ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

যে তামাশায় নিভে যায় ঈমানের প্রদীপ

আমাদের সমাজে কত রকম মানুষ, কত রকম মুসলমান। কেউ নামাজ পড়ে, কেউ পড়ে না; কেউ ভালো কাজ করে, কেউ খারাপে লিপ্ত থাকে। এতসব কাজের মধ্যে যে কাজটি আজকাল অহরহ চোখে পড়ে, তা হচ্ছে ইসলাম বা মুসলমানদের কোনো বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা।

বন্ধুদের আড্ডায় আপনিও হয়তো শুনেছেন—ওই দেখ, হুজুরের কী সুন্দর ছাগলা দাড়ি! সবার সঙ্গে আপনিও হয়তো হেসে ফেললেন হো হো করে। আমাদের কিছু প্রবাদ বাক্যও এমন রয়েছে, যাতে সুস্পষ্টভাবে ইসলাম নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়েছে। কথায় কথায় কারও অক্ষমতা বোঝাতে ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ কথাটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি। কখনও ভেবে দেখেছেন, এ কথায় কাকে ঠাট্টা করা হলো—আল্লাহর ঘর মসজিদ নাকি মোল্লা-মৌলভী?

নবীযুগের ইসলামী শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদবী ‘খলিফা’ আজ ‘দর্জি’র উপনাম। অত্যন্ত সম্মানিত ২য় পদবী ‘কাজী’ আজ হয়েছে বিয়ে পড়ানো মুন্সীর উপাধি। আহা! কোটি মুসলমানের দেশে কী সূক্ষ্মভাবে অপমানিত হচ্ছে এককালের শক্তিধর দুটো উপাধি। আমাদের নাটক-সিনেমাগুলোতেও কখনও কখনও ইমাম বা হুজুর চরিত্র রূপায়ণ করানো হয় কোনো একটি খারাপ বা ঘৃণিত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে, সুকৌশলে দর্শকদের যা জন্ম দেয় বিরূপ ধারণা। ছলে-বলে বিভিন্ন কার্টুনেও হেয় করা হয় বোরকাবৃত নারীকে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কোনো বিষয় নিয়ে আকারে-ইঙ্গিতে তাচ্ছিল্য আজ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় যেন।

প্রিয় পাঠক, আল্লাহপাকের কাছে যে বিষয়গুলো অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং তিনি যেগুলোর কারণে বান্দার সব আমল বাতিল করে দেন, এসবের অন্যতম হচ্ছে—দ্বীন ইসলাম বা ইসলাম সম্পর্কিত কোনো বিষয় নিয়ে হাসি-তামাশা করা। শুধু কি আমল বাতিল হয়ে যাওয়া, বরং কোনো কোনো কথা ও ঠাট্টা তো আপনাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবে আপনার অজান্তে।

এজন্যই আলেমরা বলেন, নামাজ না পড়া কুফুরি নয়, কিন্তু নামাজ বা নামাজিদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কিংবা তামাশা করা কুফুরি। মুনাফেকদের প্রথম পরিচয় ছিল, তারা মুসলমানদের নিয়ে হাসি-তামাশা করত, তাদের বোকা ভাবত। আল্লাহপাক তাদের ধমক দিয়ে বলেছেন, ‘তারাই বোকা অথচ নিজেরা তা জানে না।’ (সূরা বাকারা-১৩)

ইমাম ইবনে কুদামাহ লিখেছেন, যে আল্লাহকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় গালি দিল, কিংবা যে আল্লাহ বা তাঁর রাসুল কিংবা দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করল, সে কাফের হয়ে গেল। (আল মুগনি) ইমাম নববী বলেন, স্বেচ্ছায় কিংবা কেউ যদি স্পষ্টভাবে এমন কোনো কথা বলে যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কোনো বিধানকে তুচ্ছ করে, তা অবশ্যই কুফুরি। ইমাম কুরতুবি লিখেছেন, মজা করার জন্য হোক বা সত্যি সত্যি হোক, ইসলামের কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে হাসি-তামাশা করা কুফুরি। এতে কারও দ্বিমত নেই। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, দ্বীনের যে কোনো স্পষ্ট বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করা কুফুরি। যে এমন করল তার ঈমান ধ্বংস হয়ে কুফুরিতে পরিণত হলো।

আর তাই কোনো একজন সাধারণ মানুষ, যে দাড়ি রেখে দ্বীনের ওপর চলতে সচেষ্ট, যে নারী বোরকায় নিজেকে আবৃত রেখে চলতে চান, তাকে যদি এ কারণে কেউ তুচ্ছ ভাবে কিংবা অন্য দৃষ্টিতে দেখে, তবে নিশ্চয়ই বিষয়টি গিয়ে দ্বীনের সীমারেখা পর্যন্ত পৌঁছে, যা অত্যন্ত ভয়ানক বিষয়। অনেক নামাজি মানুষ কিংবা দাড়িওয়ালা সাধু হয়তো অপকর্মে লিপ্ত, তাই বলে তো আর তার ধর্মকে গালমন্দ করা বৈধ হয়ে যায় না, এটি তার স্বভাবের দোষ, তার নামাজ কিংবা আমলের এতে কী?

অহরহ পথে-ঘাটে এসব বিষয় নিয়ে ‘মশকরা’ করে মানুষ নিজের অজান্তেই তার দ্বীন থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যায়, সামান্য ‘বিদ্রূপে’ শেষ হয়ে যায় তার এতদিনের সব নেক আমল। তাই আজ থেকে সব বিষয় নিয়ে হাসি-তামাশা নয়, ইসলাম এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য নয়, সামান্য একটু হাসির জন্য নিজের সব ঈমান-আমল বিকিয়ে দেয়া কোনো সচেতন বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আসুন, নিজেরাও বেঁচে থাকি, অন্যকেও বাঁচিয়ে রাখি।

লেখক : তামীম রায়হান