ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

যৌতুক নির্মূলে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তা

মানব জাতি হচ্ছে আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি এবং বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর উম্মতরা হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম উম্মত। প্রত্যেক ইমানদার মানুষ একথা বিশ্বাস করেন যে, হাশরের কঠিন প্রান্তরে সৃষ্টিজগতের সষ্টা মহান আল্লাহপাকের সম্মুখে প্রত্যেক প্রাণীকে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে এবং ভয়ানক ওইদিনে বিশ্বনবীর সুপারিশ ব্যতীত মুক্তিলাভের কোনো উপায় নেই।

ইসলামে জন্ম থেকে কবরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কাজের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়া আছে যেগুলো অনুসরণ করলে প্রতিটি কাজে অসংখ্য নেকি পাওয়া যায়, অপব্যয় করার পাপের সম্ভাবনা থাকে না এবং সামাজিক সমস্যা সৃষ্টিরও সম্ভাবনা থাকে না। বিবাহ হচ্ছে নবীজীর সুন্নত এবং নবীজী বলেন, ‘যে আমার সুন্নতকে প্রত্যাখ্যান করবে সে আমার উন্মত নয়।’ মোহর ছাড়া বিবাহ হতে পারে না এবং ওই মোহর স্ত্রীদের প্রাপ্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মুসলমান পুরুষ যখন মোহরের টাকা অথবা অলঙ্কার প্রদানে অসমর্থ বলে সময়মতো বিয়ে করতে পারছেন না, সেখানে আমাদের দেশে প্রচলিত বাকি মোহর সিস্টেমে খেয়ালখুশিমতো বিশাল পরিমাণ মোহর কাবিনের কাগজে লিখে প্রতিদিন বিয়ে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তালাক হয়ে গেলে বাকি মোহর আদায়ের জন্য আদালতের দরজায় জীবনের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হচ্ছে।

ইদানিং অন্যধর্মী সমাজের অনুকরণে মুসলিম সমাজেও হারাম যৌতুক প্রথার ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বিবাহে অপ্রয়োজনীয় খরচের বহর বেড়েছে বহুগুণ। ইসলাম বলেছে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই এবং শয়তান অভিশপ্ত। অনাড়ম্বরভাবে সম্পন্ন বিবাহকে আল্লাহপাক ভালোবাসেন। আজকাল বিবাহের কথাবার্তায় স্ত্রীলোকের মোহরানার কথা বাদ দিয়ে বরের মোটর সাইকেল, গাড়ি এবং নগদ টাকার দাবি নিয়ে নির্লজ্জভাবে কথা বলছে।

এক মুসলমান আরো এক কন্যাদায়গ্রস্ত মুসলমান ভাইকে বিপদগ্রস্ত করতে লজ্জাবোধ করছে না। আগে যেখানে মোহরানা নির্ধারণের পর পাত্রপক্ষ পাত্রীপক্ষকে এবং পাত্রীপক্ষ পাত্রপক্ষকে সাধ্যমতো দান-মান করার দায়িত্ব সমঝে নিত, আজকাল ঘটকেরা কমিশনের বিনিময়ে প্রকাশ্যে দরদাম করছে। পাত্র যদি নামমাত্র চাকরিজীবী অথবা ব্যবসায়ী হয়, তবে সে নিজে নতুবা তার মা-বাবা সম্ভাব্য পাত্রীর মা-বাবাকে যৌতুকের নামে নাজেহাল করে ছাড়ে। অনেক উপার্জনশীল পাত্রের বাবা পুত্রের বিবাহের যৌতুকস্বরূপ পাত্রীর মা-বাবার কাছ থেকে বাংলাদেশের কুরবানির বাজারে বিশাল সাইজের বলদের মালিকের মতো আকাশচুম্বী মূল্য দাবি করছে।

আজকাল কন্যাদায়গ্রস্ত মুসলিম পরিবারগুলোতে যৌতুকের মোটর সাইকেল/ গাড়ির ভূতের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। অত্যন্ত যত্ন এবং আদরের সঙ্গে বহু অর্থ খরচ করে লালন-পালন করার পর বিবাহের বয়সে উপনীত হওয়ার পর পাত্রীর সৌন্দর্য, শিক্ষাদীক্ষা, বংশমর্যাদা কিংবা দ্বীনদারীকে প্রাধান্য না দিয়ে লোভী শয়তানরা নগদ টাকা এবং বহুমূল্য জিনিসপত্র দাবি করে পাত্রীর অভিভাবকদের রাতের ঘুম হারাম করে ছাড়ছে। একাধিক মেয়ে থাকা পরিবার প্রথম মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে আকণ্ঠ ঋণে ডুবে যাচ্ছে অথচ ইসলামী নিয়মানুসারে বিয়ে হলে দশ মেয়ের বাবাকেও চিন্তায় চুল ছিঁড়তে হতো না।

মুসলিম সমাজের কলঙ্ক, মেরুদণ্ডহীন, নির্লজ্জ একশ্রেণীর যুবকের মাথায় হেরোইনের নেশার মতো মোটর সাইকেলের নেশা চেপেছে। কেবল মোটর সাইকেলের জন্য অন্তিম পর্যায়ে অনেক বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক পয়সাওয়ালা লোক বেছে বেছে ধনী লোকদেরকে দাওয়াত দিয়ে হোটেলে বিয়ের পার্টি দিচ্ছে। বিশ্বনবী (স.) বলেছেন, ‘যে ওয়ালিমায় শুধু ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয় কিন্তু গরিব-ফকিরদের দাওয়াত দেয়া হয় না, সে ওয়ালিমা সবচেয়ে নিকৃষ্ট।’

মুসলিম সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যুবক সমাজ এবং সম্মানিত আলেম সমাজকে নিতে হবে। ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সাংবাদিক বন্ধুরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখুন। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে, প্রতিটি মহল্লায় মসজিদে শুক্রবার জুমআর খুত্বায় ঈদের দিনে ঈদগাহ’র বিশাল জনসমাবেশে, ওয়াজের মাহফিলে আলোচনা করুন।

বিশ্বনবী নিজের কলিজার টুকরোসম কন্যা হযরত ফাতেমাকে (রা.) যিনি বেহেশতে সমস্ত নারীদের প্রধান হবেন, তার অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে বিবাহ দিয়েছেন। আজ যারা নিজের বিয়েতে নির্লজ্জের মতো যৌতুক দাবী করেছে, নিজের মেয়ের বিয়েতে মোটর সাইকেল দেয়ার মতো সামর্থ্য ভবিষ্যতে থাকবে বলে গ্যারান্টি দিতে পারবে কি? নিজের বৈধ উপার্জন থেকে ক্রয় করা মোটর সাইকেলে চেপে স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বুঝুন সম্মান বলতে কি বোঝায়? আইনের মাধ্যমে যৌতুক প্রথা নির্মূল অসম্ভব। আজকাল পত্র-পত্রিকায় যৌতুকের বলি মুসলিম রমণীদের ফটোসহ মৃত্যু সংবাদ দেখেও আমাদের অন্তর আল্লাহর আজাবের ভয়ে প্রকম্পিত হয় না। হাশরের ময়দানে বিচারের আগে কবরের কথা একবার চিন্তা করুন।

লেখক: আফতাব চৌধুরী