ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

শহীদী মৃত্যুর ধারণা ও মর্যাদা

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুবরণ করতে হয়’ (সূরা আলে ইমরান : ১৮৫)। তবে প্রত্যেক মৃত্যুই মর্যাদাসম্পন্ন নয়। মানুষের মধ্যে এমন কিছু মৃত্যু রয়েছে যা প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত। আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।’ এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, শুধু মানুষ হয়ে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে মুসলিম হয়ে মৃত্যুবরণ করা গৌরবের। আবার মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে অর্থবহ, তাৎপর্যমণ্ডিত ও গৌরবের মৃত্যু হচ্ছে শহীদী মৃত্যু। এই দুই প্রকারের মৃত্যু ছাড়া বাকি সব মানুষের মৃত্যুই কাক-পক্ষীর মৃত্যুর মতোই মর্যাদাহীন।

মৃত্যু মানবজীবনের একমাত্র পরিসমাপ্তি নয়, প্রত্যাগমন মাত্র। আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে কিছু দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়ে থাকে। কেউ সে দায়িত্ব যথাযথ পালন করেন আবার কেউ পালন করেন না। যারা যথাযথ দায়িত্ব পালন শেষে অত্যধিক মর্যাদার সাথে প্রত্যাগমন করেন, তাদের এরূপ প্রত্যাগমন করাকেই শহীদী মৃত্যু বলা হয়। কেননা শহীদী মৃত্যুর জন্য যে আত্মত্যাগ, ধৈর্য, মনোবল ও আল্লাহভীতি দরকার হয় তা সব মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।

প্রত্যক্ষ জিহাদের মাঠে এ মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেশি হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন-‘যারা আমার উদ্দেশে সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব; আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সাথে থাকেন’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯)। সে জন্যই শহীদী মৃত্যু এত বেশি মর্যাদার দাবি রাখে।

‘শহীদ’ আরবি ভাষার শব্দ। এ শব্দটি গোড়ার দিকে অর্থাৎ কুরআন নাজিলের আগ পর্যন্ত ‘শোহাদা’ হিসেবে সাক্ষ্যদাতা অর্থে আরবি ভাষায় ব্যবহৃত হতো। কুরআন নাজিলের পর শব্দটি ব্যাপকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন হয়ে ওঠে এবং এটি একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মৃত্যু, যার দাফনও সম্পন্ন হয়ে থাকে বিশেষ পরিপন্থার মধ্য দিয়ে। এ শব্দের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ,পরিধি-সীমানা, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য কেবল আল্লাহই নির্ণয় করেছেন।

কে, কিভাবে মৃত্যুবরণ করলে শহীদ হয় এবং মৃত্যুর পর সে কিভাবে কতটুকু মর্যাদা ভোগ করবে সেটাও বলে দেয়া হয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে। কাজেই শহীদের মর্যাদা পেতে হলে প্রথমে তাকে আল্লাহ, নবী-রাসূল, বেহেশত-দোজখ, ফেরেশতা, পুলসিরাত, আসমানি কিতাব, কিয়ামত ইত্যাদির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে পরিপূর্ণ মুসলিম হতে হবে। কেননা ‘শহীদ’ এর ধারণাটি দুনিয়ার কোনো সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, আইনস্টাইন, লেলিন, কার্ল মার্কস, মাও সেতুং রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী কিংবা বিশেষ গুণসম্পন্ন বছরের শ্রেষ্ঠ কোনো বাঙালির কাছ থেকেও আসেনি। এটি এসেছে স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন ‘আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয় তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে কোরো না বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।’ সূরা মুহাম্মদের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয় আল্লাহ কখনোই তাদের কর্ম বিনষ্ট করেন না।’ আবার সূরা আলে ইমরানের ১৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘এভাবে আল্লাহ জানতে চান কারা ঈমানদার আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান। আল্লাহ অত্যাচারীকে ভালোবাসেন না।’

ইতিহাসের তথ্যানুযায়ী ‘শহীদ’ শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে বদর ও ওহুদসহ হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবদ্দশায় বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে। বুখারি শরিফের একটি হাদিসে এসেছে- নবী করিম সা: বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে যে শহীদ হলো সে জান্নাতে গেল’। ওমর রা: নবীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের শহীদ হলো জান্নাতি আর তাদের নিহতরা কি জাহান্নামি নয়?’ রাসূল সা: বললেন- ‘হ্যাঁ’। এ হাদিসের ব্যাখ্যানুযায়ী কোনো নাস্তিক-মুরতাদ, মুশরিকের সাথে ‘শহীদ’-এর কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনাকে নাকচ করা হয়েছে। শহীদদের উদ্দেশে নির্মিত কোনো স্মৃতিচিহ্ন, স্মারক, স্তম্ভ কিংবা মিনারের সাথেও ‘মুসলিম শহীদদের’ কোনো প্রকার সম্পকের্র ধারণা ইসলামী শরিয়া অনুমোদন করে না। অর্থাৎ যে অর্থে শহীদস্মৃতি স্মারক, স্তম্ভ ও মিনারগুলো তৈরি করা হয়, সে অর্থেই এসব স্মারক ও স্মৃতিচিহ্নের ব্যবহারের অনুমোদন ইসলামে পাওয়া যায় না।

‘শহীদ’ শব্দটি একমাত্র কুরআন ও ইসলামের শব্দ। ইচ্ছে করলেই যে কেউ এর মর্যাদা ও সম্মান ভোগ করতে পারে না। এর সম্মান ভোগ করতে হলে বিশেষভাবে যোগ্যতা অর্জন করা বাধ্যতামূলক। আর সে যোগ্যতা হচ্ছে, আল্লাহর একত্ববাদ ও আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করা। তাই যদি হয়, তাহলে ভেবে দেখা যেতে পারে যে, যারা ইসলামের কুৎসা রচনায় নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত রাখে; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চরিত্র নিয়ে যে মশকারা করে এবং শেষ পর্যন্ত সেটার ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে মৃত্যুবরণ করে; তাকে আবার ইসলাম প্রদত্ত শহীদের মর্যাদায় ভূষিত করা যায় কি না? না গেলেও হয়তো আমরা তা-ই করে থাকি।

কী বিচিত্র আমাদের ইসলাম সম্পর্কে ধারণা। যারা ফেসবুকে, ব্লগে, পত্রপত্রিকায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চরিত্রকে তাচ্ছিল্যার্থে নিয়ে মন্তব্য প্রকাশ করে; তাদেরকে এক শ্রেণীর তথাকথিত মুসলিম পণ্ডিতেরা ফতুয়া দিয়ে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কী অশুভ দৌরাত্ম্য। এভাবে ইসলামী বিধিবিধান নিয়ে তামাশা করা, আর যাকে-তাকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করে ইসলামী মূল্যবোধকে বিকৃত করা ইসলামী বিধান অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য মারাত্মক অপরাধ, তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।

এ কথা না বললেই নয়, বাংলাদেশের সমাজে যে মানুষ সারা জীবন ইসলামের বিরুদ্ধাচারণ করে মৃত্যুবরণ করে তাকে শহীদের নেমপ্লেট দেয়া হয়। যে মানুষ ইসলামী সংবিধান পরিপন্থী কাজ করতে পেরে গর্বের সাথে মৃত্যুবরণ করে, তাকে বলা হয় শহীদ; আর যে মা সারা জীবন ধরে ইসলামের বারোটা বাজিয়ে পরপারে চলে যায় এবং মৃত্যুর পরের জীবনকেই যে বিশ্বাস করে না, তাকে বলা হয় শহীদজননী। আবার যে স্থাপনার কোনো স্বীকৃতি ইসলামে নেই; সেই স্থাপনাতে ফুল দিয়ে পূজা করে শহীদদের উদ্দেশে দোয়া করার কথা বলা হয়; হাস্যকর এসবই ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এভাবেই একজনের টাইটেল আর একজন নির্লজ্জের মতো যে শুধু ব্যবহার করছে তা-ই নয়, এতে করে সমাজে শহীদ সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্তধারণা বৃদ্ধিতেও সাহায্য করছে।

সেই সাথে, একদল লোক আরো একটি ভ্রান্তধারণা সমাজে ছড়াচ্ছে, ইসলামে রাজনীতি বলতে কিছু নেই। ইসলামে যদি রাজনীতি না-ই থাকবে; তাহলে হজরত মুহাম্মদ সা: কী দিয়ে মদিনা রাষ্ট্র শাসন করেছিলেন? কী দিয়ে হজরত আবু বকর, ওমর রা: গোটা পৃথিবী শাসন করেছিলেন? মানুষকে এভাবে ধোঁকা না দেয়াই ভালো। ইসলাম চায় খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতায়, ধোঁকা, রাহাজানি, সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতি মুক্ত একটি সুস্থ সমাজব্যবস্থা। যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা একমাত্র ইসলামী রাজনীতি দ্বারাই সম্ভব। 

ইসলামের আবির্ভাবও হয়েছে সেই লক্ষ্যে। ইসলাম মানবতাবিরোধী কোনো ধর্ম নয়, একমাত্র ইসলামেই মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত। গণতান্ত্রিক রাজনীতি বলতে যা বোঝায় সে রকমই একটা পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক জীবনাদর্শন হলো ইসলাম। পবিত্র কুরআন শুধু মুসলমানদের নয়, সমগ্র রাষ্ট্রের ও সমগ্র মানব সমাজের সংবিধান। আর সেই সংবিধান দিয়েই অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছিলেন আমিরুল মোমেনিন হজরত ওমর রা:। খোলাফায়ে রাশেদিন। তৈরি হয়েছিল গোটা বিশ্বে মানবাধিকারের প্রথম দলিল মদিনার সনদ; শান্তির প্রতীক হিলফুল ফুজুল।

রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় দেশ পরিচালনা; সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা, তাহলে সে রাজনীতিতে গোটা কুরআন শরিফ ভরা। গোটা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এর চেয়ে মডার্ন পলিসি আর একটিও নেই। অতএব ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো, আল্লাহর কালামকে বিকৃত করারই নামান্তর। এই বিভ্রান্তি থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষা করাও মুসলমানদের ঈমানি দায়িত্ব। যাকে-তাকে শহীদের টাইটেল দেয়া, উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর মতো। এসব অপপ্রচারকে পরিকল্পিতভাবে অবরোধ করা জরুরি।

আল্লাহ বলেন- ‘বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৮১)। কাজেই সত্যের বিজয় অবশম্ভাবী।