ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

নবীজী (সা.) যখন বিচারক

মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সালল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন পরিপূর্ণ মহামানব। একজন পূর্ণাঙ্গ মহামানব হিসেবে তিনি যেমন একজন ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক, তেমনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারপতি। দক্ষতার সঙ্গে তিনি যেমন প্রশাসন পরিচালনা করেছেন, তেমনি ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে বিচার ব্যবস্থা পরিচালনার নজিরও তাঁর রয়েছে। তিনি জীবদ্দশায় আল্লাহর বিধান অনুযায়ী অনেক বিচার-ফয়সালা করেছেন।

পক্ষপাতিত্ব, প্রভাবিত, আবেগতাড়িত হয়ে কোনো বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন এমন একটি ছোট্ট ঘটনাও তাঁর বিচার জীবনের ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। তিনি ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করতে গিয়ে কোনোদিন নিজের আহাল, আত্মীয়-পরিজন ও জলিল-কদর কোনো সাহাবির পক্ষও অবলম্বন করেননি। তিনি বলতেন, যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করে, তবে আমি তার বেলায়ও হাত কাটার নির্দেশ দেব।’ এজন্য তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠতম মহামানবের পাশাপাশি একজন শ্রেষ্ঠ বিচারপতিও বটে। তাঁর এ ন্যায়বিচারের কারণেই হাজরা থেকে সান’আ পর্যন্ত সুন্দরী তনয়া, মূল্যবান অলঙ্কার পরিহিতা, একাকিনী দিনে-রাতে পথ চলেছেন, কেউ তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবে তো দূরের কথা, তার দিকে চোখ তুলে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করত না। তাঁর জীবদ্দশায় কয়টি বিচার তাঁর আদালতে এসেছে জানা না থাকলেও অবশ্যই তা নগণ্যই হবে।

কারণ সমাজ ও সভ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, অপরাধপ্রবণতা একেবারেই কমে গিয়েছিল। মানুষ অপরাধ করলে বিবেকের অবিরত কষাঘাত সহ্য করতে না পেরে নিজের মামলা নিজেই দায়ের করত। প্রসিদ্ধ সেই মহিলার ঘটনা আমরা জানি যে যেনা করে রাসুলের (সা.) বিচারালয়ে নিজের কৃত অপরাধের বিচার প্রার্থনা করলেন। বিচারপতি রাসুল (সা.) প্রথমত সন্তান প্রসব, দ্বিতীয়ত আড়াই বছর দুগ্ধ পান করানোর নির্দেশ দিলেন। তখন মহিলা কেঁদে কেঁদে এই ভয়ে চলে গেলেন যে, এ সময়ের মধ্যে যদি আমি বিনাবিচারে মৃত্যুবরণ করি তবে আহকামুল হাকিমিন মহান আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় কী জবব দেব। এই ছিল একজন শ্রেষ্ঠ বিচারপতির ন্যায়বিচারের সামাজিক প্রভাব।

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ইনসাফ ও ন্যায়বিচার দারুণভাবে উপেক্ষিত। সরকার ও সরকারি লোকদের মনমর্জি ও হুকুম তামিল করতে গিয়ে ন্যায়বিচার আজ আদালতের কঠিন দেয়ালে মাথা ঠুকে নিজেকে রক্তক্ত করে। ন্যায়বিচারের করুণ আর্তনাদ ও গগণবিদারী কান্না শোনা যায় চারদিকে। কত নিরপরাধ নিরীহ বনি আদম ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে চার দেয়ালের ভেতর পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে? মানবতা বা মানবিক মূল্যবোধ তো আজ নির্বাসিত। আদালতকে বলা হয় মানুষের ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখানে এসে দেখা যায়, মানবতার সঙ্গে কী পরিমাণ অসদাচরণ করা হয়।
এ পর্যায়ে রাসুলের (সা.) যুগে কয়েকটি বিচার-ফয়সালা উল্লেখ করা হলো।

প্রভাবশালী ও দুর্বলের বিচার ব্যবস্থা
* বুখারি-মুসলিমে আছে—একবার মাখজুমি গোত্রের এক কুরাইশি মহিলা চুরি করে ধরা পড়ে। নবী করিম (সা,) তার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। নির্দেশ শুনে লোকজন খুব পেরেশান হয়ে পড়ল। কারণ সেই মহিলা ছিল সম্ভ্রান্ত গোত্রের। তারা বলাবলি করতে লাগল, উসামা ইবনু যায়িদ ছাড়া আর কে আছে, যাকে আল্লাহর রাসুল (সা.) অত্যধিক ভালোবাসেন। তারা উসামাকে (রা.) সুপারিশের জন্য রাসুলের (সা.) কাছে পাঠালেন। যখন তিনি এ ব্যাপারে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কথা বললেন, তখন নবী করিম (সা,) বললেন, ‘হে উসামা! তুমি কি আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা না করার সুপারিশ করতে এসেছো?’ তখন উসামা ইবনু যায়িদ ভয় পেয়ে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন। আমার ভুল হয়েছে।

অতঃপর নবী আকরাম (সা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন। প্রথমে আল্লাহর হামদ ও সানা পেশের পর বললেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকজন এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী লোক চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত এবং দুর্বল লোক চুরি করলে তাকে শাস্তি দিত। ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আজ যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত তবে আমি তার বেলায়ও হাত কাটার নির্দেশ দিতাম।’

* মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকে বর্ণিত হয়েছে—রাসুলে করিম (সা.)-এর কাছে এক ক্রীতদাসকে হাজির করা হলো যে চুরি করেছিল। তাকে চারবার নবী করিম (সা.)-এর কাছে আনা হলে চারবারই তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। পঞ্চমবার তাকে হাজির করা হলে তখন রাসুল (সা.) হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। পরে ষষ্ঠবার হাজির করা হলে তার একটি পা কেটে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সপ্তমবার তার অপর হাত কাটার আদেশ দিলেন। অষ্টমবার তার দ্বিতীয় পাটি কেটে দেন।’

রাসুলের (সা.) আদালতের উল্লিখিত দুটি বিচার এখানে উল্লেখ করার অর্থ হলো তাঁর বিচার ব্যবস্থায় সমাজের প্রভাবশালী বা দুর্বল কোনোটিই প্রভাব ফেলতে পারত না। যা ন্যায়সঙ্গত, যা সঠিক তাই সেখানে বাস্তবায়িত হতো। কিন্তু আজ আমাদের বিচার ব্যবস্থায় কী পরিলক্ষিত হয়। সবলের জয়ধ্বনি আর দুর্বলের মূর্ধাধ্বনি। নিজ দলের দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করার নজিরও দেখা যায়। কিন্তু আল্লাহর দরবার থেকে তাকে কে ছাড়িয়ে আনবে?
একই সঙ্গে মুয়াত্তা, বুখারি ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আরেকটি হাদিসের প্রতি আমরা দৃষ্টি দিতে পারি।

নবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি তো একজন মানুষ। দু’জন ঝগড়াকারী এসে আমার কাছে অভিযোগ করল। যে অপেক্ষাকৃত বেশি বাকপটু আমি তার দিকে রায় দিতে পারি। এই মনে করে যে সে সত্য বলেছে। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন এরূপ না করে। এরূপ করলে এবং তার পক্ষে রায় দিলে সে যেন আগুনের টুকরো নিয়ে গেল।’ বুখারির অন্য বর্ণনায় আছে, ‘যাকে আমি (ভুল বুঝে) মুসলমানের সম্পদের মালিক বানিয়ে দেব, তা আগুনের টুকরো মাত্র। ইচ্ছে করলে সে নিতে পারে অথবা ত্যাগ করতে পারে।’

আবু দাউদে হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে ইয়েমেনে (দায়িত্ব দিয়ে) পাঠাচ্ছেন অথচ আমার বয়স কম, বিচার ফয়সালা করার মতো কোনো জ্ঞান বা যোগ্যতা আমার নেই। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তোমার অন্তরকে হিদায়াত দেবেন এবং তোমার জবান দৃঢ় রাখবেন। যখন বাদী-বিবাদী তোমার সামনে এসে উপস্থিত হবে তখন একজনের বক্তব্য শুনেই রায় দেবে না বরং দু’জনের বক্তব্য শুনবে। এতে ফায়সালার দিগন্ত তোমার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।’ হজরত আলী (রা.) বলেন, এরপর আমি সেখানে বিচার ফয়সালা করতে গেলাম, কিন্তু কোনো বিচারের রায় দিতে গিয়ে আমি কখনও সন্দেহে পড়িনি।

আসুন মানবতার মহান বন্ধু, ন্যায়পরায়ণ শাসক ও বিচারক মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো তাকওয়ার ভিত্তিতে বিচার ফয়সালা করি। আহকামুল হাকিমিনের সামনে হাজির হওয়ার আগে এমন কোনো বিচার ফয়সালা না করি যাতে মহান প্রভুর সামনে অপমানিত হতে হয় এবং কঠিন আজাবের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। আল্লাহ আমাদের শাসক ও বিচারপতিদের সুমতি দিন।