ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

নবজাতকের খাদ্য সম্পর্কে সুন্নাহ

নবজাতকের খাদ্য সম্পর্কে সুন্নাহইসলাম শিশু ও মাতৃত্বের রণাবেণে যে গুরুত্ব প্রদান করেছে, আধুনিক সময়ের জাতিসঙ্ঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার গৃহীত পদপে তার ধারে কাছেও নেই। শিশু অধিকার তার জন্মের পর থেকে শুরু হয় না; বরং এ অধিকার তার পিতামাতার বিবাহের আগে থেকে শুরু হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিবাহের জন্য সৎ ও খোদাভীরু জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামে বংশরা ও পরিবার গঠনের জোরালো নির্দেশ দেয়া হয়েছে।







সন্তানের লালনপালনকে পিতামাতার ওপর আবশ্যক করা হয়েছে। লালনপালনের এ নির্দেশ শুধু উত্তম নৈতিকতা গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানসিক ও শারীরিক প্রবৃদ্ধিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। শিশুর গর্ভধারণ, গর্ভপাত, দুধপান ও প্রবৃদ্ধির সময়কালে সামগ্রিকভাবে যতœবান হওয়াই এ নির্দেশের উদ্দেশ্য। শিশুর শারীরিক প্রবৃদ্ধি ও সুস্থতার জন্য ইসলাম যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, তার অন্যতম হলো নবজাতকের মুখে মিষ্টিদান।

ইমাম বুখারি আসমা বিনতে আবি বকর রহ: থেকে বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, আমি মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে এমন অবস্থায় বের হলাম যে আমি ছিলাম পরিপূর্ণ (তার অন্তঃসত্ত্বা পূর্ণতায় পৌঁছে গিয়েছিল অর্থাৎ ৯ মাস পূর্ণ হয়েছিল) মদিনায় পৌঁছে আমি কুবায় অবস্থান নিলাম এবং সেখানেই আমার গর্ভপাত হলো। আমি আমার ভূমিষ্ঠ শিশুটিকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হলাম; তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। অতঃপর একটি খেজুর আনতে বললেন, তা চিবালেন এবং তার (নবজাতকের) গালে থুথু দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থুথুই সর্বপ্রথম তার মুখে ঢুকল। এরপর তিনি খেজুর চিবিয়ে তার গালে দিলেন এবং তার বরকত কামনা করে দোয়া করলেন। নবজাতকের মুখে খেজুর চিবিয়ে দেয়াকে হাদিসের পরিভাষায় তাহনিক বলা হয়েছে।

বুখারি ও মুসলিমে আবু মুসা আল-আশয়ারি রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমার একটি ছেলে জন্ম গ্রহণ করল; তাকে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে এলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইব্রাহিম এবং খেজুর চিবিয়ে তার গালে দিলেন। ইমাম বুখারি এরপর ‘তার জন্য বরকত কামনা করলেন’ অংশটুকু বৃদ্ধি করেছেন।

বরং এভাবে নবজাতকের মুখে খেজুর চিবিয়ে দেয়া মদিনার একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিল। আয়েশা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কোনো শিশুকে নিয়ে এলে তিনি তার জন্য কল্যাণের দোয়া করতেন এবং তার মুখে খেজুর চিবিয়ে দিতেন। একদা তাঁর কাছে একটি শিশুপুত্র আনা হলে তিনি তার মুখে খেজুর চিবিয়ে দেন। শিশুটি তাঁর কোলে পেশাব করে দেয়, তখন তিনি পানি আনতে বললেন এবং পানি পেশাবের ওপর ছিটিয়ে দিলেন। বুখারি ও মুসলিম।

শিশু জন্মের পর অন্য কোনো কিছু খাওয়া এমনকি মায়ের দুধ পান করার আগে এভাবে খেজুর চিবিয়ে দেয়ার প্রথা চালু ছিল। ইমাম বুখারি ও মুসলিম আনাস রহ: থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উম্মে সুলাইম যখন একটি সন্তান প্রসব করল তখন আমাকে বলল, হে আনাস! তুমি ভোরে উঠে এই শিশুকে রাসূলুল্লাহর দরবারে নিয়ে যাবে তিনি তাকে খেজুর চিবিয়ে দেয়ার আগে সে কোনো কিছু খাবে না।




ওপরের হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবজাতকের মুখে সর্বপ্রথম খাবার হিসেবে খেজুর চিবিয়ে দেয়ার প্রথা চালু করেন। এ কারণে ইসলামি শরিয়তে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিধানে পরিণত হয়েছে। ইমাম নবভি রহ: বলেন, আলেমরা ঐকমত্য হয়েছেন যে, জন্মের পরপরই শিশুকে খেজুর চিবিয়ে দেয়া উত্তম, যদি খেজুর পাওয়া না যায় তবে ওইজাতীয় মিষ্টি কিছু তার মুখে দিতে হবে। তবে খেজুর তথা খুরমা উত্তম। ইবনু হাজর আসকালানি রহ: বলেন, শুকনা খেজুর না পেলে, তাজা খেজুর, তাও না পাওয়া গেলে মিষ্টিজাতীয় অন্য কিছু। তবে মধু অন্য সব কিছু থেকে উত্তম, এরপর উত্তম হলো ওই সব জিনিস যা আগুনের সাহায্যে তৈরি নয়।

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

নবজাতকের রক্তে ‘গ্লুকোজের’ পরিমাণ আনুপাতিকভাবে অনেক কম থাকে। নবজাতকের ওজন যত কম হয় তার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও তত কম হয়। বিশেষত নবজাতক যদি অপরিণত (নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মগ্রহণকারী) হয়, তাদের েেত্র এর মাত্রা আরো কমে যায়। দেখা যায় বেশির ভাগ েেত্র এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে ২০ মিলিগ্রামেরও কম। যেসব শিশুর ওজন আড়াই কেজির বেশি, তাদের েেত্র দেখা যায় রক্তে সুগারের মাত্রা ৩০ মিলিগ্রামের কাছাকাছি। রক্তে সুগারের েেত্র এ মাত্রা (২০ বা ৩০ মিলিগ্রাম) নিতান্তই অপ্রতুল। আর এ কারণে নিচের সমস্যাগুলো দেখা যায় :

১. নবজাতক দুধপান করতে চায় না। ২. মাংসপেশির শৈথিল্য। ৩. শ্বাসকষ্ট (অ্যাজমা) ও শরীর নীল হয়ে যাওয়া। ৪. কম্পন, খিচুনি ও ধনুষ্টংকারের প্রকোপ।

এসব উপসর্গ নিচের স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে:

১. বিলম্বিত দৈহিক প্রবৃদ্ধি। ২. মানসিক প্রতিবন্ধকতা। ৩. মস্তিষ্কের পাঘাত (Brain Paralysis) ৪. চোখ বা কান অথবা উভয়টিই নষ্ট হওয়া। ৫. স্থায়ী ধনুষ্টংকার।

যথাসময়ে এর চিকিৎসা না হলে শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। যদিও এর চিকিৎসা অতি সহজ ও সুলভ; আর তা হলো পানিতে মিশ্রিত করে তার শরীরে গ্লোকুজ ঢুকানো চাই, তা মুখ দিয়ে হোক বা শিরা দিয়ে হোক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নিজ মুখে খেজুর চিবিয়ে তার লালামিশ্রিত চর্বিত খেজুর নবজাতকের মুখে দেয়ার মধ্যে রয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ হিকমত। খেজুরে পর্যাপ্ত মাত্রায় ‘গ্লুকোজ সুগার রয়েছে। বিশেষত চর্বনের মাধ্যমে একে তরল করা হলে এটি উৎসেচকে (Enzyme) পরিণত হয়। যা দ্বৈত গ্লোকুজ (Bio-sucrose) থেকে একক গ্লোকুজে (Mono-Glucose) পরিণত হয়ে যায়। যেহেতু এটি চর্বনের মাধ্যমে তরল করা হয়, তাই এটি শিশুদের উপযোগীও হয়।

জন্মের পরপরই বেশির ভাগ বরং প্রত্যেক শিশুই প্রকাশ্যভাবে গ্লুকোজ বা সুগারের মুখাপেী থাকে বিধায় চর্বিত তরল খেজুর আল্লাহর হুকুমে শিশুর সেই শূন্যতা দূর করে ওপরের মারাত্মক ব্যাধি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

নবজাতকের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম হলে এর তিকারক প্রভাব সম্পর্কে মানুষ অবগত হলেও খেজুরের মাধ্যমে নবজাতককে মিষ্টিমুখ করা যে এর এক গুরুত্ববহ প্রতিষেধক বরং এক বিস্ময়কর চিকিৎসা তা মানুষ এত দিনে জানত না। নবজাতক বিশেষত অপরিপক্ব শিশু সন্দেহাতীতভাবে তার জন্মের পরপরই সুগারের মুখাপেী বিধায় বর্তমানে মাতৃসদনে (Maternity Hospital) শিশুর জন্মের পরপরই মায়ের দুধ খাওয়ানোর আগেই গ্লুকোজ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে থাকে। এর পরই তার মা তাকে দুধ পান করায়।

নবজাতকের মিষ্টি খাওয়ানোসংক্রান্ত হাদিসগুলো নবজাতক বিশেষত অপরিপক্ব নবজাতকের রক্তে গ্লুকোজের স্বল্পতায় সৃষ্ট বিভিন্ন তিকারক রোগ থেকে বাঁচাতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ভীত রচনা করেছে। নবজাতকের জন্মের পরপরই তাকে তরল সুগার খাওয়ানো এসব মারাত্মক, জটিল ও স্থায়ী রোগের সমাধান। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন এক বিস্ময়, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানায় তো দূরের কথা, বিগত দেড় হাজার বছর পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি; বরং বিংশ শতাব্দীতে এসে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এ তিব্বে নববির (Prophetic Medicine) অন্তর্নিহিত রহস্য।

%d bloggers like this: