ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

পরোপকার মহৎ গুণ

পরোপকার মহৎ গুণ একটি বহুল প্রচলিত প্রবচন। কম-বেশি যেকোনো স্তরের শিক্ষিত মাত্রই এ বাণীটি পড়েন, জানেন, অন্তত শুনে থাকেন। বাণীটি বাংলা ভাষায় সহজে বোধগম্য একটি বাক্য। কিন্তু সমাজের দিকে তাকালে মনে হয়, যারা এ বাক্যটির সাথে পরিচিত তারা শুধু বাক্যটি জানেন, অর্থ বোঝেন না বা বাস্তবায়ন অযোগ্য মনে করেন। ধরুন, রাস্তায় কারো মোবাইল, টাকা-পয়সা বা গয়নাগাটি পড়ে গেল। দেখবেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তা হাওয়া হয়ে যাবে। মালিক খোঁজার জন্য ফিরে এলেও তা না পাওয়ার গ্যারান্টি শতভাগ।

অথচ এ ক্ষেত্রে চিত্রটি যদি এ রকম হতো যে, পড়ে যাওয়া বস্তুটি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পড়ে থাকল, কিন্তু কেউ এটি তুলে নেয়ার মতো নেই অথবা কেউ তুলে নিয়ে মালিকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল বা যেখানে পড়েছিল সেখানের সবাইকে জানিয়ে রাখা হলো মালিক ফিরে এলে সংবাদ দিতে হবে। তাহলে হয়তো বলা যেত আমরা যা পড়ি, জানি বা শুনি তার আমলও করি বা তা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করি। বাস্তবে এই ‘পরোপকার’ প্রসঙ্গটি কে না জানে? বরং না জানা লোকের সন্ধান পাওয়া মুশকিল। কিন্তু যখন রোড এক্সিডেন্ট হয়, বাস-ট্রেন এমনকি লঞ্চ তখন প্রত্যক্ষদর্শীর ওপর যেখানে আহতের সেবা, নিহতের পরিচয় বের করে ডেডবডি শোকাতুর পরিবারের নিকট পৌঁছানো গুরুদায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সেখানে এমন অনেক প্রত্যক্ষদর্শীও রয়েছেন যাদের আহত-নিহত নয় বরং টাকা-পয়সা, মালপত্রের দিকেই দরদ বেশি থাকে। এটি আমাদের দেশের একটি কমন চিত্র। যখন এ লেখাটি লিখছি তখন আমাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত মারমুখী। যে যাকে পারছে নির্বিচারে আহত-নিহত করছে।

পরোপকারে অভ্যস্ত হতে পারলে এমনটি হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল বলে মনে হয় না। অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্বই সবচেয়ে বেশি পরোপকারী হওয়া প্রয়োজন ছিল। এরপর দেখুন রাজপথের এ মারামারিগুলোতে একশ্রেণীর সাংবাদিক রয়েছেন তার পেশাগত দায়িত্ব, সত্য-মিথ্যা রিপোর্ট করা নিয়ে ব্যস্ত। তিনি যদি তখন আহত ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যস্ত হতেন তাহলে রিপোর্ট প্রস্তুতের সাথে সাথে হয়তো একটি প্রাণও বাঁচানো যেত, অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। এটি এমন একটি উপদেশ যা দিয়ে গোটা সমাজে পরিবর্তন আনা যায়, স্বর্গীয় শান্তির ধারণা ও সন্ধান পাওয়া যায়। এবার আসি শিরোনামের দ্বিতীয় অংশে।

মানুষের মধ্যে মতের ভিন্নতা অতি স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক একটি বিষয়। কারণ, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোটি কোটি মানুষ সৃষ্টি করেছেন ভিন্নতা দিয়েই। কারো সাথে কারো চেহারার মিল নেই, কণ্ঠস্বরের মিল নেই। কারো সাথে কারোর আঙুলের ছাপও মিলবে না। তাহলে পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে এবং আসবে কারো সাথেই কারো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। এত স্বতন্ত্র করে অন্য কোনো জীবকে আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন কি না তা তিনিই ভালো জানেন। সুতরাং মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিও ভিন্নতর। তাই মতামতও ভিন্ন হওয়া অতি স্বাভাবিক। সৃষ্টিগত দিক থেকে সব মানুষই সমান।

এমন কেউ নেই যার তিনটি পা অথবা কারো পা ছয়টি। কেউ তিন চোখের মালিক অথবা কারো তিনটি কান- স্বাভাবিকভাবে হয় না। তাই সৃষ্টিগত মর্যাদা সবার সমান। তবে এটা বাস্তব যে, জ্ঞান, চরিত্র ও কর্ম দিয়ে অনেকেই তার সম্মান বৃদ্ধি করতে পারে। এ অবস্থায় আমার নিজের যেমন যেকোনো মত দেয়া বা গ্রহণ করার অধিকার আছে, অন্য কারো ঠিক সে অধিকারই রয়েছে। নিজ মতকে কোরবানি করা, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে মেনে নেয়া ও অপরের মতকে সম্মান করার শিক্ষা যদি আমরা গ্রহণ না করি তবে হানাহানি বাড়বেই। পৃথিবীতে এমন কোনো একটি বিষয়ও নেই যেখানে ভিন্নমত নেই। হোক না তা যথার্থ অথবা ভিত্তিহীন।

বড় একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য এই যে, সব মানুষ কখনো একই মতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। তাই পরমতসহিষ্ণুতা অনেক বেশি প্রয়োজন। দেশের সর্বত্র শান্তি স্থাপনে এর চর্চা ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। ভিন্নমতকে যেহেতু কখনোই ঐকমত্য করা যাচ্ছে না, সেহেতু ভিন্নমতের সহাবস্থান না হলে মানবতাকে বাঁচানো অসম্ভব; বাঁচবে না দেশ, বাঁচানো যাবে না এই পৃথিবীকে। আমরা বসবাসযোগ্য পৃথিবী চাইলে বিপরীত মতের সহাবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। শুরুর বক্তব্যের সাথে একটি যোগসূত্র প্রয়োজন। পরোপকার সর্বপ্রথম করতে হবে ভাষা দিয়ে। ভাষা হলো মতপ্রকাশের মাধ্যম। 

আর ভাষা বা মুখ দ্বারা পরোপকার করতে অর্থ ব্যয় হয় না বা খুব বেশি ত্যাগ করতে হয় না। প্রয়োজন হয় শুধু বাস্তবতা মেনে নেয়ার মানসিকতা। তাই দয়া করে আসুন, আমরা পরোপকারী হওয়ার ব্রত গ্রহণ করি এবং আজ থেকে পরমতের সহাবস্থান মেনে নিয়ে পরোপকারের প্রথম ধাপটি অতিক্রম করে নিজের মানুষ পরিচয়কে সার্থক করে তুলি। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম সা:কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সর্বোত্তম মুসিলম কে? জবাবে রাসূল সা: বললেন, যার মুখ (ভাষা) ও হাতের অনিষ্ট থেকে অন্যান্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (হাদিসটি ইমাম মুসলিম নিজ গ্রন্থে সঙ্কলন করেছেন)।