ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

রমজানের শেষ দশকের ইবাদত ইতেকাফ

ফেরেশতাসুলভ গুণাবলি ও মহান রাব্বুল আলামিনের বিশেষ রহমত লাভের যোগ্যতা অর্জনের মাস রমজানুল মোবারকের আজ ১৯ তারিখ। আর মাত্র একদিন পর থেকে রমজানের শেষ দশক শুরু হবে। ২০ রমজানের পর থেকে এ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত একটি বিশেষ ইবাদত রয়েছে। দিনের ২৪ ঘণ্টাই মসজিদে অবস্থান ও ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর এই ইবাদতটির নাম ইতেকাফ।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করতেন। তার ইন্তেকালের পরে উম্মাহাতুল মুমিনিন এ আমল অব্যাহত রাখেন বলে তিরমিজি শরিফে হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন। ইতেকাফের ফজিলত সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ইতেকাফকারী সব ধরনের গোনাহর কাজ থেকে বিরত থাকেন এবং তার নামে লেখা হয় সব নেক কাজ সম্পাদনকারীর মতো ছওয়াব। অর্থাৎ ইতেকাফ না করলে তার পে যেসব নেক কাজের সুযোগ ছিল, এখন সেগুলো করতে না পারলেও তাকে সওয়াব দেয়া হবে।

তিন ধরনের ইতেকাফ রয়েছে ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল। মান্নতের কারণে ইতেকাফ ওয়াজিব হয়। সেটার পরিমাণ কমপে ২৪ ঘণ্টা হতে হয় এবং ইতেকাফের মান্নতের সাথে রোজা রাখাও ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই যে ক’দিন ইতেকাফের মান্নত করবে, সে ক’দিন রোজার সাথেই ইতেকাফ করতে হবে।

সুন্নাত ইতেকাফ হয় রমজানের শেষ দশকে। রমজানের ২০ তারিখের সূর্যাস্তের আগ থেকে তা শুরু করতে হয়। আর তা শেষ হয় রমজান শেষ হলে। অর্থাৎ ২৯ রমজান চাঁদ দেখা গেলে বা ৩০ তারিখ পূর্ণ হলে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু প্রতি বছর রমজানের শেষ দশক অবশ্যই ইতেকাফে অতিবাহিত করতেন এবং এক বছর তা ভঙ্গ করার কারণে পরের বছর ২০ দিন ইতেকাফ করেছিলেন। এ জন্য প্রতিটি মসজিদে ইতেকাফ করা সন্নাতে মুয়াক্কাদা ‘আলাল কিফায়াহ’। অর্থাৎ কমপ একজন মুসল্লির ইতেকাফ দ্বারাই মহল্লার সবাই দায়মুক্ত হবেন। পান্তরে কেউ ইতেকাফ না করলে ওই মসজিদের আওতাধীন সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে।

নফল ইতেকাফের সময়সীমা নির্ধারিত নেই। আধা দিন এমনকি কয়েক ঘণ্টার জন্যও নফল ইতেকাফ হতে পারে। সে কারণে ওয়াজিব ও সুন্নাত ইতিকাফের ব্যাপারে রোজা শর্ত হলেও নফল ইতিকাফের ব্যাপারে রোজা শর্ত নয়। ইসলামে বৈরাগ্য নেই, মহানবী সা: তা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। আসলে কোনো নবীর শরিয়তেই বৈরাগ্যের বিধান ছিল না। তবে হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের অবর্তমানে তার কিছু নিষ্ঠাবান অনুসারী সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশে নিজেদের ঈমান ও ইবাদত হিফাজত করতে পারবেন না আশঙ্কা করে বৈরাগ্যের পথ বেছে নিয়ে ছিলেন।

কিন্তু যেহেতু তা ছিল মানব জীবনের জন্য অস্বাভাবিক, তাই তাদের পে এ রীতি রা করা সহজ ছিল না। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদের সূরা হাদিদে ইরশাদ হয়েছে : আর তারা আবিষ্কার করেছিল বৈরাগ্য। আমি তাদের জন্য তা আবশ্যক করিনি। কিন্তু তারা তা যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারেনি। আখেরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, পারিবারিক ও সামষ্টিক জীবনের কাঠামো বজায় রেখেই মানুষকে আখেরাতের কাজ করতে হবে। কিন্তু এই স্থায়ী বৈরাগ্য অনুমোদিত না হলেও সাময়িকভাবে নিজের পরিবার ও বৈষয়িক কাজকর্ম থেকে বিমুখ থেকে পুরো সময় সালাত, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদিতে কাটানোর ব্যবস্থা এই শরিয়তে আছে। ইতেকাফ সেই সাময়িক বৈরাগ্য।

রমজানের শেষ ১০ দিন পার্থিব সব কাজকর্ম থেকে মুক্ত থেকে মসজিদে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করা এই উম্মতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। এটা দুনিয়ার প্রতি আসক্তি কমাতে এবং আখেরাতের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে অত্যন্ত সহায়ক। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সা: এ ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। শুধু মসজিদে অবস্থান এবং ফরজ নামাজগুলো, যা প্রতিদিনের স্বাভাবিক আমল তা করলেও ইতেকাফের হুকুম পালন হয়ে যায়। কিন্তু উত্তম এই যে, ন্যূনতম সময় বিশ্রাম ও নিদ্রায় কাটিয়ে বাকি পুরো সময় নফল নামাজ, কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত ও জিকির-তাসবিহ পাঠে কাটানোর চেষ্টা করতে হবে।

সাময়িক বৈরাগ্যের অনুশীলন ইতেকাফের প্রথম তাৎপর্য। দ্বিতীয়ত, রমজানের প্রথম দিন থেকে রোজা পালন করতে করতে যখন ২০টি দিন হয়ে যায় তখন রোজা রাখা অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়। আর কোনো আমল যখন অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার প্রভাব কমতে থাকে, সে দিকে ল থাকে কম। তাই রমজানের সিয়াম সাধনা যেন অভ্যাসগত কাজের অন্তর্ভুক্ত না হয়, বরং বিশেষ গুরুত্ব ও মনোযোগের বিষয় থাকে, সে জন্য সিয়াম সাধনার মাসের শেষ দিনগুলো একান্তভাবে সিয়াম ও সালাতের জন্য বরাদ্দ রাখার একটি নিয়ম এই ইতেকাফ।

ইতেকাফের তাৎপর্য আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। তা এই যে, পানাহার,কামাচার ও পাপাচার থেকে নিজেকে বিরত রাখার ধারাবাহিকতা বান্দার মধ্যে সৃষ্টি করে খোদা প্রেমের বিশেষ প্রেরণা। আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মোতাবেক নিজের দৈহিক চাহিদা ও আচরণ সংযত রাখার ফলে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনে বান্দা অনেক উন্নতি লাভ করে। নশ্বর পৃথিবীর আকর্ষণ দুর্বল হতে থাকে, পরজগতের চিন্তা প্রবল হতে থাকে, আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের জন্য তার মধ্যে ব্যাকুলতা বাড়তে থাকে। তারই অভিব্যক্তি ঘটানো হয় সংসার ও বৈষয়িক জীবন থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ঘরে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থানের মধ্য দিয়ে।

আল্লাহ তায়ালার প্রতি বান্দার অনুরাগ ও প্রেমের পরাকাষ্ঠা ঘটে বায়তুল্লাহর হজের মাধ্যমে। আর রমজান মাসের পরেই শুরু হয় হজের মওসুম। ইতেকাফের মাধ্যমে বায়তুল্লাহর হজের প্রস্তুতি শুরু করেন আল্লাহর প্রিয় বান্দারা। অতএব ইতেকাফ আল্লাহপ্রেম ও আখেরাতমুখিতার উজ্জ্বল নমুনা।

লেখক ঃ লিয়াকত আলী