ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

দুর্নীতি দমনে ইসলাম

দুর্নীতি মানে অনিয়ম ও নীতিবহির্ভূত কাজ। আভিধানিক অর্থে অসৎ হওয়া বা কাউকে অসৎ বানানো, ন্যায়পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া, দুঃশাসন ও ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি। সাধারণভাবে দুর্নীতি বলতে আমরা বুঝি প্রাপ্ত বা অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা।

দুর্নীতি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র যারাই করে; দেশ সমাজ ও মানুষের সামগ্রিক জীবনে তার একটা প্রভাব পড়ে। এতে একশ্রেণীর মানুষ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিপতিত হয় বহুবিধ সমস্যা সঙ্কটে। যাপন করে কষ্টক্লিষ্ট জীবন। আরেক শ্রেণীর মানুষ লাভবান হয়। হয় অর্থবিত্তে মোটাসোটা। গড়ে তোলে সম্পদের পাহাড়। এতে সমাজে শ্রেণীবৈষম্য বাড়ে। বৃদ্ধি পায় মানুষের হাহাকার। আর্তমানবতা হয় নিষ্পেষিত। মানুষে মানুষে সৃষ্টি হয় দ্বিধাবিভক্তি। সৃষ্টি হয় বিবাদ-বিসংবাদ ও সম্পর্কের টানাপড়েন। শুরু হয় অর্থনীতির ভঙ্গুর। প্রকটিত হয় দেশের সমস্যা সঙ্কট। বিঘ্নিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি নিরাপত্তা এবং সি’তিশীলতা। বাধা হয়ে দাঁড়ায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, সুশাসন ও সহনশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্র।

দুর্নীতি দমনে ইসলাম

ইসলামে কোনো দুর্নীতি নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে দুর্নীতি মহা অন্যায়, গর্হিত ও হারাম কাজ। দুর্নীতি রয়েছে অনেক প্রকার। তা সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যায়ের। কিন’ সব ধরনের দুর্নীতি দমনেই ইসলামে রয়েছে সুন্দর নির্দেশনা ও নীতিমালা। পর্যায়ক্রমে তা উল্লেখ করা হলো।

১. সম্পদসংক্রান্ত দুর্নীতি দমনে ইসলাম : কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা। জোর করে করায়ত্ত করা, যা আমাদের সমাজে অহরহ হয়। প্রভাবশালীরা নিম্নবিত্তের ওপর এটা বেশি করে। কিন’ তা এক ধরনের দুর্নীতি। আর একেই বলা যেতে পারে সম্পদসংক্রান্ত দুর্নীতি। তা দমনে ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। আল কুরআনে বলা হয়েছে- ‘তোমরা জেনেশুনে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না বা শাসকের সামনে তা এ উদ্দেশ্যে পেশ করো না যে, লোকজনের ধনসম্পদ নিজেরা ভক্ষণ করবে পরের হক নষ্ট করবে। (সূরা : বাকারাহ)।

২. সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনে ইসলাম : যারা সমাজে দুর্নীতি সৃষ্টি করে, ত্রাস ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। অন্যায়ভাবে প্রভাব খাটিয়ে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সি’তিশীলতার বিঘ্ন ঘটায় সেটা সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি। তা দমনে ইসলামে সুন্দর নির্দেশনা দিয়েছে। আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- ‘যারা আল্লাহ এবং রাসূল সা:-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদের হয়তো হত্যা করো নয়তো শূলে চড়াও। অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দাও বা তাদের দেশান্তরিত করো। এটা হলো তাদের দুনিয়ার শাস্তি, আর আখেরাতে রয়েছে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক আজাব’ (সূরা : মায়িদা)।

৩. জমি দখলসংক্রান্ত দুর্নীতি দমনে ইসলাম : দুর্নীতির মাধ্যমে অন্যের জমিজমা দখল করা হয়। ইসলামে তা নিষেধ করেছে। তাদের ব্যাপারে মৃত্যুর পর কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে। হুজুর সা: বলেন- যারা অন্যায়ভাবে কারো জমি দখল করবে কেয়ামতের দিন তাদের গলায় সাত তবকা জমিন ঝুলিয়ে দেয়া হবে অথবা তাদের সাত তবকা জমিনের নিচে গেড়ে দেয়া হবে। (বুখারি)।

৪. সুদ, ঘুষসংক্রান্ত দুর্নীতি দমনে ইসলাম : সুদ ও ঘুষ দুর্নীতির অন্যতম ক্ষেত্র। আমাদের দেশ ও সমাজে এটা একটু বেশি হয়। তা দমনে ইসলামের রয়েছে সুন্দর নীতিমালা। হাদিসে এসেছে হুজুর সা: বলেন- ঘুষদাতা এবং গ্রহীতার ওপর আল্লাহর অভিশাপ রয়েছে। অন্যত্র এসেছে ঘুষদাতা এবং গ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামি। (তিরমিজি)।

৫. সরকারি খাজনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনে ইসলাম : সরকারি কর ও খাজনা আদায়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে ইসলাম দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছে। হুজুর সা:-এর সময়কার ঘটনা। একজন খাজনা আদায়কারী খাজনা জমা দেয়ার সময় বলল- এ অংশটুকু সরকারি কোষাগারে, আর এ অংশটুকু জনগণ কর্তৃক আমার জন্য হাদিয়া। এ কথা শুনে রাসূল সা: বললেন- এ অংশটুকু যদি তোমার হাদিয়াই হয়ে থাকে তাহলে তুমি ঘরে বসে থাকো দেখি কে তোমাকে হাদিয়া দেয়। (বুখারি, মুসলিম)।

ইসলামে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি

যারা দুর্নীতি করে এবং যাদের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের সম্পর্কে ইসলাম কঠোর শাস্তির নির্দেশনা দিয়েছে। সম্ভব হলে তাদের কাছ থেকে মাল আদায় করে প্রকৃত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া। তা না হলে তাদের থেকে মালের ক্ষতিপূরণ আদায় করা। আর তা না হলে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি বিক্রি করে তা আদায় করবে। যদি এও সম্ভব না হয় তবে বিচারক যা ভালো মনে করবেন সে অনুযায়ী দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দেবেন। তবে অবশ্য সে শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর হতে হবে (আল হিদায়া)।

দেশ ও সমাজকে প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে ইসলামী আদর্শের বিকল্প নেই। যদি আমরা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি, হুজুর সা:-এর সুমহান জীবনাদর্শকে নিজেদের ব্যবহারিক জীবনে বাস্তবায়ন করি তাহলে সত্যিকারার্থেই আমাদের সমাজ থেকে দুর্নীতি অপসারিত হবে। পরস্পর সৃষ্টি হবে শান্তি সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর সমাজে বাস করতে পারব পরম শান্তিতে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের দুর্নীতিমুক্ত একটি সুন্দর সুশীল সমাজ গড়ার তৌফিক দিন। আমিন।

লেখক : মাওলানা এমদাদুল হক তাসনিম, প্রবন্ধকার