ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মানবতার বন্ধু হজরত মুহাম্মদ সা:

হজরত মুহাম্মদ সা:-এর আগমনপূর্ব যুগটি ছিল দলাদলি, হানাহানি ও রক্তারক্তির যুগ। মানুষে মানুষে ছিল রক্ত, বর্ণ, ভাষা ও আভিজাত্যের দুর্লঙ্ঘনীয় প্রাচীর। সমাজ ছিল তখন পশুত্ব ও পৌত্তলিকতার নিকষকালো অন্ধকারে আচ্ছাদিত। মানুষ ছিল তখন শানি-হারা, অধিকারহারা, নির্মমভাবে অত্যাচারিত ও নিপীড়িত।

নারী জাতির অবস’া ছিল খুবই শোচনীয়। এক কথায় তৎকালীন মানবসমাজে মুক্তি, শানি- ও প্রগতির আশা হয়ে উঠেছিল সুদূরপরাহত। মানবেতিহাসের এই ঘোর দুর্দিনেই বিশ্বমানবতার পরম বন্ধু মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: মানবতার মুক্তির সনদ নিয়ে সুন্দর এই বসুন্ধরায় আগমন করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি।’ মূলত তাঁর আগমনই ছিল মানবকুলের জন্য অপূর্ব নিয়ামত, রহমত ও চিরন-ন শানি-র মহান সওগাত। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরম বন্ধুরূপে অন্যায় ও অসাম্যকে তিরোহিত করে সাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর মহান ব্রত।

ধর্মীয় মুক্তি : আল কুরআনের বাণী, ‘ইসলামই আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম।’ অন্য সব ধর্মমতকে বাতিল ঘোষণা দিয়ে ইহকালের পাথেয় ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র সনদরূপে মহানবী সা: ইসলামকে সর্বকালীন ও বিশ্বজনীন পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম।’

অর্থনৈতিক মুক্তি : দারিদ্র্য নিরসনে মহান আল্লাহর বাণী, ‘যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।’ এই বাণীর প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়ে মহানবী সা: মনব জীবনের অন্যান্য দিকের মতো অর্থনৈতিক দিকেরও বাস-ব সমাধান দিয়ে গেছেন। সুদভিত্তিক ঋণ, জুয়া, লটারি ইত্যাদি শোষণমূলকব্যবস’া চিরতরে নিষিদ্ধ করে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুসরণে আজো মানবজাতিকে রাষ্ট্রের দাসত্ব ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস’ার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে প্রকৃত আজাদ ও সুখী করা সম্ভব।

রাজনৈতিক মুক্তি : একনায়কত্ব ও রাজতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে মহানবী সা: অন্ধকার যুগে মদিনায় এক নজিরবিহীন সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রণয়ন করেছিলেন মদিনার ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমান- এই ত্রিজাতির মধ্যে সামাজিক শানি- ও অগ্রগতির নিশ্চয়তা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাম্প্রদায়িকতার উৎখাত, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনার্থে ৪৭টি শর্তসংবলিত যুগান-কারী এক সনদ। The charter of Madina তথা মদিনার সনদ নামে পরিচিত ওই সংবিধান দ্বারা Islamic Brotherhood-এর ভিত্তিতে আইনের প্রকৃত শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মাবাধিকার নীতি, নিরাপত্তার বিধান ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রবর্তন হয়েছিল এরই মাধ্যমে। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধনতন্ত্র ইত্যাদি দ্বারা বিশ্বের বা স্বদেশের সমস্যা সমাধানের ব্যর্থ চেষ্টা পরিহার করে মহানবী সা: প্রবর্তিত নীতিমালা অনুসরণেই আজো শানি- প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তাই তো পাশ্চাত্যের খ্যাতিমান মনীষী জর্জ বার্নার্ড শ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, I believe if a man like Mahammad (sm) were to assume the dictator ship of modern world, he would succeed in solving the problems in way that would bring much needed peace and happiness.

সামাজিক মুক্তি : ষষ্ঠ শতকের আরব ছিল পাপের কলুষ কালিমায় আচ্ছন্ন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ছিল তখনকার প্রচলিত নীতি। এক কথায় নির্যাতিত মানবতা অমানুষিক পশুশক্তির শিকারে পরিণত হয়েছিল। এরূপ শ্বাসরুদ্ধকর পরিসি’তিতে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য গুমরে মরছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত অসহায় মানুষের আত্মা। এমতাবস’ায় মহানবী সা: ঘোর অজ্ঞানতার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বসমাজে ইসলামের সুবিমল জ্যোতি বিকিরণ করেন। নিঃস্ব ও অসহায়দের সেবা, অত্যাচারীদের বাধা দেয়া, বঞ্চিতদের আশ্রয় এবং বিভিন্ন গোত্রের মাঝে পারস্পরিক শানি–শৃঙ্খলা ও সৌভ্রাতৃত্ব স’াপন করা প্রভৃতি কর্মসূচি সামনে রেখে যৌবনকালে তিনি তরুণদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে কল্যাণধর্মী একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করে গেছেন সামাজিক শানি- প্রতিষ্ঠায়। আজকের এ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমাজেও মহানবী সা:-এর আদর্শ অনুসরণে শানি- ও সি’তিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বিখ্যাত মনীষী David Urquhart বলেন, Let them investigate fully for themselves : Let them read the Holly Quran, Let them try to understand and they may find peace which all are seeking.

নারীমুক্তি : ইসলাম আগমনের আগে দুনিয়া নারীকে অকেজো ও অকল্যাণকর, সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিপন’ী বা তার প্রতিবন্ধক মনে করে জীবনের কর্মক্ষেত্র থেকে একেবারে বাইরে ফেলে দিয়েছিল। তাকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, নিষ্ক্রিয়তার এমন এক গহ্বরে যেখান থেকে উঠে আসা ও উত্থান-অগ্রগতি লাভ করা কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। মানবতার পরম বন্ধু মহানবী সা: তাদেরকে এ অবস’া থেকে উত্তরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। নারী সমাজকে হীনতার নিম্ন্নতম পঙ্ক থেকে তুলেছেন অনেক ঊর্ধ্বে। দিয়েছেন তাদেরকে তুলনাহীন মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার। দিয়েছেন সামাজিক আর্থিক নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা। সম্পদে নারীর অধিকার করেছেন প্রতিষ্ঠা। ঘোষণা দিয়েছেন, নারী-পুরুষ উভয়ে উভয়ের জন্য ভূষণস্বরূপ। মেয়েদের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী সা: বলেন, ‘নিশ্চয় সন-ানের বেহেশত মায়ের পদতলে।’ সম্মান, সেবা ও সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে মায়ের কথা তিনি তিনবার উল্লেখ করেছেন এবং একবার উল্লেখ করেছেন পিতার কথা।

বর্তমান বিশ্বে ‘নারী অধিকার’ ইস্যু নিয়ে যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে এবং ব্যয়িত হচ্ছে লাখো-কোটি বিলিয়ন ডলার তার সমাধানে আল্লাহ প্রদত্ত ও মহানবী সা: প্রদর্শিত বিধান মেনে চললেই নারী অধিকারসহ বিশ্বমানবতার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষার মুক্ত পরিবেশ : মহানবী সা: বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! যে জ্ঞান উপকারে আসে না আপনার কাছে তা থেকে পানাহ চাই।’ মানুষ কেবল অন্যান্য জীবের মতো নয়, বরং আধ্যাত্মিক তথা আদর্শিক জীবও বটে। যৌক্তিকতার মানদণ্ডে উন্নত মানুষই প্রকৃত মনুষ্যত্বের মানদণ্ড। মহানবী সা: বলেছেন, ‘পিতা-মাতা তাদের সন-ানদের সুশিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম আর কিছুই দিতে পারে না।’
Stanely Hall যথার্থই বলেছেন, If you teach your child the three ‘R’ Reading, Writing and Arithmetic and leave the 4th ‘R’ Religion you will set a 5th ‘R’ Rascality.

তাই মহানবী সা: প্রত্যেক নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জনকে বাধ্যতামূলক (ফরজ) করে দিয়েছেন।
পরকালীন মুক্তি : মহান আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা তো অগ্নিকু ের প্রানে- ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন।’ মহান আল্লাহ এই রক্ষা করেছিলেন মহানবী সা:-এর মাধ্যমে। তাই মানবতার বন্ধু হিসেবে মহানবী সা: জাহান্নাম থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করে গেছেন। পার্থিব জীবনকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সুন্দর সুশৃঙ্খল এবং শানি-ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দিনভর তিনি প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন, আর পরকালীন জীবনের কঠিন শাসি- থেকে মুক্তির জন্য প্রায় রাতে আরামের ঘুম হারাম করে মহান আল্লাহর দরবারে কাঁদতেন আর প্রার্থনা করে বলতেন, ‘হে অল্লাহ! তোমার এই বান্দাদের দোষ-ত্রুটি ধরে যদি তুমি এদেরকে শাসি- দাও দিতেও পার। যেহেতু তারা তোমার বান্দা! কিন’ তুমি দয়া করে তাদেরকে সৃষ্টি করেছিলে, তাদেরকে যদি মাফ করে দাও তাও তুমি পারো, তোমার সব ক্ষমতা আছে। তুমি তাদেরকে মাফ করে দাও।’

শেষ কথা : মুহাম্মদ সা: আল্লাহর রাসূল। সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতি আল্লাহর দয়ার বাস-ব নিদর্শন তিনি। প্রেম এবং করুণার সম্মিলন তাঁর চরিত্রে অপূর্বভাবে বিমূর্ত হয়েছে। তাঁর প্রচারিত নীতি এবং আদর্শ কালো-সাদা, আরব-অনারব, ধনী-গরিব, উচ্চ-নীচ সবাইকে এক কাতারে শামিল করেছে। কালোত্তীর্ণ এ মহামানুষ এ নশ্বর ধরাধামে মহান আল্লাহর গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশ করে গেছেন। জগতের সব জড়চিন-া, ভুয়া মতবাদ এবং মানবতা বৈরী সব শক্তিকে পর্যুদস- করে মানবতার এই মহান বন্ধু চির অমর হয়ে আছেন আমাদের মাঝে। তিনিই আমাদের একমাত্র আদর্শ। তাঁর চেয়ে বড় বন্ধু আর কোনো দিন কেউ হতে পারবে না।

লেখক : ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান, শিক্ষক, প্রবন্ধকার