ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত

motherপত্রিকা পড়ছিলাম। দৈনিক নয়া দিগন্ত। হঠাৎ দৃষ্টি আটকে গেল দ্বিতীয় পৃষ্ঠার একটি খবরের ওপর। গর্ভধারিণী মাকে সংসারের বোঝা মনে হওয়ায় কুমিল্লা থেকে এনে বরিশালের গৌরনদীতে ফেলে রেখে পালিয়েছে দুই ছেলে। যে মায়ের কারণে এ সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছে তার সন্তানেরা, সেই গর্ভধারিণী মা বৃদ্ধা হওয়ায় পরিবারের কাছে এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই আপদ দূর করতেই কুমিল্লা থেকে এনে বরিশালের গৌরনদীতে ফেলে রেখে পালিয়েছে দুই ছেলে। কী মর্মান্তিক! কী হৃদয়বিদারক!

খবরে এসেছে, রাস্তার পাশে অনাহারে কেটে গেছে তার দীর্ঘ আট দিন। কিন্তু এখনো ছেলের অপেক্ষায় কোথাও যেতে রাজি হচ্ছেন না ৮৫ বছরের হতভাগ্য এই মা। স্থানীয়রা তাকে বাড়িতে নেয়ার শত চেষ্টা করেও রাজি করাতে পারেননি। তার একটিই কথা, তার ছেলেরা ভুল বুঝতে পেরে আবার হয়তো ফিরে এসে এখানেই খুঁজবে তাকে। তাই প্রচণ্ড শীতের রাতে টরকী বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশের রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে ছেলেদের অপেক্ষায় কাটিয়ে দিয়েছেন দীর্ঘ আটটি দিন।

ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে সন্তানকে মানুষ করার জন্য বাবা-মা সারা জীবন কষ্ট করেছেন, যে সন্তানের সুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মা নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই নরাধম সন্তানের দ্বারাই বাবা-মা নিগৃহীত হচ্ছেন। কী নির্মম বাস্তবতা! সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের যে ভালোবাসা, তা পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সন্তানের জন্য বাবা-মা নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। তাই তাদের সম্মান করা, ভালোবাসা ও তাদের প্রতি কর্তব্য পালন করা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তিক্ত সত্য হলো, কালপরিক্রমায় আমরা হয়ে উঠি অতি নির্মম। প্রকাশ পায় বাবা-মায়ের প্রতি চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা।

বাবা-মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তারা সন্তানের উপার্জনের ওপর নির্ভশীল ও চরম অসহায় হয়ে পড়েন। আর তখন থেকেই আমরা তাদের প্রতি প্রদর্শন করি ঔদাসিন্য ও অবহেলা। তাদের ভাবতে থাকি পরিবারের বোঝাস্বরূপ। এই ভোগবাদী মানসিকতা থেকেই আজকের এই নির্মম ঘটনা। স্বামী-স্ত্রী ও আদরের ছেলে-মেয়ে নিয়ে গড়ে ওঠে সুখের সংসার। আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। পরিবার-পরিজন, ছেলেমেয়ে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক চরম অসহায় জীবনযাপন করেন তারা।

আমরা একবারও ভাবি না যে, আমাদের সন্তান আমাদের কাছে যেমন, আমরাও আমাদের বাবা-মায়ের কাছে তেমন। আমরা আমাদের সন্তানকে যেমন আদর-সোহাগ করি, মায়া-মমতা দিয়ে পরম যতেœ লালন-পালন করি, আমাদের বাবা-মাও আমাদের মায়া-মমতা দিয়ে, আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন। বাবা-মা নিজে না খেয়ে আমাদের খাইয়েছেন। নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। আমাদের সুখের দিকে তাকিয়ে তারা আরামের ঘুম হারাম করেছেন। আমাদের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। আমদের লালন-পালনে কষ্ট মনে করে কোনো শিশু আশ্রমে আমাদের পাঠিয়ে দেননি।

ইসলাম বাবা-মায়ের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের সেবা-যতœ করা, তাদের সাথে সদাচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের কথা মান্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে ফরজ। বাবা-মাকে কষ্ট দেয়া, তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা, তাদের কথা অমান্য করা নিঃসন্দেহে অনেক বড় গুনাহ। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩)

হাদিস শরিফে এসেছে, একবার জনৈক সাহাবি নবী করিম সা: দরবারে এসে জিহাদে যাওয়ার তীব্র আকাক্সা প্রকাশ করলেন। রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা-মা কেউ কি জীবিত আছে? সাহাবি হ্যাঁসূচক জবাব দিলে রাসূল সা: বললেন, বাড়িতে গিয়ে তাদের সেবা করো। (বুখারি শরিফ, হাদিস নং ২৮৪২) অন্য হাদিসে আছে, রাসূল সা: ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার বাবা-মা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে পেল, অথচ সে জান্নাত আদায় করতে পারল না, তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে?

বাবা-মা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন তখন তাদের প্রতি দায়-দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। তাদের সেবা-শুশ্রূষা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মানুষ যখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হন, তখন তারা আবার শৈশবে ফিরে যান। বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক শেকসপিয়র বার্ধক্যকে আখ্যায়িত করেছেন দ্বিতীয় শৈশব হিসেবে। তাই তখন তার বেঁচে থাকার জন্য শিশুকালের মতো আদর-স্নেহ, মায়া-মমতার প্রয়োজন হয়। বার্ধক্যের কারণে বাবা-মায়ের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে ধরনের হয়ে যেতে পারে, সামান্য বিষয় নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতে পারেন। তাই তাদের অস্বাভাবিক আচরণকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার নির্দেশ রয়েছে ইসলামে। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের একজন বা উভয়েই জীবদ্দশয়ায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের উফ বলো না। তাদের ধমক দিও না, তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩)

সন্তানের জন্য বাবা-মা উভয়েই কষ্ট করেন। তথাপি বাবার তুলনায় মায়ের হক অনেক বেশি। হজরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম সা:-এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ব্যক্তি আমার সর্বাধিক সদাচরণ পাওয়ার অধিকারী? তিনি বলেন, তোমার মা। লোকটি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমরা মা। লোকটি বললেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। (মুসলিম শরিফ)

সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, কালের বিবর্তনে আমরাও এক সময় বার্ধক্যে উপনীত হবো। আমাদের সাথে বৃদ্ধাবস্থায় তেমন আচরণ করা হবে, যেমন আচরণ আমরা আমাদের বাবা-মায়ের সাথে করব। অন্তত এই দিকটি বিবেচনায় রেখে আমাদের উচিত বাবা-মায়ের সাথে সদাচরণ করা।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর