্রবন্ধে জুলুম, জুলুম থেকে বাঁচার উপায় ও কারও প্রতি জুলুম করে থাকলে পৃথিবীতেই করণীয় কী—সে সম্পর্কে আলোকপাতের চেষ্টা করব।

আমাদের ধার্মিকতার স্বরূপ : আমরা অনেকে ধর্মপ্রাণ হিসেবে ধর্ম-কর্মে অগ্রগামী হলেও অন্যের ওপর জুলুম-অত্যাচারেও আমরা পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে সহজ-সরল মানুষের ওপর, ধার্মিকদের ওপর, ধর্ম পালনে সচেষ্ট ও সচেতনদের ওপর, দুর্বলদের ওপর জুলুমকে আমরা অপরাধ মনে করি না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো আমরা এতে আনন্দও বোধ করি। মনে রাখা অতীব প্রয়োজন যে জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন এমন এক অপরাধ-পাপ-গোনাহ যা সাধারণত আল্লাহ মাফ করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই মজলুম (যার ওপর অত্যাচার করা হয়েছে) জালেমকে (অত্যাচারী ব্যক্তিকে) মাফ না করেন।

প্রকৃত ধার্মিকদের আরও মনে রাখতে হবে, শুধু নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজের নামই ধর্ম নয়; ধর্ম হচ্ছে দুটো বিষয়ের সমষ্টি, যার একটি হচ্ছে পালন করা এবং অপরটি হচ্ছে বর্জন করা। কোরআন ও হাদিসের আদেশগুলো মেনে চললেই ধর্ম পালন হবে না, আদেশগুলো মেনে চলার পাশাপাশি কোরআন ও হাদিসের নিষেধগুলোও বর্জন করতে হবে।

মুসলিম বলে দাবি করলেও কিছু লোক সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে—‘কিছু লোক এমন আছে যারা বলে আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি, আসলে তারা ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহকে এবং যারা (বাস্তবিক) ঈমান এনেছে তাদের ধোঁকা দেয় এবং (সত্য কথা এই যে) তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না।

কোরআন ও হাদিসে জুলুম সম্পর্কীয় বর্ণনা : পবিত্র কোরআনে সূরা ইবরাহিমে আল্লাহ বলেন, ‘জালেমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও উদাসীন মনে করো না। তবে তিনি তাদের শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফোরিত হবে, তারা মাথা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠিপড়ি করে দৌড়াতে থাকবে, তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে ফিরবে না, এবং তাদের হৃদয়গুলো দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আজাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্ক সাবধান করে দাও, যে দিন তাদের কাছে আজাব আসবে।

সেদিন জুলুমবাজরা বলবে, হে আমাদের প্রভু! অল্প সময়ের জন্য আমাদের অবকাশ দিন, তাহলে আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব (অন্যের ওপর জুলুম করব না) এবং রাসুলদের অনুসরণ করব। তোমরা কি ইতিপূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে তোমাদের পতন নেই! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করছ এবং সেসব জালেমের সঙ্গে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি’ (আয়াত ৪২-৪৫)।

সূরা আশশুআরার শেষ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘জুলুমবাজরা তাদের জুলুমের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে, তাদের গন্তব্যস্থল কেমন?’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা জালেমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন—তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য’ (সহিহ আল বুখারি, সহিহ মুসলিম, জামে তিরমিযি)। ‘আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না, জালেমদের সহযোগী হবে না, তাহলে আগুন (জাহান্নামের) তোমাদেরও স্পর্শ করবে’ (সূরা হুদ : ১১৩ আয়াত)।

জুলুম করে থাকলে দুনিয়াতেই যা করা অতীব জরুরি : রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেউ যদি তার কোনো ভাইয়ের সম্মানহানি কিংবা কোনো জিনিসের ক্ষতি করে থাকে, তবে আজই (দুনিয়াতেই) তার কাছ থেকে তা বৈধ করে নেয়া উচিত (অর্থাত্ ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত, ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত) এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যেদিন টাকা-কড়ি দিয়ে কোনো প্রতিকার করা যাবে না, বরং তার কাছে কোনো নেক আমল থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ হিসেবে মজলুমকে ওই নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে এবং তার কোনো অসত্ কাজ না থাকলেও ওই মজলুমের অসত্ কাজ তার ওপর বর্তানো হবে’ (সহিহ আল বুখারি ও জামে তিরমিযি)।

একটি হাদিসে কুদসিতে রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পরের ওপর জুলুম করো না’ (সহিহ মুসলিম, জামে তিরমিযি)।

তাওরাতে বর্ণিত আছে, ‘পুলসিরাতের পাশ থেকে একজন ঘোষক কিয়ামতের দিন এই বলে ঘোষণা দিতে থাকবে—‘ওরে বলদর্পী নিষ্ঠুর জালেমরা! আল্লাহ নিজের মর্যাদা ও প্রতাপের শপথ করে বলেছেন, আজকের দিন কোনো অত্যাচারী ব্যক্তি এই পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে যেতে পারবে না।’ মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর বান্দারা খালি পায়ে নগ্ন দেহে ময়দানে সমবেত হবে। এ সময়ে গুরুগম্ভীর স্বরে একটি আওয়াজ ধ্বনিত হবে যা দূরের ও কাছের সবাই শুনতে পাবে।

বলা হবে, আমি সবার অভাব পূরণকারী রাজাধিরাজ, কোনো জান্নাতবাসীর পক্ষে জান্নাতে যাওয়া এবং জাহান্নামবাসীর পক্ষে জাহান্নামে যাওয়া সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত তার কৃত জুলুমের আমি প্রতিশোধ না নিই, এমনকি তা যদি একটি চড়-থাপ্পড় বা লাথির পর্যায়েও হয়ে থাকে। তোমার প্রভু কারও ওপর জুলুম করেন না। আমরা বললাম হে রাসুল! সেটা কীভাবে সম্ভব হবে, আমরা তো সবাই খালি পায়ে ও নগ্ন দেহে থাকব? রাসুল (সা.) বললেন, প্রত্যেকের কৃত সত্কর্ম ও অসত্কর্মের আদান-প্রদান দ্বারাই প্রতিশোধ নেয়া হবে। তোমাদের প্রতিপালক যালেম নন।’ অপর এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘একটি বেতের আঘাতের জন্যও কিয়ামতের দিন প্রতিশোধ নেয়া হবে।’

একটি ঐতিহাসিক ঘটনা : ইমাম আযযাহাবি (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল কাবায়েরে জুলুম প্রসঙ্গে জনৈক ঐতিহাসিকের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম তার এক হাত ঘাড় থেকে কর্তিত। সে উচ্চস্বরে বলছে, যারা আমাকে দেখবে তারা যেন কারও ওপর অত্যাচার না করে।

আমি তার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার কী হয়েছে ভাই? সে বলল, একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। আমি একজন অত্যাচারী ব্যক্তির বরকন্দাজ ছিলাম। একদিন দেখলাম এক জেলে একটি বড় মাছ নিয়ে যাচ্ছে। মাছটি দেখে আমার ভীষণ লোভ হলো এবং জেলেকে প্রহার করে তার মাছটি কেড়ে নিলাম। মাছটি নিয়ে সানন্দে বাড়ি যাচ্ছি। সহসা মাছটি আমার বুড়ো আঙুলে ভীষণ জোরে কামড় দিল। অতঃপর বাড়ি গিয়ে মাছটি আছড়ে ফেলে দিলাম। ব্যথায় সেদিন রাতে আমার ঘুম হলো না।

পরদিন সকালে দেখি আঙুলটা ভীষণভাবে ফুলে উঠেছে। আমি দ্রুত চিকিত্সকের কাছে গেলাম। তিনি আমাকে জানালেন, বুড়ো আঙুলটা কেটে ফেলতে হবে। নচেত্ পরে পুরো হাত আক্রান্ত হবে। অগত্যা বুড়ো আঙুলটা কেটে ফেলা হলো। কিন্তু এতেও ব্যথার উপশম হলো না। ফের চিকিত্সকের কাছে গেলাম। এবার তিনি আমার হাতের পাতাটি পুরো কেটে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। কিন্তু তাতেও উপশম হলো না। ক্রমে আমার পুরো হাতটাই কাটতে হলো। অতঃপর এক ব্যক্তি আমার সব ঘটনা শুনে আমাকে মাছের মালিকের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বললেন, নচেত্ আমার পুরো দেহই রোগাক্রান্ত হতে পারে বলে সতর্ক করে দিলেন। আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করে জেলেটির সন্ধান পেয়েছি এবং তার কাছে আগের সব ঘটনা স্মরণ করিয়া দিয়ে পা ধরে মাফ চেয়েছি। এখন আমার বাদবাকি শরীর সুস্থ আছে। কেননা ওই জেলে আমাকে মাফ করে দিয়েছে এবং আমাকে যে বদদোয়া করেছিল তা ফিরিয়ে নিয়েছে।

জুলুম থেকে বাঁচার উপায় : জুলুম থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে লোভ—ক্ষমতার লোভ, হিংসা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, ক্রোধ থেকে আত্মসংবরণ করা এবং জনসেবা, ধর্মীয় সেবা ও পরোপকারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা আর হালাল ও বৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থে, হালাল টাকা-পয়সার মাধ্যমে পানাহারে, পোশাক-পরিচ্ছেদে ও আসবাবপত্রে সন্তুষ্ট থাকা। বিশেষ করে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা, কোরআন ও হাদিস পড়া এবং কোরআন ও হাদিসে জুলুম সম্পর্কে যেসব বর্ণনা আছে তা জানা, মানা এবং অন্যকে জানানোর চেষ্টা করা।

আমরা প্রকৃতই আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হলে, জান্নাত ও জাহান্নামে বিশ্বাসী হলে, দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তি পেতে চাইলে সব ধরনের জুলুম এবং জুলুমের সহযোগিতা করা থেকে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে আরও মনে রাখতে হবে—স্ত্রী, ভাই, বোনসহ নিকটাত্মীয়দের প্রাপ্য হক (ধর্ম কর্তৃক নির্ধারিত) না দেয়াও জুলুম। আল্লাহ আমাদের সব ধরনের জুলুম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : দিদার-উল-আলম