ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

তাওয়াক্কুল মুমিনের গুণ

তাওয়াক্কুল মুমিনের গুণতাওয়াক্কুল আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো নির্ভর করা, ভরসা করা, আস্থা রাখা, নির্ভরশীলতা (আরবি বাংলা ব্যবহারিক অভিধান)। ‘তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ’ অর্থ হলো আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করা। কোনো ব্যক্তিকে কোনো কাজের জিম্মাদারি প্রদান করা, প্রতিনিধি বানানো। পরিভাষায় যে কোনো প্রয়োজন কিংবা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভর করাকে তাওয়াক্কুল বলে। আল্লাহর ওপর ভরসা করার নানা পর্যায় রয়েছে। কেউ মুখে মুখে ভরসার কথা বলে, কেউ সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ভরসা করে, কেউ-বা সর্বদাই সব কাজে আল্লাহর ওপর ভরসা করে। এটি তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ পর্যায়।

আল্লাহর ওপর যার আস্থা যত বেশি, তার সফলতার পরিপূর্ণতা তত বেশি। তাওয়াক্কুল একটি গুণ, একটি ইবাদত। এটি অর্জন ছাড়া ঈমান অসম্পূর্ণ থাকে। সে কারণে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওপর তাওয়াক্কুল করা যায় না। মৃত বা জীবিত কোনো ওলি-আল্লাহ, পীর-বুজুর্গ, নবী-রাসুলের ওপর ভরসা করা শিরক। আর শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম।

তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আল কোরআনে বলা হয়েছে :

  • যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহ তায়ালাই যথেষ্ট (সূরা আত্ তালাক-০৩)।
  • আপনি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন (আল-ইমরান ১৫৯)।
  • যারা আপনার বিরুদ্ধে শলা-পরামর্শ করে আপনি তাদের উপেক্ষা করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করুন (নিসা-৮১)।
  • আপনি ভরসা করবেন তার ওপর যিনি চিরঞ্জীব, যাঁর মৃত্যু নেই (সূরা ফুরকান ৫৮)।
  • আপনি নির্ভর করুন আল্লাহর ওপর, আপনি তো স্পষ্ট সত্যে প্রতিষ্ঠিত। (সূরা নামল-৭৯)।
  • আপনি কাফির ও মুনাফিকদের কথা অনুযায়ী চলবেন না। তাদের নির্যাতন উপেক্ষা করবেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন (আহযাব-৪৮)।
  • বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহ্ই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁরই ওপর নির্ভর করে (সূরা যুমার-৩৮)।
  • আর আল্লাহর ওপর ভরসা কর যদি তোমরা বিশ্বাসী হও (মায়িদা-২৩)।
  • আর ঈমানদারদের তো আল্লাহর ওপর ভরসা করা উচিত (সূরা ইব্রাহিম-১১)।
  • আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। কার্যনির্বাহীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট (আহযাব-০৩)।
  • আর যদি তোমরা মুসলিম হও এবং আল্লাহর ওপর ঈমান এনে থাক, তবে তাঁরই ওপর ভরসা কর (সূরা ইউনুস-৮৪)।

আয়াতগুলোতে বার বার ভরসা করার জন্য নির্দেশ করা হয়েছে। এ কথা প্রমাণিত যে, আল্লাহর ওপর ভরসাকারীই প্রকৃত মুমিন ও সঠিক পথপ্রাপ্ত সফল ব্যক্তি।

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও তাওয়াক্কুল করতেন এবং কীভাবে তাওয়াক্কুল করতে হয় তা শিখিয়ে গেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার উট বাঁধব এরপর কি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব? না তাকে ছেড়ে দেব এরপর তাওয়াক্কুল করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, প্রথমে উটকে বাঁধো এরপর তাওয়াক্কুল করো (তিরমিযি)।

অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি : তোমরা যদি আল্লাহর ওপর ‘তাওয়াক্কুল’ করার হক আদায় করতে, তাহলে তিনি পাখিকুলকে রিজিক দেয়ার মতো তোমাদেরও রিজিক দান করতেন। ‘তোমরা লক্ষ্য করে থাকবে’ পাখিকুল অতি প্রত্যুষে খালি পেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে তারা বাসায় ফিরে আসে ( ইবনে মাজাহ্ : ৪১৬৪, তিরমিযি : ২৩৪৪)।

পাখিরা আগামী দিনের জন্য খাবার মজুত করে রাখে না। তারা যথাযথভাবেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে—এ হাদিসগুলো তা-ই প্রমাণ করে। কেননা আবু হুরায়রা (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, জান্নাতে এমন কিছু সম্প্রদায় প্রবেশ করবে, যাদের অন্তর পাখির অন্তরের মতো হবে (মুসলিম)। অন্তর হবে পাখির অন্তরের মতো—এর অর্থ হলো, তারা পাখিদের মতো তাওয়াক্কুলকারী। বা তারা কোমল হৃদয়ের মানুষ।

তাওয়াক্কুল করার কারণে কঠিন বিপদও মোকাবিলা সহজ হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ.) কে মূর্তি ভাঙার মিথ্যা অভিযোগে জালিম শাসক নমরুদ যখন আগুনে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তখন ইব্রাহিম (আ.) পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করার কারণে সেই আগুন ফুলের বাগানে পরিণত হয়।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ,ইব্রাহিম (আ.) কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন তিনি বললেন, হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক) আর লোকেরা যখন মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাথীদের বলল, শত্রুবাহিনীর লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হচ্ছে, তাই তোমরা তাদের ভয় কর, তখন তাদের ঈমান বেড়ে গেল এবং তারা বলল, হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক) (বুখারী)।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বুখারির আরেকটি বর্ণনায় আছে, আগুনে নিক্ষেপকালে ইব্রাহিম (আ.)-এর শেষ কথা ছিল, হাসবিআল্লাহু ওয়-নি’মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক)। হাসবুনাল্লাহ আর হাসবিআল্লাহ-এর পার্থক্য হলো এক বচন ও বহু বচনের। প্রথমটির অর্থ আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট আর দ্বিতীয়টির অর্থ হলো আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। এক বচনে হাসবিআল্লাহ, আর বহু বচনে হাসবুনাল্লাহ বলতে হয়। ইবরাহিম (আ.) ছিলেন একা। তাই তিনি হাসবিআল্লাহ বলেছেন (ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদি আরব)

তাওয়াক্কুল, তাকদির ও প্রচেষ্টার কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে—প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মধ্যরাতে, যাতায়াত সুবিধা নগণ্য, আধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থা নেই—এমন স্থানে কেউ অসুস্থ হলে, সে ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুল হলো জ্ঞান ও সামর্থ্যের মধ্যে রোগ নিবারণের যে উপায় জানা আছে তা অবলম্বন করে সুস্থতার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করা। তেমনি শহরে অবস্থিত অসুস্থ ব্যক্তি চিকিত্সার সব সুবিধা নিয়ে সুস্থতার জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করাই শ্রেষ্ঠ পন্থা [কিমিয়ায়ে সাদাত-ইমাম গাযযালী (রহ.)]।

হাসান বসরী (র.) বলেন, রিজিক অন্বেষণের ক্ষেত্রে কোনো উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয়। কোনো যানবাহনে আরোহণ করেই গন্তব্যস্থলে কেউ নিরাপদে পৌঁছে যাবে তার নিশ্চয়তা নেই, বরং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য।

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, তাওয়াক্কুল হলো ঈমানের অর্ধেক। আর দ্বিতীয় অর্ধেক হলো আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য শরিয়ত সমর্থিত জায়েজ কোনো উপায়-উপকরণ বা পন্থা না করা তাওয়াক্কুল নয়। যেমন কেউ বলল, যদি আমার তাকদিরে ধনী হওয়া লেখা থাকে, তবে কোনো ধরনের চেষ্টা ছাড়াই ধনী হয়ে যাব। আর যদি তাকদিরে ধনী হওয়া না থাকে তাহলে যত চেষ্টা করি না কেন তাতে সফল হব না । প্রকৃত অর্থে এটি তাওয়াক্কুল নয়।

ইরানের বিখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ ড. হোসেইন এলাহি কুমশেরি তার কিমিয়া বা পরশমণি নামক বইয়ে লিখেছেন— আমি শক্তিহীন এক পরগাছা, আমার নিজের কোনো শেকড় নেই, যতক্ষণ আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করি ততক্ষণ আমার ভেতর কোনো ভয়ভীতি থাকে না। উল্লেখ্য যে, আল কোরআনে তাওয়াক্কুল ৯ বার, বহুবচনে মুতাওয়াক্কিল ৪ বার, বিভিন্ন ক্রিয়াপদে ৩৩ বার এবং ওয়াকিল ২৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে। (কোরআনের পরিভাষা : ড. মুস্তাফিজুর রহমান)

ইসলামী শরিয়তে তাকদিরে বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। তাই তাকদিরে বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সফল হলে যে কোনো ব্যাপারে শোকর আদায় করতে হবে। আর সফল না হলে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। প্রচেষ্টা ও তাওয়াক্কুল উভয়টাই থাকতে হবে। তাকদিরের দোহাই দিয়ে রোগ হলে চিকিত্সা না করা, শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা না করা ইসলামসম্মত নয়। সুতরাং সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে আল্লহর ওপর ভরসা করাই তাকদির। লা হাওলা অলা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ …।