ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মানবকল্যাণে রাসূল সা:

আল কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তিনি তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, সব দ্বীনের ওপর তাঁকে জয়যুক্ত করার জন্য।’ আরো বলা হয়েছে,‘নিঃসন্দেহে রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য অতীব উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (সূরা আহজাব)।

মনুষ্যত্বের ধ্বংসস-ূপের ওপর কলেমার পতাকা হাতে মানবতার কান্ডারি হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন প্রিয় রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা:। অজ্ঞতা বর্বরতা ও স্বেচ্ছাচারিতার দাপটে মানবতা যখন ভূলুণ্ঠিত তখনই তার আগমন।

রাসূল সা: পৃথিবীতে আগমন করে হেরার আলো ছড়িয়ে দিলেন। যে সমাজে ছিল না কোনো শান্তি, কোনো অধিকার সে সমাজে তিনি স’ায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করলেন। মানুষে মানুষে সৃষ্টি হলো মায়া-মমতার বন্ধন। মানুষের সার্বিক জীবনের কল্যাণ সাধনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই রাসূল সা:-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব, যা অন্য কোনো পথ বা মতের অনুসরণের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

একজন মানুষের জীবনে যা যা প্রয়োজন যেমন- চাকরি, ব্যবসা, আচার-ব্যবহার, লেনদেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিনিধিত্ব করা, বিভিন্ন চুক্তি, অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক স’াপন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এমনকি ঘুমানো, শৌচকর্ম সম্পাদনের বিষয় পর্যন্ত প্রিয় রাসূল সা:- এর দিকনির্দেশনা রয়েছে। যা অন্য কোনো মহাপুরুষ দিয়ে যেতে পারেননি এবং ভবিষ্যতেও পারবেন না।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ সা: দৈনিক কাজ-কর্মকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় পালন করেছেন। তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্র ও আদর্শের অধিকারী। শামায়ালে তিরমিজিতে হজরত আলী রা:-এর এই মর্মে বর্ণনা রয়েছে, ‘রাসূলুল্লাহ সা: প্রতিদিনের সময়কে তিনভাগে ভাগ করে এক ভাগ ইবাদতের জন্য, এক ভাগ মানুষের কল্যাণের জন্য এবং অবশিষ্ট ভাগ নিজের জন্য নির্ধারিত করে নিয়েছিলেন।’

রাসূলুল্লুাহ সা:- এর কথাবার্তা, চাল-চলন ও আচার-ব্যবহার, কর্মপদ্ধতি আমাদের জন্য আদর্শ। হজরত জাবির রা: বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: ধীরে ধীরে কথা বলতেন, যেন শ্রোতারা উত্তমরূপে বুঝতে পারে। আবার শ্রোতারা বিরক্ত হতে পারে এমন অধিক ধীরেও বলতেন না। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন।’

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: সর্বাধিক সহিষ্ণু ও সহনশীল ছিলেন। মানুষের দেয়া কষ্ট তিনি সহ্য করে চলতেন। তিনি কখনো নিজ ব্যক্তি-স্বার্থে কারো ওপর প্রতিশোধ নিতেন না।

পারিবারিক জীবনে তিনি পূর্ণ সাম্য ও ন্যায়-নীতির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। রাসূল সা:- এর দাম্পত্যজীবন ছিল অত্যন্ত চমৎকার সামাজিকতা ও উত্তম আচরণের সর্বোত্তম নমুনা। রাসূল সা: বলতেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার পরিবার পরিজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করে। আমি আমার পরিবার পরিজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করি।’

প্রিয়নবী সা: ছিলেন অনুপম চরিত্রের অধিকারী। মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ তাঁর অনুপম চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে হাজার লক্ষ মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল।

ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতি প্রিয়নবী সা: সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রে কুরআনের আলোকে ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন। মহানবী সা:- এর আগমনের পূর্বে সমগ্র বিশ্বজুড়েই নারী সমাজের অবস’া ছিল খুবই শোচনীয়। নারী ছিল তুচ্ছ, হীন ও ঘৃণার পাত্র। মানবতার সেই চরম দুর্দিনে মহানবী সা: নারীর মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।

মহানবী সা: নারীর মর্যাদা দিতে গিয়ে ইরশাদ করেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’ তিনি স্ত্রীকে স্বামীর চরিত্রের মাপকাঠি হিসেবে মনোনীত করে বলেন,‘ তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, সে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’

আজকের তরুণ ও যুব সমাজ রাসূলে আকরাম সা:- এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সর্ব প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে পারে। তরুণ অবস’ায় প্রিয়নবী সা: ছিলেন অত্যন্ত শান্তশিষ্ট ও আত্মসংযমী। উন্নত ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। ছিলেন স্নেহশীল, ধয়ালু এবং সহানুভূতিশীল, সহমর্মী, সত্যবাদী ও আন্তরিক। যে অবাধ পাপরাশি, জুয়া-মদ্যপান, অশ্লীল কলহতায় স্বদেশবাসীকে গ্রাস করেছিল তা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ সা: যৌবনকে পূর্ণ সতর্কতা, যত্ন ও নিষ্ঠার সাথে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রিয়নবী সা: ছিলেন মানবতার মহান শিক্ষক। রাসূল সা: তৎকালীন আরব সমাজের বর্বর, নিরক্ষর জাতিকে সুশিক্ষা প্রদানের জন্য যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তা আধুনিক যুগের অনেক উন্নত প্রযুক্তি থেকেও বেশ সফল ও কার্যকর পদ্ধতি। রাসূল সা: নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য ঐতিহাসিক সাফা পর্বতের পাদদেশে ‘দারুল আরকাম’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম শিক্ষালয়।

রাসূল সা: এমন এক শ্রেষ্ঠতম মহাপুরুষ যিনি গোটা বিশ্ব মানবের জন্য পরিপূর্ণ পথ নির্দেশনা দিয়েছেন যা পৃথিবীর জন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা সম্ভব হয়নি। তিনি এমন এক সুমহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত। তাঁর একটিই চরিত্র। গোপন বলে কিছু নেই। অথচ পৃথিবীর অন্যসব ব্যক্তির গোপন চরিত্র বলে কিছু আছে যা প্রকাশযোগ্য নয়। সে জন্যই মহানবী সা: পৃথিবীর সর্বকালের, সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম মহামানব।

আজকের এই আধুনিক বিশ্বে পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও সি’তিশীলতার জন্য রাসূল সা:- এর আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য অন্যান্য অমুসলিম মনীষীরা রাসূল সা:- এর শ্রেষ্ঠত্ব অকপটে স্বীকার করেছেন। জর্জ বার্নাডশ বলেন, ‘বিশ্বের শাসন ও একনায়কত্ব যদি আজ মুহাম্মদ সা:- এর মতো পূর্ণাঙ্গ ও পরাকাষ্ঠাসম্পন্ন ব্যক্তির হাতে সোপর্দ করা হয়, তবে এই পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে গোটা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার দোলনায় পরিণত হবে।’ তাই আসুন, আমরা রাসূল সা:- এর আদর্শে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলি।

লেখক : কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম,  প্রবন্ধকার