ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মুমিন জীবনের বৈশিষ্ট্য

যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদে পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সে অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করে তাকেই মুমিন বলে। অন্যভাবে বলা যায় মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রেরিত নবী, রাসূল, ফেরেশতা, কিতাব, পরকাল ও তাকদিরের প্রতি পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে বিশ্বাস স্থাপন করে আর ঈমান গ্রহণের পর যে ব্যক্তি ঈমান থেকে বিন্দুমাত্রও বিচ্যুতি হননি তিনিই মুমিন।

মুমিনের বৈশিষ্ট্য : মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারিম ও পবিত্র হাদিস শরিফে মুমিনের চারিত্র্যিক সনদ অর্থাৎ যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে তা পেশ করা হলো

সন্দেহমুক্ত জীবনযাপন : মুমিন আল্লাহর রুবুবিয়াতের ওপর ঈমান আনার পর আর কখনো সন্দেহে পড়েন না। সে পূর্ণতার সাথে আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালার ওপর আস্থাশীল। যেমন মহান আল্লাহপাক সোবহানাহু তায়ালা বলেন ‘প্রকৃত মুমিন তারাই যারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর আর সন্দেহে পড়েন না এবং নিজেদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে  জেহাদ করে, এরাই সত্যবাদী।’ (সূরা হুজরাত-১৫)

মুমিন মহব্বত ও দয়ার প্রতীক : মুমিন জিন্দিগির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মহব্বত ও দয়া। এ জন্য মুমিনকে মহব্বত ও দয়ার প্রতীক বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন নিশ্চয়ই সৎকর্মশীল মুমিনদের জন্য দয়াময় আল্লাহ তাদের জন্য (মানুষের অন্তরেও) মহব্বত পয়দা করে দেন। (মরিয়াম-৯৬) যেমন আল্লাহর রাসূল সা: এরশাদ করেন ‘মুমিন মহব্বত ও দয়ার প্রতীক। ওই ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে কারো সাথে মহব্বত রাখে না এবং মহব্বতপ্রাপ্ত হয় না’ (হজরত আবু হুরায়রা-মুসনাদে আহমদ

মুমিন আল্লাহর ভয়ে ভীত : মুমিন তার অন্তরে সার্বক্ষণিক আল্লাহ তায়ালার ভয় লালন করে বিধায় শয়তান তার ওপর সওয়ার হতে পারে না এবং সে আল্লাহর ওপর এমন আস্থাশীল যেকোনো বিপদ ও তাকে আল্লাহর বিধান থেকে গাফিল করতে পারে না, বরং তার ঈমানের জযবা আরো বেড়ে যায়। মহান রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন প্রকৃত মুমিন তারা যারা আল্লাহর স্মরণে তাদের দিল কেঁপে ওঠে, তাদের সামনে আল্লাহর বাণী উচ্চারিত হলে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, তারা আল্লাহর ওপর আস্থাশীল ও নির্ভরশীল হয়ে থাকে, নামাজ কায়েম করে এবং আল্লাহ-প্রদত্ত রিজিক থেকে ব্যয় করে। বস্তুত তারা হচ্ছেন সত্যিকারের মুমিন। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে উচ্চমর্যাদা রয়েছে আরো রয়েছে অপরাধের ক্ষমা ও অতি উত্তম রিজিক। (আনফাল ২-৪)

মুমিন আল্লাহর ফায়সালার পূর্ণ অনুগামী : মুমিন তার ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামষ্টিক জীবনে আল্লাহর বিধান ও ফায়সালার খেলাফ করে না এবং জমিনে আল্লাহর বিধান ও ফায়সালার বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। কালামুল্লাহ শরিফে এরশাদ হয়েছে ‘মুমিনদের বৈশিষ্ট্য এই যে, যখন তাদের মধ্যে ফায়সালার জন্য আল্লাহ ও রাসূলের (বিধানের) প্রতি ডাকা হয়, তখন তারা বলে আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম, আর এই রূপ লোকেরা প্রকৃত সফলকাম’। (সুরা আন নূর-৫১)

মুমিন আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তিপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী : মুমিন জিন্দিগিতে আল্লাহর স্মরণ আল্লাহর বিধানের অনুসরণ তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে, সে আরো অধিক হারে আল্লাহর বিধানের পায়বন্দিতে আগ্রহী হয়। যেমন মহান আল্লাহপাক সুরা রাদের ২৮ আয়াতে এরশাদ করেন ‘যারা মুমিন আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর পরম শান্তি ও স্বস্তি লাভ করে থাকে।’

মুমিন আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী : মুমিন আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালার রহমতের ছায়ার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী। তারা আল্লাহর হুকুমের যথাযথ অনুসরণের দরুন আল্লাহ তাঁর রহমত দ্বারা তাদের বেস্টন করে রাখেন। সুরা তাওবার ৭১ আয়াতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন ‘মুমিন নারী পুরুষেরা তারা পরস্পরের বন্ধু সাহায্যকারী। তারা একে অপরকে যাবতীয় ভালো কাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় ও পাপকাজ থেকে বিরত রাখে, জাকাত পরিশোধ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তারা এমন লোক যাদের প্রতি আল্লাহর রহমত অবশ্যই নাজিল হবে।’

মুমিন আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী : মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুমিনদের একমাত্র সাহায্যকারী এবং যথাযথ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মুমিন জনশক্তিই আল্লাহর সাহায্যের একমাত্র হকদার। সূরা আর রুমের ৪৭ আয়াতে এরশাদ হয়েছে ‘অতঃপর আমি অপরাধীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছি আর মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।’

মুমিনরাই বিজয়ী জনগোষ্ঠী : সত্যিকার মুমিনরা দুনিয়া ও আখিরাতের একমাত্র সফলকাম জনগোষ্ঠী। মুমিন জিন্দেগির শর্তপূর্ণতা দানকারীদের আখেরাতের সফলতার পাশাপাশি দুনিয়াতেও বিজয় দান করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা সত্যিকারের মুমিন হয়ে থাক।’ (আল ইমরান-১৩৯)

মুমিনদের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক আল্লাহ : আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা স্বয়ং মুমিনদের একমাত্র পৃষ্ঠপোষক যদ্দরুন বাতিলের গর্জন হুঙ্কারকে তারা পরোয়া না করে আল্লাহর রুবিয়াহ প্রতিষ্ঠায় সার্বক্ষণিক তৎপর। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘লোকেরা যখন তাদেরকে (মুমিনদের) বলে তোমাদের বিরুদ্ধে সমরসজ্জিত বিরাট বাহিনী সমবেত হয়েছে। তখন এ কথা শুনে তাদের ঈমান আরো বেড়ে যায় এবং তারা বলে (কাফিরদের বিরুদ্ধে) আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি সর্বোত্তম কর্মকর্তা। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মুমিনদের পৃষ্ঠপোষক তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন।’ (বাকারা ২৫৭)

মুমিনরা ভীতিমুক্ত শান্তি ও নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আবদ্ধ জনগোষ্ঠী : মহান আল্লাহপাক পবিত্র কালামে এরশাদ করেন, ‘তোমরাদের মধ্যে সত্যিকার মুমিন ও সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, তাদের পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন, যেমনি দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তী মুমিনদের। আর তিনি তাদের জন্য যে দ্বীন পছন্দ করেছেন অবশ্যই তার প্রতিষ্ঠাদান করবেন এবং তাদের ভীতিজনক অবস্থাকে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিণত করবেন।’ (সূরা আন নূর ৫৫)

মুমিনরা দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিষ্ঠিত জনগোষ্ঠী : প্রকৃত মুমিনদের দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে আল্লাহ পাক ওয়াদাবদ্ধ। সূরা ইবরাহিম ২৭ আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনদেরকে আল্লাহ এক সুপ্রমাণিত কথার ভিত্তিতে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় স্থানে প্রতিষ্ঠা দান করেন আর জালিমদের করে দেন বিভ্রান্ত এবং তিনি যা ইচ্ছা করেন তা করার ইখতিয়ার তার রয়েছে।’ সূরা আন নূরের ৫৫ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সত্যিকার মুমিন ও সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, তিনি অবশ্যই তাদের পৃথিবীতে খেলাফত দান করবেন।’

মুমিনরা জান্নাতের একমাত্র হকদার : আল্লাহ পাক সূরা আহযাবের ৪৭ আয়াতে বলেন, ‘হে নবী মুমিনদের সুসংবাদ দিন, আল্লাহর তরফ থেকে তাদের জন্য অনেক অনুগ্রহ রয়েছে। আর এই অনুগ্রহরাজির মধ্যে সর্বোচ্চ অনুগ্রহ হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ ও জান্নাতের সর্বোত্তম হকদার হওয়া এবং এটাই মুমিনদের আসল সফলতা। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে, ‘এই মুমিন পুরুষ-নারীদের সম্পর্কে আল্লাহর ওয়াদা এই, তাদেরকে এমন বাগবাগিচা দান করবেন যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান চিরকাল তারা তা উপভোগ করবে, এই চির সবুজ শ্যামল জান্নাতে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র পরিচ্ছন্ন বসবাসের স্থান, আল্লাহর সন্তোষ লাভ করে তারা হবে সৌভাগ্যবান আর এ হবে তাদের বড় সাফল্য’। (সূরা আত তাওবা ৭২) সূরা নিছার ৫৭ আয়াতে বলা হয়েছে ‘সৎকর্মশীল মুমিনদের আমি এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবো যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান। চিরকাল তারা তা উপভোগ করবে সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গী নারীও রয়েছে। আমি তাদের ঘন নিবিড় ছায়ার আশ্রয়দান করব।’

মুমিনরা নামাজের সংরক্ষণকারী : মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইবাদতের ও তাঁর সাথে গভীর সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম হলো সালাত। আর যারা মুমিন তারা আল্লাহ সিজদায় নিজেকে উৎসর্গ করে এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার গাফিলতা প্রদর্শন করে না। সূরা মুমিনুন ২ আয়াতে এরশাদ হয়েছে ‘তারা তাদের সালাতে বিনয় অবলম্বন করে’। একই সূরার ১০ আয়াতে বলা হয়েছে ‘যারা নিজেদের নামাজকে পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করে।’

আল্লাহর সীমা রক্ষাকারী ও তাঁর গোলামির জীবনযাপনকারী : দুনিয়ায় মহান আল্লাহর রুবুবিয়াত প্রতিষ্ঠা এবং তার নির্ধারিত পথে জীবনযাপনই মুমিনদের একমাত্র মিশন। এরশাদ হচ্ছে তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী, আল্লাহর গোলামির জীবনযাপনকারী, তাঁর প্রশংসা উচ্চারণকারী, তাঁর জমিনে পরিভ্রমণকারী, তাঁর সামনে রুকু ও সিজদায় অবনত, ন্যায়ের নির্দেশদানকারী, অন্যায়ের বাধাদানকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারক্ষাকারী, হে নবী তুমি এসব মুমিনদের সুসংবাদ দাও।’ (তাওবা-১১২)

মুমিনরা আল্লাহ-প্রদত্ত আমানতের রক্ষক : মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হালাল-হারামকে মুমিনদের কাছে আমানত রেখেছে। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: যা করতে বলেছেন তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিঃশর্তে গ্রহণ করবে, আর যা নিষেধ করেছেন তাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বর্জন করবে আর এটাই মুমিনের অনুসৃত একমাত্র নীতি। এ কারণেই মুমিনরাই আল্লাহ-প্রদত্ত আমানতের একমাত্র রক্ষক। এরশাদ হচ্ছে ‘যারা (অর্থাৎ মুমিনরা) আমানত ও ওয়াদা চুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ করে।’ (মুমিন-৮) সূরা আনফালের ২৭ আয়াতে বলা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের ওপর ন্যস্ত আমানতের খিয়ানত করো না। অথচ তোমরা এর গুরুত্ব জান।’

মুমিনরা কৃত ওয়াদার সংরক্ষণকারী : মুমিন তার কৃত ওয়াদা পালনে সার্বক্ষণিক তৎপর। ওয়াদার খেলাফ মুমিন চরিত্রে স্থান নেই। তাই মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সূরা মুমিনুনে মুমিনের চরিত্র বর্ণনায় বলেন, তারা আমানত ও ওয়াদা চুক্তির রক্ষণাবেক্ষণকারী (মুমিনুন ৮) আর ওয়াদার ব্যাপারে আল্লাহ পাকের সুস্পষ্ট নির্দেশ হলো হে ইমানদারগণ তোমরা চুক্তিগুলো পূরণ কর। (মায়িদাহ ১) সূরা নাহলের ৯১ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সে অঙ্গীকার পূর্ণকর এবং পাকাপাকি কসম করার পর তা ভঙ্গ কোরো না অথচ তোমরা আল্লাহকে জামিন করেছ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।’

মুমিন সব কাজে সবরের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনকারী : পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতিতে নিজের মন  মেজাজকে পরিবর্তন না করা বরং সর্বাবস্থায় এক সুস্থ যুক্তিসঙ্গত ন্যায় আচরণ করে চলাই সবর। সবর মুমিনের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যের একটি, এটি মুমিনের কাজকর্মকে মহান রবের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি পার্থিব জগৎ ও ইহজগতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করে। সবর সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা মাজারিজের ৫ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘অতএব সবর করো সবরে জামিল।

সূরা ইউনূসের ১০৯ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি কেবল তাই অনুসরণ করো, যা অহির মাধ্যমে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে, আর সবর অবলম্বন করতে থাক, যতক্ষণ না আল্লাহ চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেন।’ সবর মানুষকে চারিত্রিক মজবুতি দানের পাশাপাশি মানুষের কৃত গুনাহ মাফ করে তাকে পরিশুদ্ধ শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সা: এরশাদ করেন, ‘কোনো মুসলিম ব্যক্তি মানসিক বা শারীরিক কষ্ট পেলে, কোনো শোক বা দুঃখ পেলে অথবা চিন্তাগ্রস্ত হলে সে যদি সবর করে, তাহলে আল্লাহ প্রতিদানস্বরূপ তার সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। এমনকি যদি সামান্য একটি কাঁটাও পায়ে বিঁধে তাও তার গুনাহ মাফের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’ (বুখারি, মুসলিম)

মুমিন আল্লাহর কাছে বাইয়াতবদ্ধ : মুমিনরা আল্লাহর কাছে বাইয়াতি জনগোষ্ঠী। তারা জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে তাদের মাল এবং জানকে বিক্রি করে দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে খরিদ করে নিয়েছেন, এখন তাদের কাজ হবে তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে, সে সংগ্রামে তারা যেমন মারবে, তেমন মরবেও। (তাওবা ১১১)।

হজরত উমর রা: রাসূলে পাক সা: থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়াই মৃত্যুবরণ করল, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল। (মুসলিম)। সাহাবায়েকেরাম আল্লাহর রাসূল সা:-এর হাতে নিছক কতগুলো আমলের বাইয়াত গ্রহণ করেননি, তারা দ্বীনের সামগ্রিক বিষয়ে বাইয়াত গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে দিনার রা: বর্ণনা করেন, তিনি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা:-কে বলতে শুনেছেন, তিনি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করার অনুমতি দিয়েছেন। (মুসলিম)।

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, আমরা আল্লাহর রাসূল সা:-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছি শ্রবণ ও আনুগত্যের ব্যাপারে এবং এটা স্বাভাবিক অবস্থা, কঠিন অবস্থা আগ্রহ ও অনাগ্রহ সর্বাবস্থায়ই প্রযোজ্য। আমরা আরো বাইয়াত গ্রহণ করেছি যে, আমরা কোনো দায়িত্বশীলদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবো না এবং সর্বাবস্থায় সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকব। এ ব্যাপারে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করব না। নাসায়ী : রাবি হজরত উবাদা ইবনে সামিত রা: আলোচ্য হাদিসে রাসূল সা: এ বাইয়াতের মুখ্য বিষয় বর্ণনা করেছেন। আর মুমিন সর্বাবস্থায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার অতন্ত্র প্রহরীর মহান জিম্মাদারি পালনে নির্ভরযোগ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূলত মহান রবের কাছে বাইয়াতবদ্ধ হবে।

মুমিন বিনয়ী ও নম্র : বিনয় ও নম্রতা মুমিন চরিত্রের অন্যতম উত্তম ভূষণ, যার সর্বোত্তম নমুনা মানবতার মহান শিক্ষক নবী মহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম, যাদের বিনয়ী আচরণ গোটা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেয়। যারা বিনয়ী নম্র তারা আল্লাহর পরম বন্ধু আর আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। কালামে পাকে এরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের দ্বীন থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ আরো এমন লোক সৃষ্টি করবেন, যারা হবে আল্লাহর প্রিয় এবং আল্লাহ হবেন তাদের কাছে প্রিয়, যারা মুমিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। (সূরা মায়েদা ৫৪)। সূরা আশশুরার ২১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা তোমার অনুসরণ করে, সেসব বিশ্বাসীর প্রতি বিনয়ী হও।’ বিনয় নম্রতা মানুষকে আশরাফ তথা মর্যাদাবান করে।

মুমিন তাকওয়ার উজ্জ্বল নমুনা : মুমিন হলো তাকওয়ার জ্বলন্ত উজ্জ্বল নমুনা। তাকওয়ার মাধ্যমে মুমিন নিজেকে সম্মানিত করে রাহমানের বান্দাহর উপযোগিতা অর্জন করে। মহান আল্লাহ সোবাহনাহু তায়ালা সূরা হযরাতের ১৩ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, যিনি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং সব বিষয়ে অবহিত।

মুমিন আল্লাহর ওপর পূর্ণ তায়াক্কুলকারী : মুমিন তার জীবনের সামগ্রিক বিষয়ে একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে অভিভাবক মনে করে তাঁর ওপর তায়াক্কুল করে। হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার নাম আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল নয়। বরং মহান আল্লাহর দেয়া সব সুযোগ-সুবিধা ও উপায়-উপকরণ কাজে লাগিয়ে ফলাফলের জন্য তাঁর ওপর নির্ভর করা হচ্ছে সত্যিকার তায়াক্কুল। হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি বলল, হে রাসূল সা:, আমি উট বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, না বন্ধনমুক্ত রেখে? তিনি বললেন, উট বেঁধে নাও, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি)। পবিত্র কালামে পাকে এরশাদ হচ্ছে ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম রক্ষাকর্তা।’ (আল-ইমরান ১৭৩)। সূরা জুমারের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে রাসূল বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট, তায়াক্কুলকারীরাই তাঁর ওপর নির্ভর করে।’

সর্বোপরি কুরআন-সুন্নাহ বর্ণিত মুমিন জিন্দিগির সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জীবনযাপনের মাধ্যমে কিয়ামতের কঠিন বিপদের মুহূর্তে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে নিষ্কৃতিপ্রাপ্ত সফলকাম উম্মাহর গর্বিত সদস্য হওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি মহান মাবুদের দরবারে সার্বক্ষণিক এ পথে অনড় থাকার তৌফিক কামনা করতে হবে।

লেখক : মাওলানা আনোয়ার হোসেন ফারুকঅধ্যক্ষ, আল-হেদায়া ইসলামিয়া মহিলা মাদরাসা, লাকসাম