ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। সব কিছুতেই তার শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে, থাকবে স্বাতন্ত্র্য, সৌন্দর্য আর বিশেষত্ব। জীব হিসেবে সব জীবের মধ্যেই একটা মৌলিক সামঞ্জস্য রয়েছে। যেমন প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, আকর্ষণ। এ ছাড়াও আছে খাদ্য, পানীয়, বেঁচে থাকার আকাক্সা, নিরাপত্তা ও সর্বপ্রকার জৈবিক চাহিদা। জীব হিসেবে সবার মধ্যেই এগুলো আছে। আর মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত আছে লজ্জাশরম, ভালোমন্দের পার্থক্য বোঝার মতো জ্ঞান, ইনসাফ, ন্যায়নীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা, আত্মসম্মানবোধ ও সুবিচারের অন্তঃকরণ।

আর এসবের কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। উপরিউক্ত গুণগুলোর অভাব দেখা দিলেই তার মধ্যে মনুষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। আর তখনই শুরু হয় পাশবিকতা ও পশুত্বের অনুপ্রবেশ। মানবিক গুণগুলোকে সদা জাগ্রত প্রহরীর মতো লালন করেই আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের স্তর রক্ষা করে টিকে থাকতে হবে। মানবিক গুণাবলির মধ্যে লজ্জাশরমবোধ সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চলে আসছে। আদি মানব হজরত আদম ও হাওয়া আ: থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই অনুভূতি বিদ্যমান। এই লজ্জাশরমকে লালন করার জন্যই প্রয়োজন পোশাক-পরিচ্ছদের।

পোশাক যেমন মানুষের লজ্জা নিবারণের উপকরণ, তেমনি তার সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব বিকাশেরও উপায়-উপকরণ। মানুষ ছাড়া জীবজগতের আর কারো লজ্জাশরমের বোধ নেই। তাই তারা সমলিঙ্গ ও বিপরীত লিঙ্গের সামনে নির্দ্বিধায় নির্লজ্জভাবে বিচরণ করে। তাদের লজ্জা নিবারণের জন্য কোনো পোশাক দরকার হয় না। তাদের এ অনুভূতি একেবারেই অনুপস্থিত। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের সবার মধ্যেই এই অনুভূতিটুকু সদাজাগ্রত। মানুষের মধ্যে যারা চরম অধঃপতনে অবস্থান করছে, তাদের মধ্যেও লজ্জাবোধ শূন্যের কোঠায় নেয়া যায় না। লোভ-লালসা দেখিয়ে কাউকে নির্লজ্জ পোশাক পরিধানে রাজি করালেও একপর্যায়ে সে হোঁচট খায়।

অতি ুদ্রাতি ুদ্র আবরণ দিয়ে হলেও তার লজ্জাস্থানে আবরণ দেয়ার চেষ্টা করে। সভ্য জীব মানুষের মধ্যেও অসভ্য জীবনযাপনে যারা অভ্যস্ত তারা মানুষের লজ্জাশরম বোধের ওপর বারবার হামলা করে থাকে। তাদের কুপ্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে নানা কৌশলে মানুষকে বিবস্ত্র করার চেষ্টা করে থাকে। শিল্পচর্চার নামে বিশেষ করে নারী দেহকে অর্ধ উলঙ্গ বা তার চেয়েও আরো বেশি কিছু করে ছাড়ে। অশ্লীল নাচগানে অবতরণ করিয়ে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করে।

নারী জাতি মায়ের জাত। তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা উচিত। অথচ তাদেরকেই করা হয় অশ্রদ্ধা। ইদানীং নারীমুক্তি ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেসব নারী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে তারাও তো এ ব্যাপারে নীরব। তা না হলে কী করে পণ্যের প্রচারে নারীর অর্ধ উলঙ্গ ছবি ব্যবহার করা হয়। শিল্পের নামে নারীকে অর্ধ নগ্ন করে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অশালীনভাবে প্রদর্শন করা হয়। নারীরা অর্থের লোভে দেহব্যবসায়ে অবতীর্ণ হয়।

নারী মানসম্মান রক্ষায় এগুলোর বিরুদ্ধে কি সোচ্চার হওয়া উচিত নয়? নারীদেহ একমাত্র তার স্বামী ছাড়া সব পুরুষ থেকেই সংরক্ষিত। চলার পথে কোনো ভিন পুরুষ যদি নারীর গায়ে হাত বুলায় তবে এটা অপরাধ। এর জন্য ওই পুরুষকে সামাজিকভাবে ধিক্কার দেয়া হয় এবং আইনের আওতায় এনে শাস্তিযোগ্য সাজা দেয়া হয়। অথচ অর্থলোভে অনেক নারীই অভিনয়ের ছদ্মাবরণে পরপুরুষের আলিঙ্গন-চুম্বনকেও মেনে নেয়। এ ক্ষেত্রে সমাজ ও আইন সবই নীরব।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতির পাশাপাশি আমরা এ বিষয়ে মোটেই উন্নতি লাভ করতে পারিনি। এমনকি অধঃপতনের দিকে দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছি, শিল্পের নামে যে অশ্লীলতার চর্চা হচ্ছে তাকে পারিবারিক ও সামাজিক গণ্ডির মধ্যে এনে বিচার করে দেখুন তো কেমন লাগে? কোনো রুচিশীল ব্যক্তি বা পরিবার তার যুবতী মেয়েকে পরপুরুষের আলিঙ্গন, চুম্বন ও অশালীনভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রদর্শনে মহড়া দেখে কি সহ্য করতে পারবেন?

আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন, সব জীবকেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ নারীর প্রতি আকৃষ্ট হবে আর নারী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হবে, এটা তার জন্মগত স্বভাব। আর এ আকর্ষণ যেন সীমা লঙ্ঘন না করে সে জন্য আল্লাহ নিজে এর নৈতিক বিধান রচনা করে দিয়েছেন। তা মেনে না চললে সামাজিক কলহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবেই। এ বিশৃঙ্খলা রোধ করতে বৈজ্ঞানিক যুক্তিকে অবহেলা করলে চলবে না।

নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণকে বোঝাতে গিয়ে অনেকেই অনেক উদাহরণ দিয়ে থাকেন। কেউ চুম্বক, কেউ মোম-আগুন আর কেউ বা তেঁতুল দিয়ে বুঝিয়েছেন। এসব হচ্ছে সাধারণ মানুষকে বোঝানোর উপমা বা উদাহরণ। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে কোনো উদাহরণ যেন শালীনতার গণ্ডি অতিক্রম না করে।

প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ যে আলোচনা হয়েছে তা মানুষের জন্মগত স্বভাব বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ আর তার নিয়ন্ত্রণে নৈতিক আচরণের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের চিত্র। গাড়ির ইঞ্জিনে যে গতিবেগ সৃষ্টি হয় তার নিয়ন্ত্রণ করতেও ব্রেক চাপতে হয়, নতুবা দুর্ঘটনা অবধারিত। তেমনি আল্লাহর দেয়া নেয়ামত পরস্পরের আকর্ষণকে নৈতিকতা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করলে সমাজজীবনেও বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। আর তারই ছোবলে আমরা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি প্রতিনিয়ত। আমাদের সমাজকে এ ছোবল থেকে বাঁচাতে হলে সবাইকে সজাগ ও সোচ্চার হতে হবে।

মনে অবশ্যই লাগাম দিয়ে রুখতে হবে। পোশাকের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো লজ্জা নিবারণ। তা যদি না হয় তবে তার উদ্দেশ্যই পদদলিত হয়। আর এ থেকেই অনেক অপরাধ জন্মগ্রহণ করে। নারী ও পুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদের একটা সীমানা সৃষ্টিকর্তা নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর মানবসমাজও তারই আদলে ন্যূনতম হলেও একটা সীমা রক্ষা করে চলে আসছে। এ হিসেবে লজ্জাস্থান বলতে যা বোঝায় তা আবৃত রাখা সবার কাছেই স্বীকৃত। এ ব্যাপারে পুরুষ ও নারীর আবৃতকরণে কিছু ব্যবধান রয়েছে।

নারীদেহের কোন কোন অঙ্গ এবং পুরুষের কোন কোন অঙ্গ অবশ্যই আবৃত রাখতে হবে তার একটি সুন্দর চিত্র আমরা কুরআন ও হাদিস থেকে নিতে পারি। এ ছাড়া যদি মানুষ নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী নির্ধারণ করে তবে যার যার রুচি অনুযায়ী হবে, আর তা হবে বিশৃঙ্খলার নামান্তর। নারী ও পুরুষের ঢেকে রাখার আবশ্যিক অংশগুলোকে ইসলামের পরিভাষায় সতর বলে।

সতর ঢেকে রাখা নারী-পুরুষ সবার জন্য অবশ্যপালনীয় বা ফরজ। পুরুষের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা আর নারীর সতর হলো হাতের কব্জি, পায়ের পাতা ও মুখমণ্ডল ছাড়া সারা শরীর ঢেকে রাখা। এ অবস্থাকে আরো সুরক্ষার জন্য সৃষ্টিকর্তাই বিধান করে দিয়েছেন পর্দা রক্ষা করার জন্য। আর এ পর্দার মূলমন্ত্র হচ্ছে পুরুষসমাজে নারীর অবাধ বিচরণ ও নারীসমাজে পুরুষের অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই সতর ও পর্দার খেলাপ হলেই সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা আ: বারিক