ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

বিনয় ইসলামের পরিচয়

ছোটবেলা থেকে গুরুজনদের মুখে বিনয় ও ভদ্রতার উপদেশ শুনতে শুনতে বড় হয়েছি আমরা। রাস্তাঘাটে চলার পথে যানবাহনে লেখা থাকে, ব্যবহারে বংশের পরিচয়। তবুও অশান্ত আজকের পৃথিবী। চারদিকে মানুষে মানুষে হানাহানিতে পাল্টে যাচ্ছে ব্যবহারের পরিচয়। প্রযুক্তির বদৌলতে আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি। সেই সঙ্গে হারিয়েছিও অমূল্য অনেক কিছু।

যান্ত্রিক জীবনে আমাদের মধ্য থেকে দিন দিন বিনয় ও হাসিমুখের সরল সম্ভাষণ হারিয়ে যাচ্ছে। নিতান্ত পরিচিত কিংবা বন্ধু-বান্ধব ছাড়া আমরা কারও সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে ভুলে গেছি। নিজেদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে বিনয় ও সরলতা দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। আত্মঅহমিকা আর অহঙ্কারের সঙ্কীর্ণতায় আবদ্ধ আমরা। অন্যের কাছ থেকে সত্য মেনে নেয়াকে আজ পরাজয় ধরা হয়। যার গলা যত উঁচু, সে যেন প্রকৃত বীর। ভুলে বসেছি যে, মুসলমান হিসেবে এসব আমাদের আচরণ হতে পারে না। স্বার্থবিহীন উদার ও লৌকিকতামুক্ত অকৃত্রিম বিনয় এবং সবার সঙ্গে মার্জিত ব্যবহার ইসলামের প্রথম শিক্ষা। কারণ এমন গুণাবলী দিয়েই তো আল্লাহপাক প্রথমে তার পাঠানো নবীদের সুশোভিত করেছেন। তারপর দায়িত্ব দিয়েছেন নবুওয়াতের। মানুষকে কাছে টানার জন্য নবীদের হতে বলেছেন সরল ও সহজ ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

আল্লাহপাক বলেছেন, আপনি আপনার অনুসারী মুমিনদের জন্য নিজেকে কোমল করে রাখুন (সূরা : শুয়ারা-২১৫)। আরেক আয়াত, আপনি যদি কঠোর হতেন তবে মানুষ আপনার কাছ থেকে দূরে সরে থাকত। আপনি তাদের ক্ষমা করতে থাকুন, তাদের জন্য মাগফিরাত প্রার্থনা করুন এবং তাদের নিয়ে পরামর্শ করুন (সূরা : আলে ইমরান-১৫৯)।’ স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহপাক তার প্রিয় মানুষটিকে শেখাচ্ছেন, কীভাবে সমাজের সবার সঙ্গে তিনি মেলামেশা করবেন। সর্বময় গুণের অধিকারী মুহাম্মদকে (সা.) শেখানোর মাধ্যমে বরং তিনি আমাদেরও নির্দেশ দিচ্ছেন।

বিনয়ের আসল অর্থ হচ্ছে সত্যকে দ্বিধাহীনচিত্তে মেনে নেয়া, হোক তা যে কারও কাছ থেকে। এর আরেকটি অর্থ নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করা। প্রখ্যাত মনীষী হাসান বসরী বলেছেন, নিজের ধর থেকে বের হওয়ার পর যে কারও সঙ্গে সাক্ষাত্ হবে তাকে নিজের চেয়ে ভালো মনে করার নাম বিনয়।

মুসলিম শরিফে ইয়ায (রা.) বর্ণনা করেছেন, একদিন রাসুল আমাদের বললেন, আল্লাহপাক আমার কাছে নির্দেশনা পাঠিয়েছেন, যাতে তোমরা বিনয়ী হও। একে অন্যের ওপর গর্ব করবে না এবং রাগও হবে না।
হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলতেন, এ পৃথিবীতে যারা বিনয়ী থাকবে, কিয়ামতের মাঠে তাদের জন্য কি আনন্দ! তারা সেদিন আসনে বসে থাকবে। যারা আজ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলিয়ে তাদের মিলিয়ে দেয়, তারাই তো সর্বোচ্চ জান্নাত ফিরদাউসের প্রকৃত অধিকারী। এ পৃথিবীতে আমরা কি নিয়ে বড়াই করি? সামান্য বিত্তবৈভবে আমরা অন্যকে তুচ্ছ করি। আমরা ভুলে থাকি, আমাদের ওপর রয়েছেন এক মহান শক্তিমান শ্রষ্টা। তিনি সবকিছু দেখছেন এবং হিসাবের খাতায় এসব লিখে রাখা হচ্ছে। পরম শক্তিমান আল্লাহপাকের বড়ত্ব এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব যার হৃদয়ে থাকে, সেজন সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসে। মানুষের সঙ্গে তার আচরণ বিনয় ও নম্রতায় মিশে থাকে।

মুসনাদে আহমদের এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহপাকের জন্য যে যত বেশি নিচু হবে (এই বলে রাসুল নিজের হাতকে মাটির দিকে নামিয়ে দেখালেন), নিজেকে বিনয়ী করে রাখবে, আল্লাহপাক তাকে তত বেশি উঁচু করবেন (রাসুল তার হাতের তালু উপরের দিকে উঠিয়ে দেখালেন)। অর্থাত্ মানুষের কছে সম্মানিত করবেন।

মুসলিম শরিফের আরেকটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, দান-সদকায় কখনও সম্পদ কমে না, ক্ষমা ও করুণায় আল্লাহপাক ওই লোকটির সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং যে আল্লাহর জন্য বিনয় দেখাল, তাকে তিনি অনেক উঁচুতে অবস্থান করে দেন।

এমন লোকদের প্রশংসা করতে গিয়ে আল্লাহপাক তাদের নিজের বান্দা বলে পরিচয় দিয়েছেন। ‘আর পরম দয়াময়র বান্দারা তো নম্র হয়ে হাঁটাচলা করে এবং কোনো মূর্খের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দিয়ে চলে যায়’ (সূরা : ফুরকান-৬৩)। এখানে-ওখানে বাকবিতণ্ডা কিংবা কারও সঙ্গে রেগে যাওয়া তাদের স্বভাব নয়। অন্যত্র তিনি বলেছেন, এই পরকাল তো তাদের জন্য তৈরি করে রেখেছি যারা পৃথিবীতে অনেক বড় সম্মানের প্রার্থী হতো না। তারা সেখানে হাঙ্গামায় লিপ্ত হতো না। মুত্তাকিনদের জন্যই তো শুভ পরিণাম (সূরা : কাসাস-৮৩)।

ইবনে মাজাহ থেকে বর্ণিত হাদিসে দেখা যাচ্ছে, রাসুলের (সা.) সামনে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল এক গ্রাম্য বেদুঈন। সে ভাবছিল, কত বড় রাসুল এবং প্রতাপশালী শাসক তিনি। প্রিয়তম নবী তাকে অভয় দিয়ে বললেন, তুমি শান্ত হও। আমি কুরাইশ বংশের এক সাধারণ মহিলার সন্তান, যে মহিলা রোদে শোকানো মাংসের টুকরা খেয়ে দিন কাটাতেন।

বুখারি এবং মুসলিম শরিফের বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দিব কারা জান্নাতের অধিবাসী? যারা দুর্বল এবং তাদের দুর্বল ভাবা হতো। অথচ তারা যদি আল্লাহপাকের নামে কোনো শপথ করে, অবশ্যই তিনি তা পূরণ করে দেন। তিরমিজি শরিফে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মৃত্যুকালে যে মুসলমান অহঙ্কার, উগ্রতা ও বাড়াবাড়ি এবং ঋণ থেকে মুক্ত—সে জান্নাতে যাবে।

ধরাধমের বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ছিলেন আমাদের নবী। এমন সম্মানিত মানুষ হয়েও কি অসাধারণ বিনয় ও ঔদার্যের মায়াজালে তিনি পথভোলা মানুষকে কাছে টেনেছেন। কোনো মহিলা এসে ভরা মজলিসে তাকে ডাকলে তিনি ওঠে চলে যেতেন। তার প্রয়োজনের কথা শুনতেন। মদিনার কারও অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর সংবাদে তার বাড়িতে ছুটে যেতেন। সান্ত্ব্তনা দিতেন। নিজের হাতে ঘরের কাজকর্ম করতেন। স্ত্রীদের সংসারে সাহায্য করতেন। তার এমন কোমলতা আর ভালোবাসার বিবরণ এ সামান্য আয়োজনে লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।

আমাদের সমাজে দিন দিন বাড়ছে অস্থিরতা। কারও জন্য আমরা ধৈর্য ধরতে রাজি নই। মানুষের প্রয়োজনে আমরা চোখ বুজে বসে থাকি। যে রাসুলের নামে আমাদের পীর-মাশায়েখ সমাজে এত সম্মানিত, তাদেরই বা ক’জন রাসুলের এমন কোমল ও মধুর ব্যক্তিত্বকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছেন?

ঘরে-বাইরে সর্বত্র আজ বিনয় ও মানসিক উদারতার যে অভাব তৈরি হচ্ছে, এর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মানবিকতার পূর্ণ বিকাশ। আমরা অনেক কিছু হতে শিখছি, কিন্তু মানুষ হওয়ার দীক্ষা নেইনি আজও। মদিনার নবী মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া আর কে পেরেছে নিজেকে বিলিয়ে মানুষকে ভালোবাসা শেখাতে? তিনিই তো প্রথম বলেছিলেন, আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের প্রথম সোপান এ বিনয় ও নম্রতা। আর অহঙ্কার ও উগ্রতায় তিনি রাগান্বিত হন। আমাদের জীবন তখন হয়ে ওঠে বড়ই অশান্ত ও অস্থির।