ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মিথ্যা সব গুনার মা

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে ‘সত্য সমাগত মিথ্যা বিতাড়িত’। অর্থাৎ আলোর দীপ্তিতে আঁধারের লয়। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘যাহা শুন তাহাই বলিতে থাকো, কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য ইহাই যথেষ্ট।’ হজরত আলী রা: বলেন, ‘কখন বুঝবে একটি দেশ ও সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে? যখন দেখবে দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছে, ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছে, মূর্খরা মঞ্চে বসে আছে, জ্ঞানীরা পালিয়ে যাচ্ছে আর শাসকরা মিথ্যা কথা বলছে।’ আজকের বিশ্ব আমাদের সেটাই জানান দিচ্ছে।

মিথ্যার গোলকধাঁধায় কত সাম্রাজ্যের অধঃপতন ঘটেছে, রূপরেখা বদলেছে মনুষ্যত্বের, মুছে গেছে তার অক্টোপাসে আক্রান্ত হয়ে। স্বকীয়তা হারিয়েছে তার নিজ অবকাঠামোর আশ্রিত সীমানা থেকে, ইতিহাসে রয়েছে তার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত। কালের এই বাস্তবতা বা সাীকে আমরা জীবনের সাথে মিলাতে গিয়ে ব্যর্থ হই। যার ফলে সমাজে শান্তি-সমৃদ্ধির পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য আর ব্যাপক বিভাজন সৃষ্টি হয়। ধেয়ে আসে অমার্জনীয় বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি। এ কারণে একটা জাতি ও দেশের সাংস্কৃতিক অবকাঠামোতে মারাত্মক ভাঙন সৃষ্টি হয়। নীতি-নৈতিকতা মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ।

নবীযুগের সেই সত্য কাহিনী মানুষের জন্য আজো জীবন গড়ার ইতিবাচক শিা হয়ে আছে। রাখাল ছেলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রতিদিন ‘বাঘ! বাঘ!!’ বলে চিৎকার করে লোক জমাত। ঠিকই একদিন হঠাৎ বাঘ এসে গেল। তখন মিথ্যা ভেবে প্রতিবেশীরা আর রাখাল ছেলের ডাকে সাড়া দেয়নি। অবশেষে তাকে বাঘের খোরাকে পরিণত হতে হলো। এটা মিথ্যার ভয়ানক বিষফল।

আমরা মুসলিম জাতি। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য আজো দুনিয়ার বুকে আদর্শের মডেল। মানবতা সৌজন্যবোধ ও আদর্শ বিনির্মাণে উজ্জ্বল আমাদের অতীত ইতিহাস। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সত্যকে অভিযুক্ত করা টার্গেটধারীদের সাথে এখানেই আমাদের ব্যবধান বা মতপার্থক্য। আজ বিশ্বসমাজ মিথ্যার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। মিথ্যার থিউরি নিয়ে পৃথিবীময় দ্বীনে ইলাহিকে অভিযুক্ত করার পাঁয়তারাও আজ থেমে নেই।
ব্রিটিশ দার্শনিক ‘মেকিয়া ভেলি’ পৃথিবীর শাসকদের দু’টি থিউরির প্রতি জোর দিয়েছেন। একটা হলো ধার্মিক সাজা, অন্যটা হলো বড় বড় মিথ্যা কথা বলা। যে যত মিথ্যা বলবে সে তত কৃতিত্ব অর্জন করবে, সত্যবাদীর স্বীকৃতি লাভ করবে। আর মেকিয়া ভেলির এই বক্তব্যকে বর্তমান বিশ্ব ল্যবস্তু বানিয়েছে। ফলে গোটা দুনিয়া মোড় নিয়েছে ভয়ঙ্কর এক উল্টো স্রোতের দিকে।

মিথ্যার বিষফল অত্যন্ত ভয়াবহ। এটা সব পাপের শিকড়। হানাহানি, মারামারি, খুন, ধর্ষণ, গিবত, এমনকি রাজনৈতিক কলহ-বিবাদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিথ্যার ভয়াবহ আধিপত্য। যে ব্যক্তি মিথ্যা ছেড়েছে সে পাপ থেকে শিগগিরই ফিরে আসবে আশা করা যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি সব পাপ ছাড়ল কিন্তু মিথ্যা ছাড়ল না, তার ফিরে আসার পথ সে নিজেই বন্ধ করে দিলো। এ জন্য মিথ্যাই সব ধ্বংসের মূল। সমাজ থেকে মিথ্যা দূর করার সুমহান কাজে আত্মনিয়োগ করা। কুরআনের নির্দেশিত পথে চলা। পাশাপাশি সৎ ও আদর্শবান মানুষের অনুসরণ অনুকরণ করা। এটা ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে এক অপরিহার্য দাবি।

হেফাজতে ইসলামের গণবিস্ফোরণে আর যাই হোক মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে নাস্তিকতা কত ঘৃণিত এবং অপরিণামদর্শী। এটা যে অত্যন্ত খারাপ, তা মানুষের কাছে ব্যাপক জানাজানি হয়ে গেছে। ঠিক  মিথ্যার বিরুদ্ধেও এমন একটা গণবিস্ফোরণ হলে দেশ থেকে দুর্নীতি কিছুটা হলেও দূর হবে। কারণ দুর্নীতির মূলে রয়েছে মিথ্যার ব্যাপক ইন্ধন। এ মিথ্যার আশ্রয়ে ঐশীরা মা-বাবাকে ধোঁকা দিয়ে খুন করে। প্রেমিক প্রেমিকাকে ধর্ষণ করে। এমনকি নির্বাচনে ভোটচুরির জাদুগিরিসহ আরো অনাকাক্সিত কাজগুলো মিথ্যার কারণেই হয়ে থাকে। ফলে দেশ ও দশের চরম বিপর্যয় সূচিত হয়।

দেশের সব সেক্টরে দুর্নীতির মতা এখন লণীয়। ফলে উন্নতির নামে সমাজব্যবস্থায় এখন আদর্শিক নৈতিক ও আর্থিক বিপর্যয় প্রতীয়মান। কাজেই জাতি ও দেশের বারোটা বাজার উপক্রম। অথচ এর যথাবিহিত কোনো সমাধান বের হয় না।

তাই যেদিন সমাজ মিথ্যা প্রলাপ থেকে উঠে আসবে, স্বার্থের বলি দেবে জনকল্যাণে, পাপকে পাপ মনে করবে, অপরাধকে দোষণীয় মনে করবে, সচেতন হবে মানুষের জন্য, তবেই শান্তির আশা করা যায়। আগে মিথ্যা ছাড়তে হবে তারপর সমাজ গড়ার কথা ভাবতে হবে। এর ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এ েেত্র সাংবিধানিকভাবে আইন পাসসহ দেশের কল্যাণকামী কর্মীবাহিনীকে মিথ্যার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করানো অপরিহার্য। মিথ্যার েেত্র লণীয় শাস্তির ব্যবস্থা করাও সময়ের দাবি। এ অপরিহার্যতার জন্য চাই নির্মল আত্মবিশ্বাস, মুক্ত চিন্তার বিবেক ও সঠিক পরামর্শ। এটাই প্রত্যাশা করি।