ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

শরিয়াহ আইনের গুরুত্ব

আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন ‘যে আমার নিকট থেকে অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী হুকুম (ব্যক্তিগত কার্যাবলি, ফায়সালা, বিচার) পরিচালনা করে না সে কাফের।’ (সূরা মায়িদা, আয়াত-৪৪)। মুসিলম শিশু জন্মের পর আজান, ইকামত, নাম রাখা, বিয়ে, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কিছু ক্ষেত্র ছাড়া সম্পদ বণ্টনে, দাফন-কাফন ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: কর্তৃক প্রদত্ত জীবনবিধান তথা শরিয়াহ আইন মানা হয়।

কিন্তু জীবনের অন্যান্য বৃহত্তর পরিসরে আল্লাহর দেয়া বিধান মানার সুযোগ হচ্ছে না। কোনো মুসলিম যদি বলেÑ আমি কুরআনের সব আয়াত ও হুকুম মানি, কিন্তু একটি আয়াত ও হুকুম অস্বীকার করি তবে সে ঈমানদার থাকবে না। তাহলে সব ক্ষেত্রে কুরআনের বিধান মানতে না পারা ঈমানের বড় ধরনের ক্ষতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হতে পারে শরিয়তের ফৌজদারি ও দেওয়ানি দণ্ডবিধি কার্যকর করার দায়িত্ব কার? এর জবাবে একটি উদাহরণ দিচ্ছিÑ ধরা যাক কয়েকজন অ্যাডভোকেট একটি স্থানে বসে আছেন; এমন সময় এক লোক এসে বিনা উসকানিতে, বিনা অপরাধে একজনকে হত্যা করে ফেলল।

উকিলগণ যেহেতু আইন জানেন তারা বুঝতে পারলেন লোকটির নিশ্চিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তাই তারা লোকটিকে ধরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেন এবং থানায় মোবাইল করে জানিয়ে দিলেন গাড়ির তেল খরচ করে এসে কোর্টে অনেক কষ্ট করে লোকটিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর হাত থেকে আমরা আপনাদের বাঁচিয়ে দিলাম। অ্যাডভোকেটরা বাস্তবে তা করার অধিকার রাখেন না। যদি করেন তবে দোষী হবেন। কারণ আইন প্রয়োগের অধিকার রাষ্ট্রের, কোনো ব্যক্তির নয়। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেনÑ ‘কোনো (অবিবাহিত) নারী বা নর যদি জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের প্রত্যেককে এক শ’ বেত্রাঘাত করো।’

এ বেত্রাঘাত কে করবে? মসজিদের ইমাম? নাকি সমাজের মাতবর? রাসূল সা:-এর রাষ্ট্রব্যবস্থায় আবু বকর, উমর, ওসমান ও আলী রা: এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশে বাদশা আলমগীরের সময়সহ বিভিন্ন সময় যখন শরিয়াহ আইন ছিল তখন এ শাস্তি কে দিতেন? উত্তরে বলা হবে রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক (কাজী)। বর্তমানে রাষ্ট্রের শরিয়াহ আইন না থাকায় কুরআনের বহু দণ্ডবিধি কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই। বরং এর বিপরীত আইন চালু আছে, যেমন কুরআনের বিধান জিনা-ব্যভিচার হারাম, কিন্তু প্রচলিত আইনে কোনো নারী যদি কোর্টে এফিডেভিট করে পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে পতিতাপল্লীতে ঘর ভাড়া নিয়ে ব্যভিচারের দোকান খুলে বসে; কারো জন্য এর বিরোধিতা করা অবৈধ, পতিতার কাজ বৈধ বলে গণ্য।

কুরআনে সুদ হারাম। প্রচলিত আইনে যদি কেউ আবেদন করে সুদভিত্তিক মাল্টিপারপাস, ইন্স্যুরেন্স, ব্যাংক খোলার লাইসেন্স পায়; কারো জন্য এর বিরোধিতা করা অবৈধ, সুদি কারবারটি বৈধ। কুরআনে মদপান হারাম। প্রচলিত আইনে লাইসেন্স নিয়ে মদের ব্যবসা করা হচ্ছে। এমন বহু বিষয় রয়েছে শরিয়াহ যাকে হারাম বা অবৈধ ঘোষণা করেছে, প্রচলিত আইনে তা বৈধ হওয়ায় প্রতিটি মুসলিম তাতে বাধ্য হয়ে লিপ্ত হচ্ছে। অথচ আল্লাহ পাক বলেছেন‘কোনো মুসলিম নরনারীর জন্য এ সুযোগ নেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে বিধান দিয়েছেন তার বিপরীত করা। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে সে পথভ্রষ্ট।’ (সূরা আহজাব, আয়াত-৩৬)।

আল্লাহ আরো বলেন ‘আপনি কি ওইসব লোককে দেখেন না যারা মনে করে তারা ঈমানদার, কিন্তু তারা হুকুম পরিচালনা করে তাগুতের (মানব রচিত মনগড়া আইনের) অথচ তা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছে। শয়তান চায় তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে।’ (সূরা নিসা, আয়াত-৬০)।

রাসূল সা: বলেছেন ‘যে ব্যক্তি জাহিলিয়াতের (মানবরচিত আইনকানুনের) দিকে মানুষকে আহ্বান করে সে জাহান্নামের আওতায় মধ্যে যদিও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে ও নিজেকে মুসিলম মনে করে।’ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে শরিয়াহ আইন পরিপূর্ণভাবে পালন করা যাচ্ছে না তা দুর্ভাগ্যজনক। প্রশ্ন হতে পারে তাহলে অমুসলিম অন্য ধর্মাবলম্বীদের কী হবে? উত্তর হলো ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষ। প্রত্যেককে যার যার ধর্ম পরিপূর্ণভাবে পালন করার স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে। জোর করে কাউকে মুসলিম বানানো বা আইন করে কারো ধর্মীয় বিধান পালনে বাধাদান ইসলামসম্মত নয়।

উদাহরণস্বরূপ ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি এক শ’ বেত্রাঘাত। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন তা করতে বাধা দিচ্ছে। এর নাম ধর্মনিরপেক্ষ নয়, বরং ইসলামে যে ধর্মনিরপেক্ষতা সেটা হলো আইন এমনভাবে প্রণয়ন হবে যাতে সব ধর্মের অনুসারীদের জন্য তাদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দণ্ড দেয়া হবে। এতে করে সবার নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান পরিপূর্ণভাবে পালন হবে। ইসলামি জ্ঞানসম্পন্ন একজন মুসলিম এ বিষয়ের গুরুত্ব বোঝেন। এ কারণে আন্তর্জাতিক ইসলামবিরোধী শক্তি মুসলমানদের ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক পথের পরিবর্তে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় রাজনৈতিক দলগুলো এ জন্য কম দায়ী নয়। তারা নিজেরা যদি শরিয়াহ আইন তথা সব ধর্মের সব আইন পালনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় এমন আইন প্রণয়নের ঘোষণা দিত, তবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উত্থানের সুযোগই থাকত না। বিশ্বের অনেক দেশের অঞ্চল ভিত্তিক বা জাতি ভিত্তিক শরিয়াহ আইন চালু আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পরিপূর্ণ ইসলামি বিধান পালনের সুযোগ দান প্রয়োজন।