ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মুমিনের জীবনে শৃঙ্খলা আনে প্রতিদান-চিন্তা

মুমিনের জীবনে শৃঙ্খলা আনে প্রতিদান-চিন্তাযেসব মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের ওপর ইসলামের ভিত্তি, তার মধ্যে তাওহিদ ও রিসালাতের পর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘আখিরাতে বিশ্বাস’। ‘আখিরাতে বিশ্বাস’-এর অর্থ হচ্ছে—মৃত্যুর পর মানুষকে এমন এক স্থায়ী জীবনের সম্মুখীন হতে হবে, যেখানে তার থেকে এই দুনিয়ায় কৃত সব কাজের হিসাব নেয়া হবে। সেই স্থায়ী জীবনকেই আখিরাত বলে। কোরআন মাজিদ এ সত্যের পৌনঃপুনিক ঘোষণা দিয়েছে যে, আখিরাতে মানুষকে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হবে এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি দেয়া হবে। যেমন ইরশাদ হয়েছে—‘যে ব্যক্তি বিন্দুপরিমাণ সত্কর্ম করবে সে তা (আখিরাতে) দেখতে পাবে এবং যে ব্যক্তি বিন্দুপরিমাণ অসত্ কর্ম করবে সেও তা দেখতে পাবে।’ (সূরা যিলযাল : আয়াত ৭-৮)

আমরা একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাই, এই মহাবিশ্ব কী সুদৃঢ়, প্রাজ্ঞোচিত ও সুসামঞ্জস নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীনে চলছে। এ পর্যবেক্ষণ আমাদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য করে যে, এই জগত আপনা-আপনি অস্তিত্ব লাভ করেনি; বরং এর একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। সেই সৃষ্টিকর্তা অসীম জ্ঞান-প্রজ্ঞার অধিকারী এবং তাঁর কোনো কাজ হিকমত ও তাত্পর্যহীন নয়। আমরা লক্ষ্য করলে আরও দেখি, এ দুনিয়ায় সব রকমের লোক আছে। ভালো লোকও আছে, দুষ্ট লোকও আছে। মুত্তাকি-পরহেজগারও আছে, আছে নাফরমান ও পাপাচারীও। জালেম-মজলুম, সাধু-ভণ্ড, আস্তিক-নাস্তিক হার কিসিমের লোকের সমাহার এ জগতে।

এ অবস্থায় এই পার্থিব জীবনই যদি হয় সব কিছু, এরপর আর কোনো জীবন না থাকে, তবে সৃষ্টির এ মহাকারখানা নিরর্থক হয়ে যায়। কেননা তাহলে ভালো লোক তার ভালো কাজের প্রতিদান পাচ্ছে না আর মন্দ লোকও তার মন্দ কাজের বদলা পাচ্ছে না, আর এভাবে ভালো-মন্দ ও পাপ-পুণ্য একই পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়—উভয়ের মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকে না।

এটা একজন প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তার পক্ষে মানানসই হয় না যে, তিনি ভালো-মন্দের ফলাফলে কোনো তারতম্য রাখবেন না এবং জালিম-মজলুম ও নেককার-বদকারের সঙ্গে অভিন্ন আচরণ করবেন। সুতরাং সৃষ্টিজগত স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছে, মৃত্যু দ্বারা মানব জীবনের চিরতরে নিঃশেষ হয়ে যায় না; বরং মৃত্যুর পর মানুষ এক অনিঃশেষ জগতে চলে যায়, যেখানে তাকে পার্থিব জীবনের কর্মফল দেয়া হবে। এই মহাসত্যের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেই কোরআন মাজিদ বলছে—‘তবে কি তোমরা মনে করেছ আমি তোমাদের অহেতুক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?’ (সূরা মুমিনুন : আয়াত ১১৫)

বোঝা গেল, আখিরাত এবং পুরস্কার ও শাস্তির প্রতিষ্ঠা একটি বৌদ্ধিক প্রয়োজন। তা না হলে সৃষ্টির কারখানা অর্থহীন হয়ে যায়। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা অদৃশ্য সত্য সম্পর্কে মানুষকে অবগত করা এবং নিজ বিধি-বিধানের শিক্ষাদানের জন্য যত নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই অতি গুরুত্বের সঙ্গে আখিরাতের বিশ্বাস সম্পর্কে শিক্ষাদান করেছেন এবং আখিরাতের ঘটনাবলী সম্পর্কে তাদের বিস্তারিতভাবে অবগত করেছেন। খোদ কোরআন মাজিদেরও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে আখিরাত এবং পুরস্কার-শাস্তির বিবরণই বিবৃত হয়েছে। কোরআন-সুন্নাহ ও আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের শিক্ষায় আখিরাতের বিশ্বাসের প্রতি এতটা গুরুত্ব দেয়ার উদ্দেশ্য মানুষকে সত্যিকারের মানুষরূপে গড়ে তোলা।

মানুষের মনুষ্যত্ব জাগ্রত করার জন্য ‘শাস্তি ও পুরস্কারে গভীর বিশ্বাস’ অপেক্ষা বেশি কার্যকর আর কোনো জিনিস নেই। একদিন আল্লাহ তায়ালার সামনে নিজের প্রতিটি কথা ও কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে—এ বিশ্বাস মানুষের মন-মস্তিষ্কে যতক্ষণ পর্যন্ত শক্ত হয়ে না বসে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ইন্দ্রিয়পরবশতা থেকে মুক্তি পেতে পারে না; বরং এই বিশ্বাসহীন মানুষ সর্বদা কুপ্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়ের দাস হয়েই জীবন-যাপন করে। ফলে পাপাচার, কুঅভ্যাস, দুশ্চরিত্রতার আবিলতা থেকে কখনও তার নাজাত মেলে না।

মানুষের চোখের সামনে আখিরাতের জবাবদিহিতার বিষয়টি না থাকলে কঠিন থেকে কঠিনতর আইনও তাকে অপরাধ ও চরিত্রহীনতা থেকে বিরত রাখতে পারে না। কেননা পুলিশ ও আদালতের ভয় ক্ষুদ্রায়ন বৃত্তের মধ্যেই কাজ করে। বড়জোর দিনের আলোয় এবং তাও নগর-কোলাহলের ভেতর। এই ক্ষুদ্র পরিসরের ভেতরই আদালতভীতি মানুষকে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে কিংবা পল্লী-পাড়াগাঁয়ে কোন পাহারাদার তার অপরাধ-প্রবণতা দমন করে রাখবে? সেখানে এক আল্লাহর ভয় ও আখিরাত-ভীতিই তার অন্তরে প্রহরীর ভূমিকা রাখতে পারে, আর কিছু নয়।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেইশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার রহস্য এখানেই। তিনি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষার মাধ্যমে মানব মনে আখিরাতের চিন্তা বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন। ফলে সাহাবায়ে কিরাম আখিরাতের হিসাব-নিকাশের বিষয়টাকে সর্বদা দৃষ্টির সামনে রাখতেন, যেন তা চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছেন। এই আখিরাত-চিন্তা তাদের দ্বারা এমন সব কঠিন কাজও অনায়াসে করিয়ে নিচ্ছিল, যা যুগ-যুগান্তরের তালিম ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও আনজাম দেয়ানো কঠিন।

মদ পানের অভ্যাসটাকেই ধরুন না! মদপান যে একটা বদঅভ্যাস, স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ও চরিত্র ধ্বংসকর, এ বিষয়ে আজ দুনিয়ার অধিকাংশ সভ্য জাতি একমত এবং তারা বৌদ্ধিক ও ব্যবহারিকভাবে স্বীকারও করে। এ বিষয়ের ওপর অতি মূল্যবান নিবন্ধ লেখা হচ্ছে, পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সারগর্ভ গবেষণা প্রকাশ পাচ্ছে। অথচ আজকের সভ্যজগত নিজ জ্ঞান-গরিমা ও সায়েন্টিফিক উত্কর্ষ নিয়ে রীতিমত গর্বিত—অখণ্ডনীয় দলিল-প্রমাণ, পত্র-পত্রিকার তথ্যবহুল-হৃদয়স্পর্শী বিশেষ সংখ্যা এবং আধুনিক-উন্নত প্রচার মাধ্যম ও মানসিকতা গঠনের সর্বাধুনিক উপকরণাদি ব্যবহার সত্ত্বেও মাদকাসক্তদের মদ ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উন্নত বিশ্ব মাদকাসক্তি নির্মূলের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণদান এবং নৈতিক ও আদর্শিক প্রণোদনাদান থেকে শুরু করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ পর্যন্ত সব ধরনের কৌশল পরীক্ষা করে দেখেছে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, উল্টো মদ্যপায়ীদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে।

এর বিপরীতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সমাজ ও পরিবেশে প্রেরিত হয়েছিলেন, তার দিকে একবার নজর দিন। প্রাক-ইসলামী যুগ তো বটেই, ইসলামের প্রাথমিক যুগেও আরব সমাজে মদপানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ঘরে-ঘরে মদপান করা হতো পানির মতো। মদের প্রতি আরবদের যে কী গভীর আসক্তি ও তীব্র আকর্ষণ ছিল, ‘মদ’-এর বহুল প্রতিশব্দ দ্বারাই তা প্রমাণিত হয়। আরবি ভাষায় এর প্রায় আড়াইশ’ প্রতিশব্দ আছে। সে সমাজে মদপান দোষের হবে কি, রীতিমত গর্বের বিষয় ছিল। কিন্তু কোরআন মাজিদ যেই না মদের নিষিদ্ধতা ঘোষণা করল, অমনি সেই জাতি তাদের সর্বাপেক্ষা প্রিয় এই পানীয়কে এমন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পরিত্যাগ করল, ইতিহাসে যার নজির পাওয়া দুষ্কর।

হজরত বুরায়দা (রাযি.) বলেন, মদের নিষিদ্ধতা সম্পর্কিত আয়াত যখন নাজিল হয়, তখন এক আসরে মদ পরিবেশিত হচ্ছিল। আমি তাদের সে আয়াত পড়ে শোনানো মাত্র যে যেই অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায়ই তা ফেলে দিল। কারও ঠোঁট পেয়ালায় চাপানো ছিল, কেউ চুমুক দিয়ে মুখের ভেতর মদ নিয়ে ফেলেছিল। আয়াত শোনামাত্র ঠোঁট সরিয়ে ফেলল, মুখেরটুকু পর্যন্ত কেউ গিলে ফেলল না, তাও কুলি করে ফেলে দিল। (তাফসিরে ইবনে কাছির, সূরা মায়িদা, আয়াত ৯০, খণ্ড : ২, পৃ: ১৩২)।

হজরত আনাস (রাযি.) বলেন, আমি এক মজলিশে মদ পরিবেশন করছিলাম। হঠাত্ ঘোষকের ঘোষণা শোনা গেল, ‘মদ হারাম করা হয়েছে। শোনামাত্র আসরের সবাই মদ ফেলে দিল এবং মদের মটকা ভেঙে ফেলল। মদিনার অলিগলিতে পানির মতো মদ প্রবাহিত হতে থাকল। (তাফসিরে ইবনে কাছির, সূরা মায়েদা : আয়াত নং ৯০, খণ্ড ২, পৃ. ১৩০)

অভ্যাস ও আখলাক-চরিত্রের এ বিস্ময়কর পরিবর্তন ছিল মূলত আল্লাহ তায়ালার মহব্বত ও ভয় এবং পুরস্কার ও শাস্তিতে বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। এভাবেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের মন-মস্তিষ্কে এ ভক্তি-বিশ্বাস সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিলেন। আর এরই ফলে রিসালাতের যুগে অন্যায়-অপরাধের মাত্রা হ্রাস পেতে পেতে শূন্যের কোঠায় পৌঁছে গিয়েছিল।

মানবীয় দুর্বলতাবশে কদাচিত কারও দ্বারা কোনো অপরাধ ঘটে গেলেও তাকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশের দরকার হতো না; বরং সে নিজেই এসে ধরা দিত এবং অনুনয়-বিনয় করে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়ে নিজের ওপর শাস্তি প্রয়োগ করাত। কেননা তাদের অন্তরে এ বিশ্বাস প্রোথিত ছিল যে, দুনিয়ার শাস্তি অপেক্ষা আখিরাতের শাস্তি ঢের কঠিন; বরং আখিরাতের শাস্তির তুলনায় দুনিয়ার শাস্তি কোনো ব্যাপারই নয়। সে হিসেবে এটা অনেক সহনীয়।

আজও দুনিয়ায় কোনো জিনিস যদি অপরাধ, অনৈতিকতা, অশান্তি, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি থেকে মুক্তি দিতে পারে, তবে তা পারে কেবল এই আল্লাহভীতি, আখিরাত-চিন্তা এবং পুরস্কার-শাস্তির বিশ্বাস। তবে এজন্য এসব বিশ্বাসের কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট নয়; বরং দরকার এর জীবন্ত বিশ্বাস ও সদাজাগ্রত চেতনা। চেতনাকে জাগ্রত করে রাখার সহজ পন্থা হলো কোরআন ও হাদিসে আখিরাত সংক্রান্ত যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তা বার বার পড়া এবং যাপিত জীবনের শত ব্যস্ততার ভেতরেও কিছুটা সময় আখিরাত-চিন্তার জন্য বরাদ্দ রেখে মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থাগুলো নিয়মিতভাবে চিন্তা করা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—‘তোমরা স্বাদ-আহ্লাদ বিনাশকারী বস্তু তথা মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ কর। (সুনান তিরমিযি, হাদিস নং ২৩৮৩)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এসব হাদিসের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।