ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মুমিনের পোশাক-পরিচ্ছদ

পৃথিবীর নানা জাতির মাঝে পোশাক নিয়ে রয়েছে নানা মত, নানা দৃষ্টিভঙ্গি। এক জাতির পোশাক অন্য জাতির কাছে হয়ে যায় হাস্যকর কিংবা লজ্জাকর। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্ম কিংবা নিজস্ব চিন-ার ভিত্তিতে পোশাকের রূপ দেয়। আবার কেউ বা নিজস্ব চিন-া বাদ দিয়ে অন্যের অনুকরণে ব্যস-। খোদ মুসলিম সমাজে পোশাক নিয়ে রয়েছে রুচি-অরুচির বিপুল বৈচিত্র্য।

কেউ নিজের বাসস’ানে পরে একরকম পোশাক, কর্মক্ষেত্রে অন্যরকম। ইসলামী পরিবেশে একরকম, অনৈসলামিক পরিবেশে আরেক রকম। খেলাধুলায় লজ্জার মাথা খেয়ে পরে ভিন্নরকম, নাচ, গান, শুটিং আর মডেলিংয়ে তো পোশাকের অবস’া খুবই করুণ। এ যেন যখন যেমন তখন তেমন অবস’া। মুসলমানদের মনে রাখতে হবে, মানব সভ্যতা বিকাশে ইসলামই দিয়েছে মানুষের জন্য অন্যান্য সব দিকের মতো পোশাকের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পোশাকনীতি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য জীবনধারা হচ্ছে ইসলাম।’ (সূরা আল ইমরান, আয়াত-১৯)।

পোশাক আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত : আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তোমাদের লজ্জাস’ান ঢাকার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়া জাগ্রতকারী পোশাকই সর্বোৎকৃষ্ট।’ (সূরা আরাফ, আয়াত-২৬)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘এবং তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস’া করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের, যা তোমাদের তাপ থেকে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস’া করেছেন তোমাদের বর্মের, যা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে। এভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তার নেয়ামত পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা তার কাছে আত্মসমর্পণ করো।’(সূরা নাহল, আয়াত-৮১)।

শালীন পোশাকের মাধ্যমে লজ্জা লালিত হয় : একটি প্রবাদ প্রচলিত- ‘লজ্জাই নারীর ভূষণ।’ আজ নারীকে এ ভূষণ থেকে মুক্ত করতে বেহায়াপনা, অশ্লীলতার মতো মরণপণ প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিচ্ছে। অথচ মুসলিম মাত্রই জানার কথা, লজ্জাহীন ঈমান অর্থহীন। তাই ঈমানদার নারী-পুরুষ সবার জন্যই লজ্জা ঈমানের অংশ। লজ্জা যদি না থাকে, তবে একজন মানুষ যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। এ জন্যই জীবন নিয়ন্ত্রণের জন্য লজ্জা প্রয়োজন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অঙ্গ, আর ঈমানদার জান্নাতে যাবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)।

বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের বিধান : ইসলাম পুরুষকে পুরুষ হিসেবেই দেখতে চায়, আবার নারীকে নারী হিসেবেই দেখতে চায়। এটাই শৃঙ্খলা ও শাশ্বত। তাই নারী যদি পুরুষের পোশাক পরে কিংবা পুরুষ যদি নারীর পোশাক পরে, এটি যেমন ভুল তেমনি এমন কাজ লানতও বয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং লানত থেকে বাঁচতে হলে বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরা যাবে না। এ বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে পুরুষ নারীর মতো পোশাক পরিধান করে এবং যে নারী পুরুষের মতো পোশাক পরিধান করে, তাদের জন্য লানত।’ (আবু দাউদ)।

মুসলিম নারীর পোশাক কী রকম হবে?
সতর ঢাকতে হবে : সতর মানে দেহের যে গুপ্তাঙ্গকে ঢেকে রাখা ফরজ। অবশ্য স্বামী-স্ত্রীতে কোনো পর্দা নেই। মহিলাদের কতটুকু অংশ সতর বলে গণ্য, তা আল্লাহ তায়ালা এভাবে নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তারা যেন (স্বভাবতই) যা প্রকাশিত তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য-অলঙ্কার প্রদর্শন না করে।’ (সূরা নূর, আয়াত-৩১)। স্বভাবতই যা প্রকাশিত হয়, এ ব্যাখ্যায় আল্লামা শাব্বির আহমেদ উসমানী রহ:-এর তাফসির গ্রনে’ বলেন, প্রিয় নবী সা:-এর হাদিস ও সাহাবি রা:-এর বাণী দ্বারা সাব্যস- হয় যে, ‘মুখমণ্ডল ও দুই হাতের তালু স্বভাবতই যা প্রকাশিত হয়’ এর অন-র্ভুক্ত, পরে ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা দুই পায়ের পাতাকেই এর অন-র্ভুক্ত করেন। সুতরাং মুখমণ্ডল, দুই হাতের তালু ও দুই পায়ের পাতা ব্যতীত মহিলার সারাদেহই সতর। অবশ্য মনে রাখতে হবে, বর্ণ-সৌন্দর্য যেন বাইরে প্রকাশ না ঘটে। কেননা পাতলা কাপড়ে পোশাক পরা উলঙ্গ থাকার শামিল, যা কবিরা গুনাহ। হাইসামি নামক সাহাবি হজরত জারির বিন আবদুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ পোশাক পরিধান করা অবস’ায় উলঙ্গ থাকে অর্থাৎ তার পোশাক একদম পাতলা।’ (সহি হাদিস)।

পোশাক হবে ঢিলেঢালা : মহিলাদের পোশাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তা আঁটসাঁট হবে না। আঁটসাঁট পোশাক পরা মুসলিম নারীদের জন্য হারাম করা হয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে নারীদেহের আকৃতি প্রকাশ হয়ে পড়ে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘দুনিয়ায় অনেক পোশাক পরিহিতা নারী আখেরাতে বস্ত্রহীনা বলে গণ্য হবে।’ (বুখারি শরিফ)।

বিশিষ্ট তাবেয়ি হিশাম বিন ওরওয়া বলেন, আমার আম্মা আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রা:-কে মারভ অঞ্চলের মূল্যবান কাপড় হাদিয়া দেয়া হয়, মা তখন অন্ধ ছিলেন, কাপড়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বললেন উফ! কাপড়গুলো ফেরত পাঠিয়ে দাও। আমি বললাম, আম্মা কাপড়গুলো তো পাতলা নয় যে, দেহের রঙ দেখা যাবে। মা বললেন, দেহের রঙ দেখা না গেলেও তা এত মোলায়েম যে, তা পরলে দেহের আকৃতি কেমন তা প্রকাশ হয়ে যাবে।
মুসনাদে আহমেদে বলা হয়েছে, রাসূল সা: মিসরীয় কাবাতি কাপড় মহিলারা পরিধান প্রসঙ্গে সতর্ক করাকালে বলেছিলেন, ‘কারণ আমার ভয় হয় যে, এ কাপড়টি তার (ওই নারীর) হারের আকৃতি প্রকাশ করে দেবে।’

মস-কাবরণ : ওড়নার মাধ্যমে মাথা, গলা, বক্ষদেশ ঢেকে রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা (নারীরা) যেন তাদের গলা, বক্ষ, মাথা ওড়নাতে ঢেকে রাখে।’ (সূরা নূর)।

নেকাবের হুকুম : নেকাব বলা হয় মহিলার মুখাবরণকে। অর্থাৎ যা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা হয়। অনেক মুফাসসির মুখমণ্ডলকে সতর বলে গণ্য করেননি। তবে এ কথা সত্য যে, মুখমণ্ডল সতর না হলেও পরপুরুষ থেকে পর্দার অন-র্ভুক্ত। কারণ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মুখ দেখে সূচনা হয়, পা দেখে হয় না। মহিলা সাহাবিরাও নেকাব পরিধান করতেন। তাফসিরে জালালাইনে সূরা নূরে ইফকের ঘটনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত আয়েশা রা: বলেন, ‘আমি ঘুমন-। হজরত সাফওয়ান আমাকে চিনতে পেরে ইন্নানিল্লাহ বললে এর আওয়াজে জাগ্রত হলাম এবং প্রথমেই আমি আমার চাদর দিয়ে মুখমণ্ডল ঢেকে তার থেকে আড়াল করলাম।’

মুসলিম পুরুষের পোশাক কী রকম হবে?

পোশাক পরার উদ্দেশ্য হলো গোপনাঙ্গ বা লজ্জাস’ান ঢেকে রাখা। স্বীয় স্ত্রী ছাড়া অন্য থেকে তা আবৃত করা ফরজ। আবৃতব্য ওই স’ানকেই সতর বলা হয়। রাসূল সা: পুরুষদের সতরের নির্দিষ্ট পরিমাণ জানিয়ে দিয়েছেন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘নাভির নিম্ন থেকে হাঁটু পর্যন- স’ান আবৃতব্য অংশই পুরুষের সতর।’ আগে বলা হয়েছে, সতর ঢাকার পোশাক মোটা ও ঢিলেঢালা হবে। খুব মোলায়েম বা চিকন পোশাক পরা যাবে না, যাতে করে গোপনাঙ্গের আকৃতি প্রকাশ হয়। অহঙ্কারমূলক পোশাক বর্জন করতে হবে। নম্রতা, ভদ্রতা, বিনয়, মহব্বত ইত্যাদি ইসলাম পছন্দ করে। তাই পোশাকও ওই মানের সহায়ক হতে হবে।

অহঙ্কার প্রকাশ পায় তেমন পোশাক পরা জায়েজ নেই। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রসিদ্ধির জন্য পোশাক পরবে, আল্লাহ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন এবং তাকে যখন চান অপমানিত করবেন।’ একজন মুসলিম পুরুষকে সর্বদা মনে রাখতে হবে, তার পোশাক-পরিচ্ছদই তাকে তার ধর্ম, জাতীয়তা, আচার-আচরণ, বংশ-মর্যাদাকে পরিচয় করে দেয়। তাই মুসলিম নারী ও পুরুষের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো- বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা প্রকাশ প্রায় এমন পোশাক পরিহার করে আদর্শিক, শালীন ও কুরআন-হাদিস সমর্থিত পোশাক পরিধান করা।

লেখক: মাওলানা আবুল বাশার মিরাজী,  প্রভাষক, আরবি, দেবিদ্বার, ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা