ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

দ্বীনের পথে অবিচল থাকা

বিজ্ঞানীদের স্বল্পজ্ঞান বলছে, এই পৃথিবীর বয়স ৪.৫ বিলিয়ন বছর হয়ে গেছে (দেখুন : উইকিপিডিয়া)। আসলে এই পৃথিবীর বয়স যে কত হয়েছে, তা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। হজরত আদম আ: পৃথিবী সৃষ্টির ঠিক কত বছর পর প্রেরিত হন, তাও আমাদের জ্ঞানের বাইরে। তবে আমরা এতটুকু জানি, আল্লাহ তায়ালা মানবকুলের মধ্যে সর্বপ্রথম হজরত আদম আ:-কে সৃষ্টি করেন। হজরত আদম আ:-এর সৃষ্টি যখন, পবিত্র ইসলাম ধর্মেরও সৃষ্টি তখন। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে যদি হজরত আদম সৃষ্টি হয়ে থাকেন, তাহলে ইসলাম ধর্মেরও আগমন ঘটেছিল বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে।

হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে সব নবী-রাসূলই ইসলামের দাওয়াত দেন। সে দাওয়াত ছিল, আল্লাহর একাত্ববাদের প্রতি, আখিরাতের ওপর বিশ্বাসের প্রতি, ভালো ও মন্দ কাজের প্রতিদান প্রাপ্তির প্রতি ইত্যাদি। যুগে যুগে নবী-রাসূলের শরিয়ত ভিন্ন হলেও তাদের দাওয়াতি মিশন ছিল এক ও অভিন্ন। দুনিয়া থেকে নবী কিংবা রাসূল বিদায় নেয়ার পর যিনি নবী-রাসূল হিসেবে এসেছেন তিনিই পূর্ববর্তী নবী-রাসূলের রেখে যাওয়া ধর্মকে জিন্দা রেখেছেন। আগের নবীর দাওয়াতি কাজকে পরবর্তী নবীর জন্য রেখে গেছেন। এভাবে দুনিয়া সৃষ্টির পর লাখ লাখ নবী ও রাসূল যুগে যুগে দুনিয়ায় এসে ইসলাম ধর্মকে বুলন্দ করেছেন।

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা: হলেন নবী-রাসূলদের সেই সিলসিলার সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তাঁর পরে আর কোনো নবী ও রাসূল আসবেন না। হজরত আদম থেকে শুরু হওয়া ইসলাম ধর্ম যুগে যুগে সংযোজন-বিয়োজন হওয়ার পর নবী মুহাম্মদ সা:-এর জামানায় পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তথা ‘আজ তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করলাম আর ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে চয়ন করলাম’ (সূরা আল-মায়িদা : ০৩ আ:)। সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা:-এর মাধ্যমে পূর্ণতা পাওয়া এই ধর্ম কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

ইসলাম ধর্মের আগমন থেকে আজ পর্যন্ত বহু বছর পার হয়ে গেছে। কোটি কোটি বছরের পথপরিক্রমায় এই ধর্ম বহু ঘাতপ্রতিঘাতের শিকার হয়েছে। কাফির মুশরিকেরা বহু ষড়যন্ত্র করেছে এই ধর্মকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে দেয়ার জন্য। কিন্তু কেউ এই শ্বাসত ধর্মকে বিলীন করতে পারেনি। উল্টো যারা ইসলামকে উৎখাত করতে এসেছে তারাই উৎখাত হয়েছে আল্লাহর এই জমিন থেকে। কোনো প্রতাপশালী, কোনো পরাক্রমশালী, কোনো ধনবান, কোনো রাজা-বাদশা এই ধর্মের এক চুলপরিমাণ তি করতে পারেনি। ইতিহাস স্যা দেয়, আদ সামূদ জাতি ছিল পৃথিবীর অন্যতম পরাক্রমশালী জাতি। অতি প্রাচীন যুগেও যারা পাথর উৎকীর্ণ করে বিশাল বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করে বসবাস করত। ইসলামবিরোধিতার কারণে আল্লাহ তাদেরকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন।

প্রতাপশালী বাদশাহ ফেরাউনের কথা কে না জানে? মুসাকে ঠেকানোর জন্য সে কতই না উপায় অবলম্বন করেছিল। নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যার নির্দেশও দিয়েছিল সেই অভিশপ্ত ফেরাউন। আল্লাহ দুনিয়ার সবাইকে তাঁর মতা দেখিয়ে দিলেন। মুসাকে ফেরাউনের ঘরেই লালন-পালনের ব্যবস্থা করলেন। যে ফেরাউন ইসলাম প্রতিরোধের জন্য মুসাকে হত্যার ফন্দি আঁটলো সেই মুসাকেই আল্লাহ ফেরাউনের ঘরে তুলে দিলেন। অনেক লম্বা কাহিনী। আল্লাহর ধর্ম ইসলাম আর মুসা আ: বিজয় লাভ করল। আর অভিশপ্ত ফেরাউন ধ্বংস হয়ে গেল। কালের সাী হিসেবে তার লাশ এখনো মিশরের পিরামিডে আছে। হজরত নূহ আ:-এর ছেলের কাহিনীও অতি পরিচিত। অনেক হম্বিতম্বি করেছিল সে। কিন্তু নূহের প্লাবন থেকে সে নিজেকে রা করতে পারেনি। ঈমানদারদের বিজয় হয়েছিল সেদিন।

হজরত ইবরাহিম আ:-কে কাফের মুশরিকরা আগুনে নিপে করে দাঁত কেলিয়ে হেসেছিল। কিন্তু আল্লাহ হেসেছেন আসমানে বসে। তিনি আগুনকে নির্দেশ দিলেন, ‘হে আগুন, তুই ইবরাহিমের জন্য ঠাণ্ডা ও নিরাপদ হয়ে যা।’ আগুন আল্লাহর কথা শুনলো। কাফির মুশরিকদের পরাজয় ঘটলো। হজরত ইউসুফ আ. কে নিয়ে তো কম তেলেসমাতি হলো না। আল্লাহ ইউসুফকে হেফাজত করলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজয় হলো। হজরত ঈসা আ:-কে তো ইহুদিরা ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদেরই একজনকে তাদের হাতেই হত্যা করালেন এবং ঈসাকে তাঁর মেহমান হিসেবে আসমানে তুলে নিলেন। এখানেও বিজয় হলো ইসলাম আর ইসলামের নবীর।

যুগে যুগে ইহুদিরা বহু নবীকে হত্যা করেছে সত্য পথে দাওয়াত দেয়ার দায়ে। কিন্তু ইসলাম কি থমকে গিয়েছিল তাতে? ইসলামের জয়যাত্রা কেউ প্রতিহত করতে পারেনি। ইতিহাস তারই স্যা বহন করছে। আবরাহার হস্তীবাহিনী পবিত্র কাবাঘর ধ্বংসের জন্য গিয়েছিল। কাবাঘরের রণাবেণকারীরা আল্লাহর ঘর আল্লাহর কাছে আমানত রেখে দৌড়ে পালিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা আবরাহার সেই বিশাল হস্তীবাহিনীর সাথে ঠাট্টা করলেন। হস্তীবাহিনীকে দমন করার জন্য আবাবিল নামক অতি ুদ্র পাখিকে অলৌকিক ুদ্র এটম বোম দিয়ে প্রেরণ করলেন।  মুহূর্তেই ছারখার হয়ে গেল আবরাহার হস্তীবাহিনী। জিন্দা রইল আল্লাহর ঘর, জিন্দা রইল ইসলাম।

আমাদের প্রিয় নবী এই ইসলাম ধর্ম নিয়ে কম বিপদে পড়েননি। মক্কার যেসব কাফের মুশরিক তাঁকে আলামিন বলে স্বীকৃতি দিলো, সেসব কাফের নবীর প্রকাশ্য দাওয়াত শুনে বলল, ‘হে মুহাম্মদ, তুমি ধ্বংস হও।’ কিন্তু না। মুহাম্মদ ধ্বংস হলেন না, ধ্বংস হলো কাফির মুশরিকরা। রাসূলে আকরাম সা:-এর ৬৩ বছরের জিন্দেগিতে হাজারো বিপদ এসেছে। আল্লাহর সাহায্য আর রাসূলের পর্বতপরিমাণ ধৈর্য কোনো বিপদই তি করতে পারেনি। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের রাতে আবু বকর র: মনে করেছিলেন এই বুঝি খুনির দল আমাদের ছুঁয়ে ফেলবে, এই বুঝি শেষ হয়ে যাবো।

রাসূল বললেন, ‘হে আবু বকর! ভয় পেয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ এবারও আল্লাহ কাফেরদের সাথে ঠাট্টা করলেন। নবীকে হেফাজত করতে তিনি ব্যবহার করলেন মাকড়সার জাল! কাফেরদের মনেই হয়নি ওখানে ওই মাকড়সাওয়ালা গুহায় রাসূল থাকতে পারেন। রাতের অন্ধকারে রাসূল মদিনায় চলে যাওয়ায় মক্কার কাফেররা নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিল। কিন্তু সে খুশি বেশি দিন টিকল না। রাসূল সা: কয়েক বছর পরই মদিনা থেকে মক্কায় এলেন বিজয়ীর বেশে। এবার আর রাতে নয়; তিনি এলেন দিবালোকে, সূর্যের আলোকচ্ছটার মধ্যে। এবার এলেন হাজার হাজার লোক নিয়ে। সবার মুখেই শান্তির বাণী। সবার মুখেই ইসলাম।

আল্লাহও নাজিল করলেন, ‘হে নবী, আপনাকে আমি সুস্পষ্ট বিজয় দান করলাম।’ নবী সা:-এর চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর এবং সাহাবিদের বহু ফেতনা-ফাসাদ, রক্তপাত, অবরোধ, জিঘাংসা মোকাবেলা করতে হয়েছে। দুর্বল ঈমানদাররা কখনো কখনো হয়তো ভেবেছেÑ এই বুঝি আমরা শেষ হয়ে গেলাম, এই বুঝি ইসলাম শেষ হয়ে গেল। কিন্তু না, ইসলাম বিজয়ের বেশে থেকেই গেল। নবী সা: আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত ইসলামের ওপর কত আঘাত এসেছে। মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে। তার পরও ইসলাম ও মুসলমানেরা ফুরিয়ে যায়নি। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা কমবেশি সব মুসলমানকে নাড়া দেয়।

ইয়াজিদ বাহিনী রাসূলের দৌহিত্র হোসাইন রা:, তাঁর পরিবারবর্গ ও সঙ্গীদের ওপর যে নিষ্ঠুর আক্রমণ চালিয়েছিল, তা অতি জঘন্য ও অমানবিক। দুধের শিশু  আসগরও রেহাই পায়নি সেই আক্রমণ থেকে। তার পরও কি ইসলাম থমকে দাড়িয়েছিল? বরং পরবর্তীকালে ইসলামের বিজয় পতাকা পতপত করে উড়েছে বিশ্বের আনাচেকানাচে। আব্বাসীয় শাসনামলে মুসলমানেরা জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখা-প্রশাখায় এমনভাবে চষে বেড়িয়েছে যা আজও বিস্ময় হয়ে আছে। স্পেনে প্রায় সাড়ে ৮০০ বছর শাসন করেছে মুসলমানেরা।

মুসলমানদের আবিষ্কৃৃত সূত্রের ওপর ভর করে আজও টিকে আছে এই বিশ্ব। এপ্রিল-ফুলের ঘটনার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সেই অগ্রযাত্রা শ্লথ হয়েছে বটে, তবে তা একেবারে নিভে যায়নি। মুসলমানেরা আবারো জেগে উঠেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় দিন দিন মানুষ ইসলামের সুশীতল আশ্রয় গ্রহণ করছে। পাশ্চাত্য গবেষক হান্টিংটন পশ্চিমা সভ্যতার জন্য ইসলামকে আগামী শতাব্দীর এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কাফের-মুশরিক ও ইসলামের শত্র“রা তাই উঠেপড়ে লেগেছে ইসলামকে খতম করার জন্য। ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ। একে খতম করার সাধ্য আছে কার? ইসলামের হেফাজতের দায়িত্ব তো আল্লাহ নিয়েছেন। যুগে যুগে বহুজন কুরআন পুড়িয়েছে। কিন্তু কুরআনের একটি হরফও হারিয়ে যায়নি। নকুল কুমার বিশ্বাস এই সত্যকে অনুধাবন করে গান রচনা করেছেন। বলেছেন

যদি আগুন লেগে ধ্বংস হয় পৃথিবীর সব বইয়ের দোকান

তবু বিশ্ব থেকে হারাবে না পবিত্র কুরআন।।

করবে কেমন করে কুরআন ধ্বংস আগুনেরও তেজ

আছে বিশ্ব ভরা ল ল কুরআনের হাফেজ।।

তারা ছাপায়ে আসমানী গ্রন্থ

বাঁচাবে ইসলামের মান

বিশ্ব থেকে হারাবে না পবিত্র কুরআন।।

করল কুরআন নিয়ে কতলোকে আদালতে কেস

লিখল সালমান রুশদী বিদ্বেষপূর্ণ স্যাটানিক ভার্সেস।।

তবু আল কুরআনের নূরের বাতি

সারাবিশ্বে বিদ্যমান

বিশ্ব থেকে হারাবে না পবিত্র কুরআন।।

বাতিল কখনো সত্যকে টপকে যেতে পারে না। তবে সত্যের ওপর থাকলে মাঝে মধ্যে ঝড়ঝাপটা আসবে। আমাদেরকে সেই তুফানের মধ্যে টিকে থেকে ঈমানের পরীায় উত্তীর্ণ হতে হবে। চার দিকে লাশের স্তূপ দেখে ভড়কে যাওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই ওপরে থাকবে (বিজয় তোমাদেরই)।’ যুগে যুগে সব জালেম শাহীর পতন হয়েছে।

অতএব, আল্লাহর ওপর যাদের অবিচল আস্থা আছে তাদের আর ভয় কিসের? ‘যাআল হক্কু ওয়া যাহাক্বাল বাতিলু ইন্নাল বাতিলা কানা যাহুক্বা’Ñ আল্লাহর এই বাণীকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে সামনের পানে। রাসূলের হাদিস, ‘যদি গোটা দুনিয়াবাসি একত্র হয়ে তোমার উপকার করতে চায়, তারা তা পারবে নাÑ যতণ না আল্লাহ তোমার কল্যাণ চান। যদি দুনিয়ার সবাই মিলে তোমার কোনো তি সাধন করতে চায়, তবে তারা তা পারবে নাÑ যতণ না আল্লাহ কোনো তি তোমার জন্য লিখে দেন।’