ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

দোয়া ইবাদতের প্রাণ

আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হলো দোয়া। আল্লাহর রহমতের ভাণ্ডার বান্দার জন্য সব সময় খোলা থাকে। আল্লাহর কাছে চাইলে আল্লাহ খুশি হন। সূরা মুমিনের ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন ‘তোমরা আমাকে ডাকো; আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো।’ ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।’ (সূরা বাকারা : ১৫২)। তাই আমাদের বেশি বেশি করে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে এবং চাওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।

রাসূল সা: বলেন ‘আল্লাহর কাছে বান্দার দোয়া অপো অধিক মূল্যবান জিনিস আর নেই।’ পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন ‘হে নবী, আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তখন আপনি তাদের বলে দিন আমি এত নিকটবর্তী যে কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি অর্থাৎ তার দোয়া কবুল করি। সুতরাং তারা আমার কথা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করুক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক যাতে তারা সঠিক পথে এসে যায়।’

বান্দার জন্য আল্লাহর রহমতের ভাণ্ডার খোলা থাকে। সুতরাং চেয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা অনেক সময় আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে মন্ত্রী, এমপি বা চেয়ারম্যানের কাছে যখন যাই তখন হাতজোড় করে এবং অনেক কাকুতি-মিনতি সহকারে চাই। কিন্তু আল্লাহ হলেন সারা জাহানের মালিক, আসমান ও জমিনের মালিক, আমাদের পালনকর্তা, আমাদের ত্রাণকর্তা, সর্বোপরি আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তার কাছে চাইতে হবে সম্পূর্ণ একাগ্রচিত্তে ও কাকুতি-মিনতি সহকারে। উদাসীন ও অমনোযোগী হয়ে চাইলে হবে না। চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। চোখে পানি না এলে ভান করতে হবে।

দোয়া কবুলের শিষ্টাচারগুলো আমাদের আগে জানতে হবে। তা হলো আমাদের উপার্জিত অর্থ হালাল হতে হবে। গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি দিয়ে যেমন কোনো লাভ নেই, তেমনি হারাম দেহ, হারাম পোশাক পরে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। দোয়ার শুরুতে দরুদ শরিফ পাঠ করা, কেবলামুখী হয়ে নামাজের আদবে বসে দোয়া করা। এ ছাড়াও দোয়ার শুরুতে ও শেষে আল্লাহর গুণগান এবং তার প্রশংসা করা। একে অন্যের জন্য দোয়া করলে তা বেশি কবুল হয়। আসলে দোয়া করতে হবে নিজের অমতা, দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করে।

রাসূল সা: বলেন ‘বহু হতাশাগ্রস্ত পেরেশান মানুষ আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে দোয়া করে থাকে। দোয়ায় তারা ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ বলে আহাজারি করতে থাকে। কিন্তু তাদের খাবার, পানীয়, পোশাক-আশাক হারাম; সুতরাং এহেন অবস্থায় কিভাবে তাদের দোয়া কবুল হয়?’

দোয়া করে বেশি তাড়াহুড়া করা ঠিক নয়। আমাদের অনেকের ভেতরে এ ধারণা দেখা দেয় যে, আমি তো অনেক দোয়া করেছি, কিন্তু তা তো কবুল হলো না। সব কিছু ঠিকঠাক রেখে আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে দোয়া করলে তা অবশ্যই কবুল হবে। আমাদের একটা বিষয়ে জানা দরকার তা হলো, আমরা অনেক সময় এমন কিছু চেয়ে বসি যা আমার জন্যই কল্যাণকর নয় এবং সেটা আল্লাহ ভালো করেই জানেন। এ েেত্র আল্লাহ পাক তার প্রত্যাশিত জিনিসটি না দিয়ে তাকে এমন একটা জিনিস দেন যা তার জন্যই স্থায়ীভাবে কল্যাণ ও শান্তি বয়ে নিয়ে আসে।

তাই নবী করিম সা: বলেন যখন মুসলমান দোয়া করে ততণ তা সম্পর্ক ছেদ কিংবা কোনো গুনাহের কাজের দোয়া না করে, ততণ আল্লাহর প থেকে তিন বিষয়ের কোনো একটা অবশ্যই তার জন্য প্রাপ্ত হয়ে থাকে। তা হলো

১. তার প্রত্যাশিত জিনিসটি পেয়ে যায়,

২. কিংবা তার পরিবর্তে তার ওপর কোনো বিপদ আপদ এলে তা দূর করে দেয়া হয়,

৩. এবং পরকালে ওই পরিমাণ আমল তার আমলনামায় লেখা হয়। তাই আমাদের বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। দোয়া হলো ইবাদতের মূল।

রাসূল সা: বলেন ‘দোয়া ইবাদতের মগজস্বরূপ।’ প্রিয় নবী সা: আরো বলেন ‘তাকদিরের লিখন কেবল দোয়ার দ্বারাই খণ্ডন করা যায়।’ (তিরমিজি)।

পিতামাতার তাদের সন্তানের জন্য দোয়া করা, কারণ পিতামাতার দোয়া কবুল হয়, আর অনেকের দোয়া যা আল্লাহ কবুল না করে পারেন না, তারা হলেন রোজাদারের ইফতারির সময়ের দোয়া, মজলুমের দোয়া, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া, আল্লাহর ওলিগণের দোয়া, হাজীগণের বাড়ি ফেরার দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত লোকের দোয়া, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য যে দোয়া করে, যে সন্তান পিতামাতার খেদমত করে তার দোয়া।

এ ছাড়া এমন অনেক সময় ও জায়গা আছে যেখানে দোয়া করলে আল্লাহর রহমত তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ে। এমন অনেক সময় আসে যে সময় আল্লাহ তার বান্দার দোয়া কবুল করার জন্য বাহানা তালাশ করেন। আল্লাহ ডেকে ডেকে বলেন ‘কে আছো অসুস্থ, আমি তাকে সুস্থতা দান করব। কে আছো অভাবগ্রস্ত, আমার কাছে চাও আমি তার অভাব দূর করব।’

দোয়া করার বিশেষ কিছু সময় হলো:

  • তাহাজ্জুদ নামাজের সময়,
  • শবে কদরের রাতে,
  • মাহে রমজানের দিনে ও রাতে
  • বায়তুল্লাহ শরিফের ওপর যখন নজর পড়ে,
  • জমজমের পানি পান করার সময়,
  • আরাফার দিনে,
  • আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়,
  • জিহাদে অবস্থানকালে,
  • নফল নামাজের সিজদায় অবস্থানকালে,
  • জিকিরের মজলিসে যে দোয়া করা হয়,
  • নামাজে ইকামত বলার সময়,
  • আল্লাহর রহমতের বৃষ্টি যখন বর্ষিত হয়,
  • মোরগ ডাকার সময়ের দোয়া,
  • জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের দোয়া,
  • প্রতি শুক্রবার ও শনিবার আছরের নামাজ থেকে ও মাগরিবের আগ পর্যন্ত দোয়া,
  • সালাতের ভেতর সূরা ফাতেহা পাঠ শেষে আমিন বলার সময়ের দোয়া।

রাসূল সা: বলেন ‘যে আল্লাহর স্মরণ করে এবং যে আল্লাহর স্মরণ করে না, তাদের তুলনা জীবিত ও মৃতের মতো।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

আমরা কেন দোয়া করব

১. দোয়া কবর আজাব থেকে মুক্তি দেয়,

২. দোয়ায় রিজিক বৃদ্ধি পায়,

৩. দোয়ায় আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়,

৪. দোয়ায় ঈমান পাকা হয়,

৫. আল্লাহর ওপর ভরসা ও নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়,

৬. অন্তর তাজা থাকে,

৭. শয়তানের মোকাবেলা করা সহজ হয়,

৮. জাহান্নাম থেকে রা এবং জান্নাত লাভ সহজ হয়,

৯. আল্লাহ তার রহমতের হাত বাড়িয়ে দেন,

১০. দোয়া বা আল্লাহর স্মরণ দান থেকে উত্তম।

লেখক : মাহমুদুর রহমান,  প্রবন্ধকার