ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

নফস বা আত্মার বৈশিষ্ট্য

মানব আত্মা বা নফস মহান আল্লাহর এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় সৃষ্টি। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা, গবেষণা ও অনুসন্ধান অহরহ চলছে। মানব জন্মের সাথে তার রূহ বা আত্মা কিভাবে দেহে সংযুক্ত হয় বা প্রবেশ করে তা অদ্যাপি অজ্ঞাত। আত্মা দেহকে সঞ্জীবিত করে তোলে এবং দেহে গতি সঞ্চার করে। অন্য দিকে দেহ ছাড়া আত্মার স্বরূপ অনুভূত হয় না বা জানা যায় না। দেহ-মন একীভূত হয়ে থাকলেও এদের মধ্যে কোনো অনিবার্য সম্পর্ক নেই- আত্মা মুক্ত স্বাধীন স্বতন্ত্র এবং স্বীয় বৈশিষ্ট্যে মহীয়ান। দেহ ছাড়াও আত্মা থাকতে পারে- তবে আত্মা ছাড়া দেহ অচল নির্জীব এবং নিরেট জড় পদার্থ মাত্র।

মানুষের সব ক্রিয়াকাণ্ডের মূলে রয়েছে মন বা আত্মার সক্রিয় ভূমিকা। শরীর বা দেহ আত্মার নির্দেশ পালনের হাতিয়ার স্বরূপ- আত্মার হুকুম তামিল করার জন্য সে সদা প্রস’ত। মনে হলো কমলা লেবু খাবো- মনের এই ইচ্ছা প্রতিপালনের জন্য দেহে গতি সঞ্চার হয় এবং ইচ্ছা পরিপূরণের জন্য দেহ সক্রিয় হয়ে ওঠে : যথা হস্ত সঞ্চালন করে টেবিল থেকে কমলাটি তুলে নেয়া, এর খোসা মুক্ত করা এবং কোষ মুখ গহ্বরে পুরে দেয়া ইত্যাদি। দেহে অবসি’ত আত্মাই এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আত্মার মূলত দু’টি প্রবৃত্তি রয়েছে : সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তি অথবা বলা চলে বুদ্ধিবৃত্তি ও জীববৃত্তি। সুপ্রবৃত্তি মানুষকে ন্যায়, সৎ ও সঠিক পথ নির্দেশ করে অন্য দিকে কুপ্রবৃত্তি মানুষকে অন্যায়, অসৎ ও বিপথে পরিচালিত করে।

মানব জীবনে চলছে : ‘সু’ ও ‘কু’ এই দুই বৃত্তির অভিনব খেলা। ‘সু’ টানছে সত্যের পথে ‘কু’ প্ররোচিত করছে অসত্য ও মিথ্যার পানে। কখনো ‘সু’ মন বা আত্মার ওপর এর প্রভাব বিস্তার করে আবার কখনো কখনো ‘কু’-এর আধিক্য প্রবল হয়ে ওঠে- এই দোদুল্যমানতার ভেতর দিয়েই চলছে জীবনপ্রবাহ। ইসলাম এক পবিত্র ধর্মের মহাগ্রন’ হলো আল-কুরআন আল্লাহর বাণী। সৃষ্টি জগতে এমন কোনো বিষয় নেই যা পবিত্র কুরআনে পরিব্যক্ত হয়নি। মন-আত্মা, রূহ বা নফসসংক্রান্ত বিষয়েও এখানে আলোচিত হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় ‘নফস’-কে সাধারণত ত্রিস্তরে বিন্যস্ত করা হয়। ক. নফসে আম্মারা : কুপ্রবৃত্তিমূলক আত্মা খ. নফসে লাওয়ামাহ : বিবেক তাড়িত বা ধিক্কারজনিত আত্মা এবং গ. নফসে মুতমাইন্না : প্রশান্ত আত্মা বা প্রফুল্ল চিত্ত।

নফসে আম্মারা : পবিত্র কুরআনে সূরা ইউসুফে ২৪ নম্বর আয়াতে (১২:২৪) বর্ণিত হয়েছে : ‘নিশ্চয় মানুষের মন মন্দকর্মপ্রবণ’ প্রসঙ্গটি এসেছে নবী হজরত ইউসুফ-আ:-এর মন্দকর্মপ্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে যাওয়ার বিষয়কে ইঙ্গিত করে। নানান ঘটনা-প্রবাহের মধ্য দিয়ে হজরত ইউসুফ-আ: মিসর-রাজ আবদুল আজিজের আশ্রয়ে আসেন- সেখানে আজিজ-পত্নী জোলায়খা হজরত ইউসুফ আ:-এর রূপ-সৌন্দর্যে আসক্ত হয়ে তার স্বীয় কুবাসনা চরিতার্থ করার জন্য হজরত ইউসুফ আ:-কে প্ররোচিত করেন- ইউসুফ আ:কে আল্লাহ তায়ালা হেফাজত করছেন।

বিচিত্র এই জগতে এমন অনেক কিছু রয়েছে যা আপাত দৃষ্টিতে লোভনীয় আকর্ষণীয় বলে প্রতীয়মান হয় আসলে এগুলো সত্য নয়। সত্যের আড়ালে মিথ্যা। মানুষ সহজেই এ সবে আকৃষ্ট হয় এবং ভুল ও বিপথে পরিচালিত হয়। দু’টি বিশেষ গুণ সাধারণত মানুষকে পরিচালিত করে : জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি। মানুষকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বুদ্ধিসম্পন্ন জীব হিসেবে- মানুষ মূলত : জীব এবং জীবের সব বৈশিষ্ট্যই তার মধ্যে বর্তমান- তবে বুদ্ধি-বিবেক বা সুআত্মা নামক এক অতিরিক্ত গুণ দিয়ে মানুষকে বিভূষিত করা হয়েছে এবং তাকে অন্যান্য জীব-জানোয়ার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে রাখা হয়েছে। এই বিবেক-বুদ্ধির কারণেই মানুষ, মানুষ নামে অভিষিক্ত- শুধু তা-ই নয়, সে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পরিচিত।

বুদ্ধির প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান জীববৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা যাতে করে হীন-নীচ-কদর্য বৃত্তিগুলো প্রকটিত হয়ে না ওঠে এবং তাকে বিপথে পরিচালিত করতে না পারে। কিন’ বাস্তব জীবনে ক্ষণস’ায়ী সুখের প্রলোভন এত অপরূপ সাজে সজ্জিত করে রাখা হয়েছে, মানুষ স্বভাবতই এতে আকৃষ্ট হয় এবং নিজ পতন ডেকে আনে যেমন অগ্নির প্রোজ্বল আলোতে পতঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নিজ মরণ ডেকে আনে। এখানে নফসের যে অংশটুকু মুখ্য ভূমিকা পালন করে তা হলো নফসে আম্মারা অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তিমূলক আত্মা।

এই আত্মার জীব বা পশুবৃত্তির আধিক্য অত্যন্ত প্রবল- ফলে তা স্বভাবগতভাবেই মানুষকে মন্দ- অর্থাৎ অসৎকর্মে প্ররোচিত করে। এই আত্মার প্রবল প্রভাবে আত্মার বুদ্ধির অংশ নিস্তেজ হয়ে পড়ে- বিবেকের ক্রিয়া-তৎপরতা নিষ্প্রাণ হয়ে যায়। মন্দ-অশ্লীল খারাপ অন্যায় কুপ্রবৃত্তি ও কুবাসনাজনিত কর্মগুলোকে এমন সুশোভিত করে প্রদর্শন করা হয় যে মানুষ সহজেই এতে প্রলুব্ধ হয় এবং নিজেকে পাপে নিমজ্জিত করে ফেলে। মন্দ বা অসৎ কর্মে লিপ্ত হওয়ার পানে এই আত্মার প্রবণতা বা ঝোঁক থাকে বেশি। যারা এ অবস’া থেকে নিজেদের কিছুটা মুক্ত বা উত্তরণ ঘটাতে পারেন তারা আত্মার পরবর্তী স্তর অর্থাৎ নফসে লাওমাহ-তে উন্নীত হন কাজটি কঠিন তবে অসাধ্য নয়।

নফসে লাওয়ামাহ- বিবেক তাড়িত বা ধিক্কারজনিত আত্মা : সূরা কিয়ামাহের ২ নম্বর আয়াতে (৭৫:২) উক্ত হয়েছে ‘ওলা ওকসেমু বি নাফসে লাওয়ামাহ’ অর্থাৎ আরো শপথ করি সেই মনের যে ধিক্কার দেয়।’ আয়াতে প্রথমেই শপথ নেয়া হয়েছে সে-ই মনের যা পাপের জন্য ভর্ৎসনা করে। আল্লাহ যখন কোনো বিষয়ের ওপর শপথ নেন তখন সে-ই বিষয়ের মাহাত্ম বা গুরুত্ব বোঝাতে গিয়েই তা করা হয়। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে এর উল্লেখ রয়েছে : যেমন মৃদু সঞ্চারিত বায়ুর শপথ ৭৭:১ আকাশের ও আগমনকারীর শপথ ৮৬:১ ইত্যাদি। উল্লিখিত আয়াতে বিবেক তাড়িত আত্মার’ মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্যই এর শপথ নেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে : বিবেক তাড়িত বা ধিক্কারজনিত আত্মা বলতে কী বোঝায়? আত্মার এই স্তরে বুদ্ধি সক্রিয় হয়ে ওঠে। বুদ্ধি বা বিবেক যা নফসে আম্মারার প্রভাব অবদমিত ছিল তা এবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং জীব বা পশুবৃত্তিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হয়। এই অবস’া আত্মা সু-কু ন্যায়-অন্যায় ভালো-মন্দ সৎ-অসৎ-এর মধ্যে ক্ষীণ পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হয় এবং নিজ কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ করতে পারে। নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দেয়, তিরস্কার করে। ধিক্কারটি দুই তরফ থেকে হয় : ক. অসৎ কর্মের জন্য ভর্ৎর্সনা খ. সৎ কর্মের জন্য তিরস্কার।

অসৎ কর্মের জন্য ধিক্কার হচ্ছে এই কারণে যে তার বোধশক্তি হয়, অনুশোচনা হয় কেন সে এই অপকর্মটি করল- সে তো নিজেকে সংবরণ করতে পারত- সে তো ভালো কাজও করতে পারত। সৎ কর্মের জন্য আত্মা ধিক্কার দেয় এই কারণে যে তার পুঁজিতে সৎ কর্মের পরিমাণ আরো বেশি মজুদ নেই কেন? সুফি সাধকরা বলেন : নফস স্বভাবগত ও মজ্জাগতভাবে মন্দপ্রবণ- তবে ঈমান, আমলে সালেহা এবং সাধনার দ্বারা তা নফসে লাওয়ামাতে উন্নীত হওয়া যায়- তবে মন্দ প্রবণতা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। ক্রমাগত সৎকর্ম এবং ঈমান বৃদ্ধির ফলে সৎকর্ম যখন ব্যক্তির মধ্যে স’ায়ীরূপ লাভ করে তখন তা আত্মার পরবর্তী স্তর অর্থাৎ নফসে মুতমাইন্না- প্রশান্ত আত্মাতে উপনীত হয়।

নফসে মুতমাইন্না : প্রশান্ত আত্মা: সূরা ফজরের ২৭-৩০ নম্বর আয়াত ৮৯:২৭-৩০-এ নফসে মুতমাইন্নার প্রসঙ্গ পরিব্যক্ত হয়েছে : বলা হয়েছে ‘হে প্রশান্ত মন। তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন’ষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’ এসব আয়াতে স্বভাবত যেসব প্রশ্ন উদয় হয় : ক. প্রশান্ত আত্মা বলতে কী বোঝায়? খ. এ আত্মার অবস’ান আসলে কোথায়? গ. এ আত্মা কার সংস্পর্শে থাকে? ঘ. জান্নাত কী? প্রশান্ত আত্মা হচ্ছে আমাদের বর্ণিত ত্রিস্তর আত্মার সর্বোচ্চ ধাপ। এই স্তরে আত্মা থাকে সর্বপ্রকার কলুষতা থেকে মুক্ত- এ বিশুদ্ধ পবিত্র ও খাঁটি আত্মা।

পশুবৃত্তি ও জীববৃত্তি এবং সব প্রকার কুপ্রবৃত্তিগুলো এখানে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যায়- বুদ্ধি ও বিবেকের প্রাধান্য এখানে অত্যন্ত প্রবল- শুধু তাই নয় ঐশী বা পরমাত্মার জ্যোতিতে বুদ্ধিও এই পর্যায়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়- এ হচ্ছে নির্মোহ আত্মা। ঈমান, আমলে সালেহা ও ধারণার সমন্বয়ে সাধক এ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন। আল্লাহর গভীর ধ্যান ও প্রেমই হচ্ছে এই আত্মার বৈশিষ্ট্য- আল্লাহর জিকর ও স্মরণ ছাড়া এই আত্মায় আর কিছুই থাকে না। সাধক যখন তার ইবাদতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন এবং তার ইবাদতে পরিমাত্রা আল্লাহও পরিতুষ্ট হন তখন তা প্রশান্ত মন বা প্রশান্ত চিত্ত হয়ে যায়।

আল্লাহ এরূপ আত্মাকেই নির্দেশ দেন তার মূলে ফিরে যেতে অর্থাৎ যেখান থেকে তার আগমন (মহান আল্লাহর পানে- পরমাত্মায়)। তিনি আরো নির্দেশ দেন আল্লাহর পছন্দিত আত্মার সাথে এরা যেন বসবাস করে- সংসর্গ করে সে-ই সুমহান স’ানে অর্থাৎ এর প্রকৃত আবাসস’লে যেমন বেহেশত বা জান্নাতে। আল্লাহ রূহকে নিজের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। কোনো উপকরণ ছাড়া মানবাত্মা আল্লাহর আদেশে সৃষ্টি হয়েছে- এর মধ্যে আল্লাহর জ্যোতি বা নূর গ্রহণ করার যোগ্যতা রয়েছে যা মানুষের ছাড়া অন্য কোনো জীবাত্মার নেই। মানব সৃষ্টির উপকরণ দশটি-পাঁচটি সৃষ্ট জগতের- পাঁচটি আদেশ জগতের। সৃষ্ট জগতের উপাদান হচ্ছে : অগ্নি, পানি, মৃত্তিকা, বায়ু এবং পঞ্চমটি হচ্ছে এদের থেকে সৃষ্ট সূক্ষ্ম বাষ্প যাকে মর্তজগতে রূহ বা নফস বলা হয়। আদেশ জগতের পাঁচ উপকরণ হচ্ছে। কলব, রূহ, সির, খফি ও আখফ।

এত সব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পরও আত্মার স্বরূপ উদঘাটন সহজসাধ্য নয়- এ প্রকৃতই এক রহস্যময় বিষয়। পবিত্র কুরআনে এই রহস্যকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ রাসূল সা:-কে উদ্দেশ করে বলেন : ‘তারা আপনাকে রূহ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিন : রূহ আমার পালনকর্তার আদেশে গঠিত। এ বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান দান করা হয়েছে। ১৭:৮৫। আসলে মানুষকে আত্মা সম্বন্ধে অতি অল্প জ্ঞান দান করা হয়েছে।

লেখক : প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হালিম, সাবেক অধ্যক্ষ, এমসি কলেজ, সিলেট