ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মহানবী সা: এর জীবনে কোমলতা

হজরত মুহাম্মদ সা: হলেন পৃথিবীর সর্ব শ্রেষ্ঠ মানুষ। বাস্তবিক কারণেই তাঁকে অতি উত্তম চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মাত্র চার বছর বয়সেই হজরত জিবরাইল আ: ও হজরত মিকাইল আ: ফেরেশতাদ্বয়ের মাধ্যমে তাঁর সিনাচাক করে সব কুপ্রবৃত্তির ছোবল থেকে তাঁকে মুক্ত করা হয়। তাই তো তাঁর চরিত্রে ন্যূনতম কালিমার চিহ্নটুকু পর্যন্তও ছিল না।

বোধ করি, সে কারণেই মহানবী সা:-এর দিপ্ত ঘোষণাÑ ‘উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের নিমিত্তেই আমি প্রেরিত হয়েছি।’ (আহমদ, হাকিম ও বায়হাকি) রাসূল সা:-এর এই উত্তম চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ কোমলতা। কোমল আচরণের মাধ্যমেই তিনি জয় করেছেন গোটা বিশ্ব।

মহানবীর জীবনে কোমল আচরণ : মহানবী সা: তাঁর কোমল আচরণের সম্মোহনী শক্তির মাধ্যমে সব মানুষকে কাছে টেনে নিতে সম হয়েছেন। তাঁর কোমল আচরণে মানুষ যেমন বিমুগ্ধ হয়েছে, তেমনি পুলকিত হয়েছে। একটি ফুলের চার পাশে সবুজ পত্রপল্লব যেমন ঘিরে থাকে তেমনি মহানবী সা:-এর চার পাশেও গড়ে উঠেছে চিরসবুজ মানুষের ভিড়। তাঁর চরিত্রের কোমলতার কারণেহ্ন কেউই তাঁকে ছেড়ে যায়নি। তাঁর চরিত্রের অপূর্ব সম্মোহনী শক্তির বলয়ে জড়িয়ে গেছে সবাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র আসমানী বাণীর মাধ্যমে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা আল ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল দিল এবং সহৃদয় হয়েছেন। যদি বদমেজাজি ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তাহলে লোকেরা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত।’

পবিত্র কুরআনের আলোকে নবী করিম সা: ছিলেন কোমল চরিত্রের প্রতিভূ। তবে তাঁর সে কোমলতার মূল ভিত্তি ছিল ইমানের ভিত্তি। আর তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কল্যাণ, মানবতার কল্যাণ। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূল সা: বলেন, ‘মুমিন হচ্ছে প্রেম ভালোবাসার উজ্জ¦ল প্রতীক। যে ব্যক্তি না কাউকে ভালোবাসে আর না কেউ তাকে ভালোবাসে, তার ভেতর কোনো কল্যাণ নেই।’ (আহমদ, বায়হাকী)

মুসলিম শরিফের অন্য এক হাদিসে রাসূল সা: বলেছেনÑ ‘যে ব্যক্তি কোমল স্বভাব থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত।’ তিনি আরো বলেনÑ ‘যারা মানুষের ওপর রহম করে, আল্লাহও তাদের প্রতি রহম করেন, তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি (কোমল হও) রহম করো, আসমানবাসীও তোমাদের প্রতি (কোমল হবেন) রহম করবেন।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে উমার রা:)

যারা মানুষের প্রতি কোমল ও সহৃদয় আচরণ করে না তাদের ব্যাপারে রাসূল সা: বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি কোমল আচরণ করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি, ইবনে আকাস রা:)

তবে যারা খোদাদ্রোহী, যাদের ভেতরে ঈমানের লেশমাত্র নেই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের সাথে কোমল আচরণ না করে কঠিন আচরণ করার ব্যাপারে রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের ইঙ্গিত। পবিত্র কুরআন শরীফের সুরা ফাতহ্ এর ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- ‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা:)-এর তাঁর সঙ্গী-সাথীরা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং পরস্পরের প্রতি রহমশীল।’ সূরা মায়েদার ৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেনÑ ‘তারা মুমিনদের প্রতি বিনয় ও নম্র হবে।’

সূরা আরাফের ১৯৯ নম্বর আয়াতে আরো বলা হয়েছে- ‘নম্রতা ও মাশীলতার নীতি অবলম্বন করো।’
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেেিত এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর চরিত্রের অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো- কোমলতা। তাঁর চরিত্রের অনুপম আদর্শ কোমল হৃদয় দিয়েই তিনি ‘মুমিনরা তো একে অপরের ভাই।’ এই ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি ও রার জন্য চাই কোমল হৃদয় এবং নম্র আচরণ। সে কারণেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রেরিত রাসূলের মধ্যে এমন কোমলতার বৈশিষ্ট্য দিয়েছিলেন পরিপূর্ণরূপে।

হজরত মুহাম্মদ সা: যেহেতু সারা বিশ্বের মানুষের নেতা হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন, সেহেতু তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতার মধ্যে প্রথম ও প্রধান গুণ ছিল তাঁর চরিত্রের কোমলতা। তাঁর চরিত্রের এই মাধুর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এমনকি তাঁর পরম শত্র“ যে বুড়ি তাঁর পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত, সেই বুড়িও তাঁর কোমল আচরণে বিমুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। রাসূলের কোমল আচরণের বিস্ময়কর প্রভাব পড়েছিল মানবসমাজে, যা আজো প্রকৃত মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান।

ভ্রাতৃত্বের জন্য কোমনীয়তা যেমন প্রয়োজন, নেতৃত্বের জন্যও তেমন কোমলতার প্রয়োজন। মৌলিক মানবীয় গুণাবলির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ কোমল আচরণ। দেশ ও জাতির কল্যাণেই সবাইকে এই মানবিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করা দরকার। মিশনারি জাতি হিসেবে প্রত্যেক মুসলমানেরই উচিত রাসূল সাঃ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে কোমল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া।

লেখক : এ কে আজাদ