ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মহানবীর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা

ভালোবাসা। একটি শব্দ চার অক্ষরের। কী এক জাদু এ শব্দে! কত গভীরতা, কত মমতা, কত শক্তি! এ শব্দের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে লাখো ঘটনাপ্রবাহ। রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, সাহিত্য। হয়নি কী! বিশ্বময় ভালোবাসা না থাকলে কোনো কিছু টিকে থাকা অসম্ভব। আর সেই ভালোবাসা যদি প্রিয় নবীজী সা:-এর জন্য হয় তবে তাতে সিক্ত হয় মন-মনন। প্রশান্তিতে ভরে ওঠে দেহ-মন। ভেজে আঁখি, ভেসে ওঠে কল্পনার ছবি। পৃথিবীতে যারাই রাসূলকে ভালো বেসেছেন, অনুসরণ করেছেন তারাই ধন্য হয়েছেন। সূরা আল্ ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) বলুন, আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের প্রিয় করে নেবেন।’

রাসূল সা:-কে যাঁরা সব চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলেন তাঁরাই সম্মানিত সাহাবি। নক্ষত্রতুল্য সাহাবিদের জীবনে রাসূলকে ভালোবাসার অসংখ্য উদাহরণ বিদ্যমান। রাসূল সা:-কে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।

প্রিয় নবীজী সা:-এর জন্য সাহাবিদের যে অসীম ভালোবাসা ছিল তেমন একটি ঘটনাÑ

রাসূল সা:-এর একজন প্রিয় সাহাবি কাতাদা। রাসূলকে ভালোবাসতেন জীবনের চেয়ে বেশি। একদিন ঘনঘোর রাত। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। চার পাশ নীরব-নিস্তব্ধ। নবীজী সা: যাচ্ছেন এশার নামাজ পড়তে। বেরিয়ে পড়লেন একাকী। প্রকৃতির এমন তোলপাড় করা রাত্রিতেও নবীজীর উপস্থিতিতে সমগ্র পরিবেশ হয়ে ওঠে মহিমান্বিত। চার দিকে তাকিয়ে দেখেন রাত্রির অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না কোনো সাহাবির হিরন্ময় মুখ। হঠাৎ আকাশের বুক ভেদ করা বিদ্যুতের আলোয় মুহূর্তেই ভেসে উঠল একটি প্রার্থিত মুখ। তার দিকে তাকাতেই রাসূলুল্লাহ সা:-এর ঠোঁটে জাফরানি হাসি। ভেসে এলো এক দরদি কণ্ঠস্বর : কাতাদা? রাসূল সা:-এর অন্যতম সাহাবি কাতাদাও উপস্থিত ছিলেন সেদিন এশার নামাজে।

কাতাদা বললেন, জানি, আজ এ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এশার জামাতে শামিল হবেন না তেমন বেশি মুসল্লি! কিন্তু আপনি আসবেন এবং একধরনের নিঃসঙ্গতা যদি কষ্ট দিয়ে যায় কোনোভাবে আমার প্রাণপ্রিয় নবীজীকেÑ সইতে পারব না। তাই চলে এসেছি মসজিদে আপনার সান্নিধ্য নিয়েই আজ এশার সালাত আদায় করব বলে। আবারো প্রিয় নবী সা: তাকালেন কাতাদার দিকে। বললেন, কাতাদা! নামাজ শেষে ঘরে ফেরার সময় আমার কাছে এসো একবার। রাসূলের আহ্বান। শিহরিত হলেন কাতাদ। পরীক্ষর পালা শেষ। কাতাদা হাজির হলেন রাসূল সা:-এর সামনে। কিন্তু কী আশ্চর্য! প্রিয় নবী সা: একটি শুকনো খেজুরের ডাল কাতাদাকে দিয়ে বললেন, ‘এটা হাতে থাকলে তোমার সামনে দশজন এবং পেছনের দশজন আলোকিত করতে থাকবে। আর বাড়ি পৌঁছে ঘরের চার পাশে যদি দেখো কোনো অন্ধকার তাহলে কোনো কথা না বলেই এই ছড়ি দিয়ে আঘাত করবে সেখানে সজোরে। কারণ অন্ধকার মানেই সেই শয়তান।’ আশ্চর্য ক্ষমতা ছড়ির! ওই সাথে সঙ্গে মিশে আছে স্বয়ং রাসূল সা:-এর দোয়া।

কাতাদা বাড়ি ফিরছেন অন্ধকার কেটে কেটে। বাড়ির কাছে এসেই থমকে দাঁড়ালেন। সত্যিই তো! কী এক অদ্ভুত অন্ধকার জমে আছে ঘরের আঙিনায়। ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে একটি প্রাণী। মনে পড়ল রাসূল সা:-এর কথা। তিনি আঘাত করলেন খেজুরের সেই শুকনো ছড়ি দিয়ে। আর পালিয়ে গেল রহস্যময় কুৎসিত প্রাণীটি। রাসূল সা: খুবই ভালোবাসতেন কাতাদাকে। আর কাতাদা? তাঁর ভালোবাসায়ও ছিল না এতটুকু ফাঁক। প্রাণের সব আবেগ দিয়ে, সব ইচ্ছা দিয়ে, সব স্বপ্ন এবং ত্যাগ দিয়ে তিনি ভালোবেসেছিলেন পরম প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সা:-কে। কেমন ছিল সেই ভালোবাসার নজরানা! সেও এক বিস্ময়কর ইতিহাস। 

উহুদ যুদ্ধের সময়। সেই যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর যুদ্ধ। যুদ্ধের একপর্যায়ে মুসলিম মুজাহিদরা ছত্রভঙ্গ। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তারা একে অন্যের কাছ থেকে। সে সুযোগে মুশরিকরা প্রিয় নবী সা:-কে আঘাত করার লক্ষ্য নিয়ে তীর ছুড়ছে। কঠিন ঢালের মতো রাসূল সা:-কে আগলে রেখেছেন কয়েকজন মুজাহিদ। তারা তাদের বুককে পর্বতের মতো পেতে দিয়ে রুখে দিচ্ছিলেন মুশরিকদের তীর। একে একে শহীদ হলেন দশজন মুজাহিদ। এবার পালা এলো কাতাদার। দেরি না করে রাসূল সা:-কে পেছনে আড়াল করে সামনে দাঁড়ালেন অসীম সাহসী কাতাদা। পেতে দিলেন বুক। হঠাৎ একটি তীর ছুটে এলো বিদ্যুৎগতিতে। বিঁধে গেল তাঁর একটি চোখের কোটরে। মুক্তোর দানার মতো সেটা ঝুলে পড়ল কাতাদার গণ্ডদেশে। চোখটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সম্পূর্ণভাবে। ধরে ফেললেন কাতাদা নিজেরই হাত দিয়ে। রাখলেন বহুক্ষণ। সাথীরা বললেন, ফেলে দাও। কিন্তু ফেললেন না কাতাদা। মুঠিভরে তুলে ধরলেন সেটা রাসূল সা:-এর সামনে। রাসূলের কাছে আরজ জানালেন হৃদয়ের তাবৎ উচ্ছ্বাস দিয়ে। রাসূল সা: চোখটি দেখলেন, নক্ষত্রের মতো কেমন জ্বলজ্বল করছে কাতাদার রক্তভেজা হাতের মুঠোয়। যেন চোখটি দয়ার নবী সা:-এর সাথে কথা বলছে অত্যন্ত সংগোপনে। একটি অব্যক্ত কম্পন উঠল রাসূল সা:-এর কোমল হৃদয়ে। প্রিয় নবী চোখটি কাতাদার আগের স্থানে চোখের কোটরে লাগিয়ে দিলেন।

দোয়া করলেন : ‘হে আল্লাহ, কাতাদা তার মুখমণ্ডল দিয়ে তোমার নবীকে রক্ষা করেছে। সুতরাং এখন তুমি তার চোখটিকে অন্য চোখের চেয়েও সুন্দর, আরো বেশি তীè দৃষ্টিসম্পন্ন করে দাও।’ কাতাদার সেই চোখটিই হয়ে উঠল আরো বেশি সুন্দর, যেন অলৌকিক আয়না। কী বিস্ময়কর, চোখ জুড়ানো, মন জুড়ানো মুহূর্ত। ভালোবাসা মানে এটাই। রাসূল সা:-এর প্রত্যেক সাহাবিই ছিলেন এমন। যে কারণে তাঁরা রাসূল সা:-এর ডাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত ছিলেন। প্রিয় রাসূল সা:-কে ভালোবেসে তাঁরা যেমন নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন, তেমনি ইসলামের আদর্শ পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বময়। আমাদের সবার উচিত প্রিয় নবীজী সা:-কে ভালোবেসে তাঁর আদর্শে জীবন গঠন করা। প্রিয় নবী সা:-এর জন্য ভালোবাসাই আমাদের পরম পাওয়া। তবেই আমরা হাশরে তাঁর সুপারিশ পেতে পারি। আল্লøাহ যেন আমাদের রাসূল সা:-কে ভালোবাসার এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দেন।