ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

নারীর মর্যাদা

নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র এখনো আমরা পত্রিকায় দেখি। কোমলমতি শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছে না নির্যাতনের হাত থেকে। নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমেই ভয়ানক রূপ ধারণ করছে। চার থেকে পাঁচ বছরের যে শিশু, সেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে পাষণ্ড লম্পট দ্বারা। অবস্থা এমন হয়েছে যে, নারী মানেই নির্যাতন, নারী মানেই সহিংসতা। নারী নির্যাতন সমাজের মরণব্যাধির রূপ ধারণ করেছে।

এক জরিপে দেখা গেছে, বিবাহিত নারীদের প্রতি চারজনের একজন স্বামীর নির্যাতনের শিকার। বিশেষত নারীকে পণ্য করে বাজারে তোলার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তাও নারী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, নারী ধর্ষণ, নারীর শ্লীতাহানির অন্যতম কারণ। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে ব্যবহার, ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমে নারীকে যৌন আবেদনময়ী করে উপস্থাপন নারীর যৌন হয়রানিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। নারীর প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলাম সমর্র্থন করে না। বরং এই মনোভাবের কঠোর নিন্দা করেছে ইসলাম।

নিশ্চিত করেছে নারীর নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন। নারী শৈশবে কন্যা, যৌবনে স্ত্রী, বার্ধক্যে মা আর সাধারণভাবে বোন এই চারটি স্তর অতিক্রম করেই তাকে সাফল্যের চূড়ায় উপনীত হতে হয়। নারীর যতটি স্তর আছে সব স্তরেই ইসলাম নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছে। ইসলাম নারীকে মা হিসেবে, বোন হিসেবে, কন্যা হিসেবে ও স্ত্রী হিসেবে সম্মান দিয়েছে। নারী যেমন কন্যা, স্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত আদরণীয়, আবার মা ও বোন হিসেবে সম্মানের পাত্রী। সুতরাং কোনো স্তরেই নারীর প্রতি সহিংসতা, তাকে অবহেলা, তাকে নির্যাতন করার সুযোগ নেই।

পুরুষের সাথে নারীর যত দিক থেকে সম্পর্ক হতে পারে ইসলাম সব সম্পর্ককে সম্মান করেছে, অনন্য মর্যাদা ও মহিমায় অধিষ্ঠিত করেছে। এ ক্ষেত্রে নারীকে শুধু সমমর্যাদা নয় বরং অগ্রমর্যাদা দান করা হয়েছে।

মা হিসেবে নারীর মর্যাদা : প্রথমত ইসলাম নারীকে মা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। মা হিসেবে ইসলাম নারীকে যে পরিমাণ মর্যাদা দিয়েছে তা পৃথিবীর কোনো ধর্ম ও সভ্যতায় কল্পনাই করা যায় না। বিশেষ করে আধুনিক সভ্যতায় তা কল্পনা করা স্বপ্নবিলাস ছাড়া কিছুই নয়। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচারের নির্দেশ দিয়েছি। কারণ তার মা তাকে কষ্টের সাথে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টের সাথে প্রসব করেছে’ (সূরা আহকাফ : ১৫)।

এখানে বাবা-মা দু’জনের সাথে ভালো আচরণ করার কথা বলা হলেও অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে মায়ের কষ্টের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বাবারও বিরাট অবদান রয়েছে সন্তানের জীবনে। এটা এদিকেই ইঙ্গিত করে যে, বাবার তুলনায় মায়ের মর্যাদা বেশি। কারণ মায়ের কষ্টের কাছে বাবার কষ্ট ও ত্যাগ খুবই সামান্য। এক হাদিসে এসেছে, একজন সাহাবি রাসূল সা:-এর কাছে জিজ্ঞেস করেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সদাচার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসূল সা: বললেন, তোমার মা। সাহাবি বললেন, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সাহাবি বললেন, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সাহাবি বললেন, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা (বুখারি)।

অপর এক হাদিসে আছে, এক সাহাবি রাসূল সা:-এর কাছে এসে আরজ করলেন, আমি জিহাদে যেতে চাই। রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা-মা কেউ কি জীবিত আছেন? সাহাবি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে রাসূল সা: বললেন, ‘যাও তাদের সেবা করে তুমি জিহাদের সওয়াব কামাই করে নাও।’

অপর বর্ণনায় আছে, ‘যাও তার কাছে গিয়ে বসে থাকো। কেননা জান্নাত তার পায়েরই কাছে’ (বুখারি, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ও মুসনাদে আহমাদ)। এক হাদিসে আছে, ‘জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে’ (মুস্তাদরাকে হাকিম)।

 স্ত্রী হিসেবে নারীর মর্যাদা : স্ত্রী হিসেবে ইসলাম নারী জাতিকে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে। স্বামীকে নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণ করার। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা স্ত্রীদের সাথে বসবাস করো সদাচারের সাথে। আর যদি তোমরা কোনো কারণে তাদেরকে অপছন্দ কর তাহলে হয়তো তোমরা এমন একটি বস্তুকে অপছন্দ করলে যাতে আল্লাহ তায়ালা প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন’ (সূরা নিসা : ১৯)।

এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে অপছন্দ না করে’ (মুসলিম ও সুনানে ইবনে মাজা)। এই হাদিসে আল্লাহর রাসূল সা: দাম্পত্যজীবনের কলহ নিরসন ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণের একটি মূলনীতি বলেছেন। স্ত্রীর সব আচরণ স্বামীর কাছে ভালো লাগবে, এটা অসম্ভব। আবার স্বামীর সব আচরণ স্ত্রীর কাছে ভালো না লাগাই স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহ তায়ালা কাউকেই পূর্ণতা দান করে সৃষ্টি করেননি। প্রত্যেকের ভেতরেই কিছু না কিছু মন্দ স্বভাব থাকবেই।

ভালো ও মন্দ মিলেই মানুষ। কাজেই স্ত্রীর কোনো স্বভাব স্বামীর কাছে অপছন্দ হলে সে যেন ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে। স্ত্রীর ভালো গুণগুলোর দিকে লক্ষ করে আল্লাহর শোকর আদায় করে এবং তার প্রশংসা করে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্বামীর জন্য রাসূল সা:-এর জীবনই উত্তম আদর্শ। রাসূল সা: যখন ঘরে যেতেন স্ত্রীদের সাথে ঘরের কাজে শরিক হতেন। তাদের সাথে সদাচার করতেন। স্ত্রীদের সাথে খোশ-গল্প করতেন। তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন।

রাসূল সা: কখনো কোনো স্ত্রীকে প্রহার করেননি। তিনি যখন তাহাজ্জুদের সময় উঠতেন তখন খুব আস্তে দরজা খুলতেন, যাতে ঘরের লোকদের ঘুমে ব্যাঘাত না হয়। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ কর’ (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে আছে, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্বামীর কাছে উত্তম’ (জামে তিরমিজি)।

বোন হিসেবে নারীর মর্যাদা : বোন হিসেবেও নারীকে সম্মান দিয়েছে ইসলাম। হাদিস শরিফে আছে, ‘কারো ঘরে যদি তিনজন বা দু’জন কন্যা অথবা ভগ্নি থাকে আর সে তাদেরকে উত্তম শিক্ষা দান করে এবং তাদের উত্তম পাত্রে বিবাহ দেয় তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।’

অন্য বর্ণনায় আছে, তাহলে সে আর আমি জান্নাতে এরূপ পাশাপাশি থাকব। তারপর তিনি দু’টি আঙ্গুল পাশাপাশি রেখে ইশারা করলেন। কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা : কন্যা হিসেবে নারীর সম্মান সবচেয়ে বেশি দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম পূর্বযুগে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করা ছিল বাবার জন্য কলঙ্কজনক। আল কুরআন বলছে, ‘যখন তাদেরকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করার সুসংবাদ দেয়া হতো তখন লজ্জায় তাদের চেহারা কালো হয়ে যেত। আর বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। তারা ভাবত লোকলজ্জা উপেক্ষা করে তারা কি তাদেরকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। কত মন্দ ছিল তাদের এ মনোভাব’ (সূরা নাহল : ৫৮)।

জাহিলিয়্যাতের যুগে যখন কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করাই ছিল বাবার জন্য কলঙ্কজনক, কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলেই জীবন্ত কবর দেয়া হতো তখন ইসলাম তার অধিকার দিয়েছে এবং এই নিষ্ঠুর প্রথার চরম নিন্দা করেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যখন জ্যান্ত দাফনকৃত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে তখন তারা কী জবাব দেবে’ (সূরা আততাকভীর : ৮ ও ৯)।

নারীর ব্যাপারে ইসলামের নবী যে আদর্শ রেখে গেছেন সেই আদর্শই নারীর সম্মান ও মুক্তির উপায়। এ ছাড়া মানবপ্রসূত যত আইন বা আদর্শ আছে সেগুলোর মাঝে নারীর শান্তি বা মুক্তি নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা নারীর শান্তি খুঁিজ মানবপ্রসূত সভ্যতায়। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ইসলামের মধ্যে নারীর শান্তি-স্বস্তি নির্ভর করে, সে ইসলামকেই আজকে চিত্রিত করা হচ্ছে নারী-উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে।

ইসলামকে আজ নারীর শত্রুরূপে প্রধান আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ইসলামের বিধান পালন করলে নারী কয়েক যুগ পিছিয়ে যাবে। ইসলামের হিজাব নারীর জন্য কলঙ্কজনক। এ ধরনের জঘন্য ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো বক্তব্য এখন চার দিকে শোনা যাচ্ছে। অপর দিকে যে পাশ্চাত্য সভ্যতার হাতে নারী জাতি বারবার লাঞ্ছিত-অপমানিত ও নিগৃহীত হয়েছে এবং হচ্ছে তারা পেয়ে যাচ্ছে বেকসুর খালাস, বরং উল্টো সেজে বসেছে নারীবাদী ও নারীদরদি। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো’ (সূরা নিসা : ১৯)। হাদিসে আছে, ‘নারীগণ পুরুষদেরই সহোদরা’ (মুসনাদে আহমাদ ও আবু দাউদ)। নারী নির্যাতন বিলোপ সাধনের জন্য ২৫ নভেম্বর আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ দিবস পালন করে থাকি। নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করতে নারী অধিকার শিরোনামে বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে থাকি। কিন্তু আমরা বুঝি না যে, নারী অধিকার, নারী অধিকার বলে চিৎকার করলেই নারীর প্রতি সহিংসতা দূর হয় না।

বেছে বেছে কয়েকজন নারীকে মন্ত্রী বানালে, কোটা করে কয়েকজন নারীকে এমপি বা চেয়ারম্যান বা মেম্বার বানালেই নারী নির্যাতন বন্ধ হয় না। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো আমাদের দেশ। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, তা ছাড়া বহু নারী মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে রয়েছেন। তার পরও এ দেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না। রেডিও, টেলিভিশন, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও গণমাধ্যমে কোটি কোটি টাকা প্রচার করে বা কঠিন আইন করেও বিশেষ কিছুই হয় না।

আমরা মনে করি, নারীকে ইসলাম যেসব অধিকার দিয়েছে সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন হলেই নারীর প্রতি সহিংসতা দূর হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করার জন্য মানুষের মাঝে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি করতে হবে। মানুষের ভেতরকার পশুত্ব দমন করে মনুষত্ব জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষের মাঝে নৈতিকতা সৃষ্টি করতে হবে। যখন মানুষ জানবে যে, আমি নির্যাতন করে দুনিয়ার আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরোতে পারলেও আখিরাতে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে জবাব দিতে হবে; তবেই সে নারী নির্যাতন থেকে বিরত থাকতে পারে। এ বিষয়ক আলোচনা কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিজ্ঞ আলেমদের দ্বারা গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। তাহলেই কিছুটা ফল পাওয়ার আশা করা যায়।

লেখক : মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব,  শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর।