ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মানব সত্তায় আত্মার গুরুত্ব

মানুষের সত্তায় আত্মা হলো একটি শাসক শক্তি, যা মানুষের পুরো সত্তায় সদাসর্বদা নিজের কর্তৃত্ব গেড়ে রাখে। নিঃসন্দেহে এই শক্তিটা চিন্তা ও মস্তিষ্কের ওপরও বিজয়ী। মানবসত্তার বিভিন্ন অবস্থা তার আত্মাই নির্ণয় করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের অনুভূতিশীল অঙ্গগুলোকে তখনই স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যায় যখন আত্মা এগুলোর বাস্তবায়ন করে। আর আত্মা যদি এসব গুণাবলী থেকে বঞ্চিত হয়, তখন অনুভূতিশীল অঙ্গগুলো পূর্ণতার স্তর অতিক্রম করতে পারে না।

এই বাস্তবতার সত্যায়ন কোরআন এভাবে করেছে—  ‘আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখগুলো পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সূরা বাকারা-৭)

অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেয়ার কারণে তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে তাদের কান বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের চোখগুলোতে কালো পর্দা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং তাদের অবস্থা এই হয়ে দাঁড়াল যে— ‘তারা বধির, মূক ও অন্ধ। সুতরাং তারা ফিরে আসবে না।’ (সূরা বাকারা-১৮)

বাস্তব জিনিসটা যখন সে দেখে না, শোনে না, তাহলে সে বর্ণনা করবে কীভাবে? এই অবস্থা হলো মুমিনের জন্য খুবই হতাশাজনক। এই বিষয়টিকে কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে—  ‘বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।’ (সূরা হজ-৪৬)

যে কোনো ব্যক্তির অন্তরাবস্থা যখন ভালো হয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিত্ব প্রশংসার উপযোগী হয়। অন্তর যখন লোভ, অহঙ্কার ও কুমনোবৃত্তির কালিমা থেকে মুক্ত হয় এবং ভালো কাজের আবেগ-উদ্দীপনায় ভরপুর হয়, তখন সে অন্তর নিজের অঙ্গগুলোর পথ ভালোর দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তখন মানুষ ‘সন্তোষভাজনের’ স্তরে পৌঁছতে পারে। যার দরুন সমাজে বয়ে যায় ভালোত্ব ও কল্যাণের জোয়ার।

পক্ষান্তরে অন্তর যদি রোগাক্রান্ত হয়, তখন মনের সব অপকর্ম তার মর্যাদার সামনে পর্দা টেনে দেয়। ফলে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায়। তখন সে ‘সর্বোত্কৃষ্টের’ উঁচু স্থান থেকে নেমে ‘সর্বনিকৃষ্টের’ অতল গহ্বরে পতিত হয়। অতপর ছোঁয়াচে রোগের মতো অন্তরব্যাধির এই জীবাণুগুলো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে সমাজ ও সমাজের সদস্যদের আক্রান্ত করেই ছড়ায়। শুধু তাই নয়, বরং এই জীবাণুগুলো পুরো পৃথিবীকে আক্রান্ত করেই ক্ষান্ত হয়।

চারিত্রিক পতন, আধ্যাত্মিক অধঃপতন, জীবনাচরণের কদর্যতা, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামী চিন্তাভাবনার অভাব এবং মন-মস্তিষ্কে কুবৃত্তি ও বস্তুবাদের আক্রমণের কারণে আমাদের অন্তরাত্মা ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাস্তবেই আজকাল শারীরিক রোগের চেয়ে রুহানি রোগের সংখ্যাই বেশি। রুহানি রোগের অবস্থা এই যে, খুব কম মানুষই তার কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে। উপরন্তু প্রত্যেক ব্যক্তি হাজারো রোগে আক্রান্ত। আবার প্রত্যেকটি রুহানি রোগ ক্যান্সারের মতো রোগীকে নিজের পাঞ্জায় বেষ্টিত করে ফেলেছে।

রুহানি রোগ যখন ভয়ঙ্করভাবে মহামারীর আকার ধারণ করে ধর্মের শরীরকে খেয়ে শেষ করে দেয়, তখন রোগীদের আধিক্য ও রোগের কাঠিন্য অনুপাতে তার চিকিত্সার চেষ্টাও হতে হয় বিশালাকারে ও ব্যাপকভাবে। সেই ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলা করতে হবে সগুরুত্বে এবং স্বতন্ত্র ভিত্তিতে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, শারীরিক রোগের চিকিত্সার জন্য যত হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে ও প্রতিদিন হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে যেসব পরিকল্পনা দৈনন্দিন হয়ে চলছে, এর তুলনায় রুহানি রোগ থেকে আরোগ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা, ব্যবস্থা ও ক্লিনিক স্থাপন বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, যেসব কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠান থেকে রুহানি রোগের চিকিত্সা যথাযথভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেসব কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠান থেকেই রুহানি রোগের বিষাক্ত জীবাণু সংক্রমিত হচ্ছে ধর্মের শরীরে।

আজকের ব্যস্ততম বস্তুবাদী পৃথিবীতে প্রথমত রুহানি রোগের দিকে মনোযোগ দেয়ার এবং তার ক্ষতি অনুভব করার সময়ই নেই কারও কাছে। দ্বিতীয়ত মনোযোগ দিয়ে যদি তার জীবাণু থেকে বাঁচতেও চায়, তাহলে প্রকৃত মানবের এই দুর্ভিক্ষের দিনে তার জন্য কোনো চিকিত্সকের সন্ধান পাওয়া যায় না, যে তার আশু আরোগ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে। তৃতীয়ত যেসব ভাগ্যবানের অন্তর ও আত্মায় প্রকৃত আলোয় আলোকিত হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তারা সুচিকিত্সার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও অলসতা ও অসতর্কতার কারণে আশু আরোগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে বসে।

আত্মার রোগ নির্ণায়ন, রোগের কারণ চিহ্নিতকরণ ও তার সঠিক চিকিত্সার ক্ষেত্রে মৌলিক ও কার্যকর নীতি হলো কোরআনি নীতি। কোরআনি পদ্ধতি মানে সেই পদ্ধতি যা কোরআন নিজেই নির্ণয় করে দিয়েছে। প্রত্যেক জিনিসের সঠিক তথ্য জানার জন্য আমাদের প্রথমে কোরআনের নীতি ও স্বীকৃতিই গ্রহণ করতে হবে। তবে কোরআন থেকে নীতি গ্রহণে ভ্রান্তি ঘটার আশঙ্কা প্রবল। সেই ভ্রান্তি থেকে বাঁচার জন্য আমাদের রাসুলের (সা.) সুন্নাতকে দিকনির্দেশকের ভূমিকায় রাখতে হবে।

আর সেই গবেষণা-পদ্ধতিকে চারদিক থেকে পরিপূর্ণ করার পর নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনের জন্য রাসুলের উম্মতের ওলি-বুজুর্গদের জীবনদর্শনের আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। যাতে করে মানুষের অপরিপকস্ফ জ্ঞান-বুদ্ধি ও কর্মপদ্ধতির কোনো ভুল-ভ্রান্তি আমাদের গবেষণা পদ্ধতিতে সংক্রমিত না হয়। কোরআন-সুন্নাহর অধিক সমর্থন ওলি-বুজুর্গদের জীবন ও কর্ম থেকে নেয়া সেই আয়াতেরই অনুকরণ, যেখানে আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে এই বলে দরখাস্ত পেশ করি যে—

‘আমাদেরকে আপনি সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।’ (সূরা ফাতিহা : ৬)
‘সঠিক পথ’ যখন কোরআন-সুন্নাহর আকৃতিতে আমাদের সামনে পরিবেশন করা হয়, তখন সেই ‘সঠিক পথ’কে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে বোঝার জন্য আবার তার কাছে আবেদন জানাই।
‘সেসব লোকের পথ যাদের তুমি নেয়ামত দান করেছ।’ (সূরা ফাতিহা : ৭)

আত্মার রোগের চিকিত্সার ক্ষেত্রে আমাদের তিনটি মূল ভিত্তির ওপর কাজ করতে হবে। সেগুলো হলো :
১. স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট কোরআন থেকে
২. সত্যায়ন সুন্নাতে নবী থেকে
৩. এবং সমর্থন ওলি ও বুজুর্গ থেকে

অথচ চরম দুঃখের বিষয়, আজকের মূল সমস্যা এই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সবাই নীতিসমগ্রকে খণ্ডিত করে দেখছে। কেউ শুধু কোরআনকে গ্রহণ করছে এবং কোরআনের মর্মার্থ বোঝার ক্ষেত্রে বিবেকের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। ফলে তারা পদে পদে স্খলিত হচ্ছে। কেউ আবার শুধু হাদিসকে গ্রহণ করছে, কোরআনকে ছেড়ে দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ কোরআন-হাদিসের কোনো পরোয়াই করছে না। শুধু ওলি-বুজুর্গদের কথা ও কাজকেই সবকিছুর মানদণ্ড আখ্যায়িত করছে। ফলে চিকিত্সার নামে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত জীবাণু। তাই এখন সময় এসেছে আত্মার রোগের চিকিত্সায় উপর্যুক্ত মূলনীতিত্রয়ের সমন্বয় সাধনের, চিকিত্সা পদ্ধতির সঠিক পথনির্দেশের।

লেখক : মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ