ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

বিয়ে ও যৌতুক – শরিয়ত দৃষ্টিভঙ্গি

বিয়ে ও যৌতুক শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গিসুখময় জীবন গঠনের প্রথম ধাপ হচ্ছে স্বামী ও স্ত্রী। আদর্শ পরিবার গঠন, মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ এবং মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ হচ্ছে বিয়ে। আর বিয়েশাদি হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। এ চাহিদা পূরণার্থেই ইসলামী শরিয়ত বিয়ের হুকুম আরোপ করেছে। মানব জাতিকে অবৈধ মিলন তথা লিভ-টুগেদার থেকে বিরত রাখা এবং যৌন চাহিদা মেটানোর জন্যই মহান রাব্বুল আলামিন বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

আমাদের আদিপিতা হজরত আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমন করার পর তিনি কী যেন একটি শূন্যতা বোধ করছিলেন। তার এ শূন্যতা তথা মানবিক প্রশান্তি লাভের জন্যই মহান রাব্বুল আলামিন হজরত আদম (আ.) এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করলেন হজরত হাওয়া (আ.)কে। ফলে আদম (আ.)-এর অশান্ত মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে এবং জান্নাতের হিমেল ছায়ায় তাদের পবিত্র বিয়ে সংঘটিত হয়। ওই বিয়েতে বরযাত্রী (অতিথি) হিসেবে আসন গ্রহণ করেন ফেশেতারা এবং খুতবা পাঠ করেন স্বয়ং মহান রাব্বুল আলামিন। আর এ বিয়েই হচ্ছে সর্বপ্রথম বিয়ে। এখান থেকেই বিয়ের প্রচলন শুরু হয়।

ইমাম আহনাফ তথা হানাফি মাজহাব মতে, বিয়ে হচ্ছে সুন্নতে মুআক্কাদা। বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান হলে কালবিলম্ব না করে বিয়ে করে নেয়া ঈমানি দায়িত্ব। বিয়ে শুধু জৈবিক চাহিদাই নয় বরং মহান একটি ইবাদতও বটে। বিয়ে দ্বারা দীন-দুনিয়ার কল্যণ সাধিত হয়।
হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সা,) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ হযে গেল, সে যেন বাকি অর্ধেক পূর্ণ করার চেষ্টা করে।’ (মিশকাত শরীফ)

রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেন , ‘বিয়ে হলো ঈমানের অর্ধেক, যে ব্যক্তি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করল না সে আমার দলভুক্ত নয়।’ মহনবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ইসলামে বৈরাগ্য নেই এবং বৈরাগ্য জীবন-যাপন করাকেও রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন।’ (দারেমি শরীফ)

হাদিসে বলা হয়েছে, ‘স্বামী-স্ত্রী যখন তাদের গোপন কামরায় বসে একান্ত আলাপ করে, হাসি-খুশি করে, তার সওয়াব নফলের মতো। বিয়ে দ্বারা পাপ কর্ম থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। জৈবিক চাহিদা পূরণ হয়। নৈতিক চরিত্রের হিফাজত হয়। বংশপরম্পরা অব্যাহত থাকে। সুখময় সমাজ ও আদর্শ পরিবার গঠন সম্ভব হয়। মানসিকভাবে মন সুস্থ থাকে। মনে প্রশান্তি আসে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর হয়। বিয়ের ফজিলত আপরিসীম।

ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেয়া পিতার দায়িত্ব। যদি পিতা না থাকে তাহলে তার অভিভাকের কর্তব্য হলো ছেলে-মেয়েদের ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেয়া। বিয়ে যেহেতু সবার জন্য অত্যাবশ্যক, তাই মহান রাব্বুল আলামিন অতি সহজে বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিয়ের মধ্যে ব্যয়বহুল ও অতিরিক্ত আড়ম্ভরতাকে নিষেধ করা হয়েছে। এ জন্যই আমাদের প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সা.) তাঁর নিজের মেয়ে হজরত ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের অনুষ্ঠান অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। ফাতেমা (রা.) কে বিয়ে করার জন্য প্রথমে হজরত আবুবকর (রা.) হুজুর (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠালেন। তারপর হজরত উমর (রা.) ফাতেমাকে বিয়ে করার জন্য মহানবী (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠালেন। কিন্তু রাসুল (সা.) তাদের উভয়কে ফাতেমার (রা.) বয়স কম বলে ফিরিয়ে দিলেন।

পরে হজরত আলী (রা.) ফাতেমাকে (রা.) বিয়ে করার জন্য রাসুল (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠালেন। তত্ক্ষণাত্ হজরত জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)-এর কাছে ওহি নিয়ে আসেন, ওহি পেয়ে রাসুল (সা.) তার প্রস্তাব কবুল করেন এবং ফাতেমার (রা.) সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। তখন হজরত আলীর (রা.) বয়স ছিল ২১ এবং ফাতেমার (রা.) বয়স ছিল ১৫। হুজুর (সা.) তাত্ক্ষণিক সাহাবাদের ডেকে নিজেই খুত্বা পড়ে বিয়ে পড়িয়ে দিলেন এবং উপস্থিত মেহমানদের মাঝে খুরমা ও খেজুর বণ্টন করে দিলেন। তার বিয়েতে মোহর ধার্য করলেন মাত্র ৪০০ মিছকাল (দশ দিরহাম)। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হচ্ছে সুন্নতি বিয়ে অর্থাত্ যে বিয়েতে খরচ কম হয় এবং কোনো জাঁকজমকতা থাকে না।’ (মিশকাত শরীফ)

কিন্তু বর্তমান সমাজে কনের পক্ষ থেকে বড় অংকের মোহর এবং বরের পক্ষ থেকে মোটা অংকের যৌতুক-এ দুটি বিষয় নিয়ে বিয়েশাদিতে চলছে দরদাম তথা বাড়াবাড়ি। অথচ উভয়টি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ তথা হারাম। হজরত উমর (রা.) বলেন, ‘হে মুসলমান সম্প্রদায়! তোমরা বিয়েশাদিতে মোটা অংকের মোহর, জাঁকজমকতা এবং যৌতুক দাবি করো না, কেননা আল্লাহর কাছে এটার কোনো মর্যাদা তথা মূল্য নেই, যদি থাকত তাহলে রাসুল (সা.) তাঁর মেয়ে ফাতেমার (রা) বিয়েতে করতেন।’ (তিরমিযি শরীফ)

ইসলামী শরিয়তে যৌতুক নেয়া এং দেয়া হারাম। যৌতুকের কারণেই অনেক সোনার সংসার ভেঙে যায়, সংসারে আশান্তির আগুন দাউ-দাউ করে জ্বলে ওঠে। বিয়েতে যদি আপন পিতা নিজ মেয়ের সঙ্গে স্বেচ্ছায় বরের চাওয়া তথা দাবি ছাড়া সাংসারিক প্রয়োজনীয় কোনো (জিনিস/মাল) দিয়ে থাকেন তাহলে সেটা যৌতুক হবে না বরং এটা জেহেজ (উপঢৌকন/হাদিয়া) হবে।

কিন্তু নিজের ওপর বোঝা হয় কিংবা বরের চাহিদা/দাবি মেটাতে যা দেয়া হয়, এটা হবে যৌতুক। সমাজে প্রচলিত যৌতুকের কোনোরূপ বৈধতা শরিয়তে নেই। তার কোনো অস্তিত্ব মহানবী (সা), খোলাফায়ে রাশেদিন, সাহাবায়ে কেরামদের যুগে ছিল না যার কারণে এটা হচ্ছে নাজায়েজ (হারাম)। যৌতুকের নেশা সমাজে মহামারীর আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। সমাজের জন্য এক মহাবিপদ ও সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে যৌতুক। কনের পিতা কারও কাছ থেকে টাকা হাওলাত/কর্জ করে, কিংবা সুদের ওপর নিয়ে যৌতুকের (বরের) চাহিদা মেটায়। বর্তমান সমাজে বিয়েতে যৌতুক না দেয়াকে অপমান মনে করা হয়।

অথচ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সম্মান অর্জনের জন্য বিয়ে করবে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করবেন, আর যে ব্যক্তি বিয়েতে যৌতুক দাবি করবে সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা দরিদ্রতা ও কঠিন আজাব ছাড়া আর কিছুই দেবেন না। আমাদের সমাজ আজ যৌতুকের জন্য পাগল, অথচ রাসুল (সা.) তাঁর মেয়ে হজরত ফাতেমার (রা.) বিয়েতে কোনো যৌতুক দেননি বা সাহাবায়ে কেরামরাও বিয়েতে কোনো যৌতুক দাবি করেননি।

নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামদের আদর্শই হচ্ছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। প্রিয় নবী (সা.) তাঁর নিজের মেয়ের বিয়েতে কোনো যৌতুক দেননি তবে জেহেজ (উপঢৌকন) হিসেবে যা যা দিয়েছিলেন নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো : দুটি ইয়ামানী চাদর, একটি বিছানা, দুটি খেজুরের ছাল ভর্তি বালিশ. ১টি পেয়ালা, দুটি আটা পিষার চাক্কি, একটি পানি রাখার মাটির পাত্র, একটি চৌকি, একটি কম্বল। ওইগুলোই ছিল ফাতেমার বিয়ের উপঢৌকন (সুবহানাল্লাহ)। আসুন আমরা এ সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা প্রতিরোধ করি এবং শরয়ি আলোকে বিয়েশাদি সম্পন্ন করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দিন।