ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

প্রতি জুমায় এক আয়াত হোম-টাস্ক

একজন সাধারণ মুসল্লি হিসেবে আমি প্রতি জুমায় নিজের ও অন্যান্য মুক্তাদির জন্য খতিব বা ইমাম সাহেবের কাছে বিনীতভাবে একটি বাড়ির কাজ (হোমটাস্ক) দাবি করি। আপাতত সাধারণ এই কাজ। পরের জুমায় আলোচনার সূত্র হিসেবে আল কুরআনের যে আয়াতটি চিন্তা করা হয়েছে, তা তিনি উল্লেখ করে প্রত্যেকের সাধ্যমতো সংশ্লিষ্ট আয়াতটি অর্থসহ শিখে আসতে বলতে পারেন। পুরো সপ্তাহে একটিমাত্র আয়াতে কারিমা।

স্বীয় বান্দার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল (রউফুর রাহিম) মহান আল্লাহ তায়ালা। মুমিন বান্দার প্রতি রাসূলুল্লাহ সা:-এর মমতা ব্যক্ত করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে একই অভিধা রউফুর রাহিম ব্যবহৃত হয়েছে। সেই অপার দরদি নবী আমাদের এতিম করে বিদায় নিয়েছেন দেড় সহস্র বছর আগে। ঈমান ও দ্বীনের দাবি মেটাতে গিয়ে নায়েবে নবী হিসেবে আলেম ওলামা তথা একজন ইমামকেই আমরা আস’াবান মানুষ বলে সবচেয়ে কাছে পাই। তার কাছে সবার প্রত্যাশা ও দাবি অনেক।

আমাদের নামাজগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন আচার-অনুষ্ঠানসর্বস্ব, কেমন যেন প্রাণহীন মৃত লাশ। অথচ যাবতীয় অন্ধকার থেকে এক আল্লাহর আলোর দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য নাজিল করা হয়েছে আল কুরআনসহ সব আসমানি কিতাব। মিনাজ জুলুমাতি ইলান নূর- এই শব্দ গুচ্ছগুলো পাক কালামে অনেকবার এসেছে। আমরা অনেকেই নামাজ পড়নেওয়ালা, ধর্মের নামে অনেক কিছু করনেওয়ালা, কুরআন পড়নেওয়ালা নই। কুরআন আমাদের কাছে ‘মাহজুরা’- পরিত্যক্ত, প্রত্যাখ্যাত, পরিত্যাজ্য। আমাদের বিরুদ্ধে কুরআন বিকৃতির কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হবে না, কেননা সেই ক্ষমতাই রহিত করা হয়েছে। এই অপকর্মটি আমাদের দ্বারা কমপক্ষে সেভাবে নিষ্পন্ন হতো যেভাবে অন্য জাতি কর্তৃক হয়েছে। কিন’ কুরআনকে আমরা আমজনতা থেকে অত্যন্ত সার্থকভাবেই কুক্ষিগত করতে পেরেছি।

ইসলামী ছিরত ছুরতে নানা ধরনের বিভ্রান্তি জনগণকে গেলানো হচ্ছে যুগ যুগ ধরে পার্থিব দোকানদারি কায়েম রাখার স্বার্থে। কুরআনে প্রত্যাবর্তনে মহান আল্লাহ জাল্লাশানুহুর উদাত্ত আহ্বানগুলো কবে আমাদের ঘুম ভাঙাবে, যখন শেষ ঘণ্টা বাজবে? কুরআন নিয়ে ভাবার কোনো সময় নেই, কেননা আমাদের হৃদয়ে অনেক তালা পড়ে গেছে। এই সর্ববিধ্বংসী পরিসি’তি থেকে উত্তরণে বিদ্যমান ব্যবস’াপনার মধ্যে কোনো রকম বাড়তি আচার আয়োজন ব্যতিরেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

জুমায় হাজির হয়ে আমরা স্বেচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক খুতবা শুনি। কোনো দায় ছাড়াই আমজনতা ঘরে ফিরি। ঠিক এই জায়গাটিতে আল কুরআনের সাথে মুসল্লিদেরকে জুড়ে দেয়া সম্ভব। স্রেফ কয়েকটি কথার উচ্চারণ মাত্র। একটি ঘোষণা সব মুসল্লিকে সচকিত, উজ্জীবিত করবে। হকের একটি বাণী শতসহস্র মানুষকে ঐক্যের নিবিড় বাঁধনে গেথে ফেলবে। তারা নিজেকে কুরআনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভাবতে শুরু করবে।

প্রতিটি মুসলমানের কল্‌বে এক আসমানি শিহরণ জাগবে- এ কথা ভেবে যে, পরের জুমায় যে আয়াতের আলোচনা হবে তা নিয়ে তারও জানার, ফিকির করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পুরো এক সপ্তাহে একটিমাত্র আয়াত নিয়ে পর্যাপ্ত লেখাপড়া ও তা রপ্ত করার সুযোগ অনেক মুসল্লিরই ঘটবে। ব্যাপকসংখ্যক মানুষ যখন সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়ের অধ্যয়ন শেষে হাজির হবেন, ইমাম সাহেবেরা তাদের সামনে এক উদ্দীপ্ত, বোদ্ধা, অধিকতর সমঝদার, অঙ্গীকারবদ্ধ এক শ্রোতৃমণ্ডলীকে দেখতে পাবেন। দ্বীনের আলোচনা সত্যিকারের প্রাণ ফিরে পাবে।

খুতবা তখন আর আগের মতো একতরফা হবে না, বক্তব্যের অনেক বিষয়ই শ্রোতার অন্তরে অনুরণিত হতে থাকবে। একটি বিষয়ের ওপর সামগ্রিক এই মেহনতের ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের গুরুভার বাণীর মর্ম আমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করবে। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় কুরআন তথা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আমাদের মায়া মহব্বত তৈরি হবে। পরিণতিতে কুরআন পরিত্যাগকারীর অভিযোগ থেকেও মুক্তির পথ প্রশস্ত হবে।

কুরআনকে এভাবে ধারণের মাধ্যমে যদি আমরা প্রতিটি সত্তা নিজের সম্পর্ককে স্বীয় স্রষ্টার সাথে ঠিক করতে পারি, তবে মুসল্লি থেকে মুসল্লি আর ইমাম-মুক্তাদির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কটি উন্নততর, অধিকতর মজবুত হবে (অ-তাছিমু বিহাবলিল্লাহি জামিয়াও অলা তাফাররকু)।
শেষ জমানার উম্মত হয়ে আদি পিতা হজরত আদম আ: থেকে এ পর্যন্ত বেশুমার ‘দায়’-এর উত্তরাধিকারী আমরা। আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবী হজরত ইউসুফ আ:সহ বনি ইসরাইল বংশের পিতা হজরত ইয়াকুব আ: সুকঠিন পরীক্ষার মোকাবেলায় এক অনির্বচনীয় ধৈর্যের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে গেছেন। হয়তো তার ছিটেফোঁটাও আমাদের মধ্যে নেই। তা সত্ত্বেও সেই মহান নবীর মতো স্বীয় র্বের কাছ থেকে শেষ বেলার ‘সকল প্রাপ্তির’ (আছাল্লহু আইয়া তিয়ানি বিহিম জামিয়া) দৃঢ়প্রত্যয় আমরা ছাড়ব না, নিরাশ হবো না। (ইন্নাহু লা ইয়াইয়াছু মির রওহিল্লাহি ইল্লাল কওমুল কাফিরুন)।

কুরআন ও তার ভাষা এখনো সাধারণ মুসলমানের কাছে অধরা বা দূরের বস’- এই চর্চাটি যখন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হবে, তখন সেই সঙ্কট অনেকখানি ঘুচবে, কুরআন কেন্দ্রিক আলোকিত সমপ্রদায় গড়ে উঠবে। দেশের সব মসজিদের খতিব বা ইমাম সাহেব সেই মহতী মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, তার জন্য বিনীত আরজি রইল।

লেখক : আবু সাঈদ খান, প্রবন্ধকার