ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মানুষের কল্যাণে শরিয়ত

মানুষ আল্লাহ তায়ালার প্রিয়তম সৃষ্টি। প্রথম মানুষ আদম (আ.)-কে তিনি অনুপম সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। কিছুদিন জান্নাতে রেখে একসময় পৃথিবীতে গড়ে দিয়েছেন তার ইহজীবনের স্থায়ী আবাস। দুনিয়ায় নির্ঝঞ্ঝাটে বসবাসের জন্য আদম ও তার বংশধরের যা কিছু প্রয়োজন, তা-ও আল্লাহ ব্যবস্থা করেছেন আদম ধরার বুকে পা রাখার আগেই। ধীরে ধীরে আদমের সন্তানরা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ল। অনুগ্রহধন্য বনু আদম যাতে তার দয়াময় প্রভুকে ভুলে না যায়—সে উদ্দেশ্যে আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন।

তাঁরা এসেছেন আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জুড়ে দেয়ার জন্য। সঙ্গে এনেছেন শরিয়ত বা মানুষের জীবনযাপনের বিধিমালা। মানুষকে তার জীবনযাপনে স্বাধীন না রেখে আল্লাহ তায়ালা তাকে বিশেষ পথের ঠিকানা দিয়েছেন। সে পথ ধরে যে চলবে তার জন্য রেখেছেন পুরস্কার। প্রশ্ন হলো, এটা কেন? স্বাধীন জীবন ছেড়ে শরিয়তনির্দেশিত পথে চললে মানুষের কোন কল্যাণটি অর্জন হবে? আমাদের জানতে হবে, শরিয়ত কেন এসেছে এবং কী তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শরীয়ত মানবজীবনের মৌলিক পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রক্ষা করতে চায়। ধর্ম, জীবন, মেধা, বংশধারা ও সম্পদ—এই পাঁচটি বিষয়ের সুরক্ষা ও সুব্যবস্থাপনা শরিয়তের প্রধান উদ্দেশ্য।

ক. ধর্মরক্ষা : ধর্মতৃষ্ণা মানুষের স্বভাবজাত। সৃষ্টিগতভাবেই সে আল্লাহর ইবাদত করতে চায়। পবিত্রতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা পছন্দ করে। কোরআনে কারিমেও সঠিক দ্বীনকে মানুষের স্বভাবজাত (ফিতরাত) আখ্যা দেয়া হয়েছে।

পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি ছিল যাদের দর্শন ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে কোনো পরিচয় ছিল না। বর্তমানেও এ ধরনের জনগোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু এমন জাতি কখনও দেখা যায়নি যাদের ধর্ম নেই। যেখানেই কোনো সমাজের বসবাস সেখানেই দেখা যাবে কোনো না কোনো ধর্ম পালিত হচ্ছে। শরিয়ত মানুষের এই প্রকৃতিকে সম্মান দেখিয়েছে।

ধর্মরক্ষায় শরিয়তের প্রধান পদক্ষেপগুলো হচ্ছে—

১. কুসংস্কারমুক্ত বিশুদ্ধ ধর্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছে। যাবতীয় অমূলক ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্তি দিয়েছে। শরিয়ত মানুষকে যে বিশ্বাস শিখিয়েছে তা অত্যন্ত স্বচ্ছ ও যুক্তিগ্রাহ্য।

২. শরিয়ত দেখাতে চেয়েছে বিশ্বাস হতে হবে প্রমাণসাপেক্ষ। দলিল-প্রমাণ ছাড়া কোনো এক বিশ্বাস লালন করতে থাকা বোকামি। কোরআনে কারিমে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণাকে প্রমাণবিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

৩. আল্লাহর সঙ্গে বান্দার গভীর সম্পর্ক তৈরির লক্ষ্যে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য মৌলিক ইবাদত অপরিহার্য করা হয়েছে। এই ইবাদতগুলো মানুষকে আল্লাহমুখী করে। বিশ্বাসের দৃঢ়তা আনে।

৪. ভ্রান্ত বোধ-বিশ্বাসে নিমজ্জিত সব মানুষ যাতে ধীরে ধীরে অজ্ঞতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে সে উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে দাওয়াতি কাজের প্রতি উত্সাহ দেয়া হয়েছে।

খ. জীবনরক্ষা : মানবজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবনের নিরাপত্তা। জীবনকে সবরকম ঝুঁকিমুক্ত করতে শরিয়ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো হলো—

১. জীবনরক্ষায় অপরিহার্য খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা প্রত্যেকের কর্তব্য বিবেচনা করেছে। আল্লাহর দেয়া যে রিজিক মানুষের চারপাশে ছড়িয়ে আছে তা থেকে প্রয়োজন মাফিক উপার্জন করার নির্দেশ দিয়েছে।

২. রাষ্ট্রের ওপর জীবনের নিরাপত্তা দেয়া আবশ্যক করেছে। জনজীবন হুমকির মধ্যে পড়ে এ ধরনের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

৩. জীবনের ক্ষতি হতে পারে এ ধরনের শারীরিক কষ্ট কখনোই অনুমোদন দেয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নামাজ-রোজা ইত্যাদি মৌলিক ইবাদতেও ছাড় দেয়া হয়েছে।

৪. নিজের বা অপরের জীবন ধ্বংস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কেউ অন্যের জীবন বিপন্ন করলে তাকে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করেছে।

গ. মেধারক্ষা : মানবজীবন অর্থবহ হওয়ার জন্য সুস্থমেধার বিকল্প নেই। জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনা সুস্থ হলেই মানবীয় গুণাবলী বিকশিত হওয়া সম্ভব। মানুষের জীবন যেমন মূল্যবান তেমনি তার সঠিক বিচারক্ষমতার মূল্যও অনেক বেশি। মেধা ও বিবেচনা সুস্থ রাখার লক্ষ্যে শরিয়ত যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে সেগুলো হলো—

১. সুস্থজ্ঞানের জন্য হুমকি সব মাদক ও মাদকজাতীয় দ্রব্য হারাম করা হয়েছে। কেউ মাদক সেবন করলে তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

২. বুদ্ধির স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। অন্ধ অনুকরণ নয়; যুক্তি-প্রমাণ ও নিরপেক্ষ বিবেচনার ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কোরআনে কারিমে বারবার বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদকে অযৌক্তিক ও দলিলবিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিশ্বাসের বিষয়গুলো মানুষকে বহুমাত্রিক যুক্তির আলোকে বোঝানো হয়েছে।

৩. মানবমস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয় এ ধরনের সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভোজবাজি ও অনিষ্টকর কল্পনাপ্রবণতা থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। যাদুটোনা ও ভবিষ্যত্ গণনার মতো বিভ্রান্তিকর পন্থাগুলোর শরিয়ত কখনোই অনুমোদন দেয়নি।

ঘ. বংশরক্ষা : শরিয়তের আরেকটি মৌলিক লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে মানুষের আগমন অব্যাহত রাখা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন আসতে থাকে এবং নতুন প্রজন্ম যাতে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে সে ব্যাপারে শরিয়ত বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে। এ লক্ষ্যে শরিয়তের পদক্ষেপগুলো হচ্ছে—

১. মানুষের আগমন অব্যাহত রাখার স্বার্থে বিবাহের বিধান রাখা হয়েছে। বিবাহের মধ্য দিয়ে নতুন মানবশিশু জন্মের পথ সুগম হয় এবং পারিবারিক বন্ধন থাকায় নবজাতকের সঠিক পরিচর্যাও নিশ্চিত হয়।

২. সন্তান বেড়ে ওঠার জন্য যা যা প্রয়োজন সবকিছুর ব্যয়ভার বাবা-মায়ের ওপর বর্তানো হয়েছে।

৩. পরিবারকে পরবর্তী প্রজন্মের পাঠশালা গণ্য করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম যাতে পরিবার থেকে উন্নত চরিত্র ও মানবীয় গুণাবলী শিখে নিতে পারে সে লক্ষ্যে পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

৪. নতুন প্রজন্মের সুষ্ঠু পরিচর্যা নিশ্চিত করা ও পারিবারিক পবিত্রতা অটুট রাখার স্বার্থে যাবতীয় বিবাহ-বহির্ভূত জৈবাচার কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে।

ঙ. সম্পদরক্ষা : সম্পদও মানুষের একটি মৌলিক প্রয়োজন। অর্থসম্পদ ও অর্থনৈতিক পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা ছাড়া জীবন ও সমাজ টিকে থাকতে পারে না। শরিয়ত সুষ্ঠু অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো হলো—

১. জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ উপার্জন করা অপরিহার্য করেছে; যার ফলে মানুষের শ্রম দেয়া নিশ্চিত হয়েছে। মানুষের শ্রম ও উদ্যোগই অর্থনীতি টিকে থাকার মূলভিত্তি।

২. পৃথকভাবেও কাজের প্রতি উত্সাহ দেয়া হয়েছে। কর্মজীবীদের প্রশংসা করা হয়েছে।

৩. অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার তাগিদে এমন সব লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে যেগুলোতে একপক্ষ লাভবান হলেও অপরপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৪. চুরি, ছিনতাইসহ অন্যের সম্পদের ওপর যাবতীয় অন্যায় হস্তক্ষেপ জঘন্য অপরাধ বিবেচনা করেছে।
আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয়সৃষ্টি মানুষের সবরকম প্রয়োজন শরিয়তের মাধ্যমে পূরণ করেছেন। দুনিয়ায় শান্তিতে বসবাসের সব ব্যবস্থাপনা করেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে।

নিজের লোভ ও কুপ্রবৃত্তিকে বশ করে মানুষ যেন শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ হয় সে লক্ষ্যে দিয়েছেন পুরস্কার ও শাস্তির ঘোষণা। কিন্তু অবুঝ মানুষ অনেক সময় দয়াময় প্রভুকে চিনতে পারে না। তাঁর পাঠানো কল্যাণের আকর শরিয়ত থেকেও কাপুরুষের মতো পালিয়ে বেড়ায়।