ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

শান্তি প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক লেনদেনের গুরুত্ব

ইসলাম শান্তির ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও কিছুসংখ্যক বিপথগামী মানুষ ইসলামকে অশান্তির ধর্ম হিসেবে মনে করে এবং প্রচার প্রপাগান্ডা চালায়। এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আছে মূর্খ। কিছুসংখ্যক মোনাফিক। কিছুসংখ্যক সরাসরি ইসলামবিরোধী। ইসলাম কঠিন কিছু নয়। সত্য, সহজ-সরল পথই হলো ইসলাম। ইসলামে মানুষের প্রয়োজনীয় সব কিছুরই সঠিক পথনির্দেশ আছে।

অর্থনীতির বাস্তব শিক্ষা ইসলামে রয়েছে। যে শিক্ষা লাভ করলে মানুষের মধ্যে হতাশা উপস্থিত থাকতে পারে না। বর্তমান এই একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর মানুষ চরম পর্যায়ে হতাশায় ভুগছে। যে ব্যক্তির কাছে যত বেশি অর্থ আছে সে তত হতাশা এবং অস্থিরতায় ভুগছে। তুমুল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। এসব প্রতিযোগিতা যারা করছে তারা পবিত্র কুরআন থেকে বাস্তব শিক্ষা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা অর্থনীতিসহ প্রায় সব শিক্ষাই অর্জন করেছেন অনৈসলামিক কিছু বইপুস্তক থেকে।

যেসব বইপুস্তকে আছে কিভাবে অন্য মানুষকে ঠকিয়ে নিজে ত্বরিত অধিক সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব। ফলে মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ছে। এমনকি বনের জানোয়ার, সমুদ্রের প্রাণিকুলও ভালো নেই। বাস্তবে সাদা পাঞ্জাবি, টুপিসহ ইসলামি শালীনতার পোশাকের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু এদের বেশির ভাগের মধ্যে ইসলামি অর্থনীতির শিক্ষা নেই। যার কারণে তারা হাজারো মানুষের হক নষ্ট করে চলেছে। জাকাত দিচ্ছে না। ইসলামে নিষিদ্ধ সুদকে ছাড়তে পারছে না।

কিছুসংখ্যক শিক্ষিত কল্যাণকামী ব্যক্তি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও ইসলামকে প্রকৃতভাবে না জানা ব্যক্তিরা মূর্খের মতো তার বিরোধিতা করেই চলেছে। এসব বিষয় নিয়ে সারা বিশ্বে এখন চরম অশান্তি বিরাজ করছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা এই যে সুদ দাও, এ আশায় যে, এর ফলে লোকদের ধন সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। জেনে রাখো, আল্লাহর কাছে এটা কখনোই বৃদ্ধি পায় না। ক্রমবৃদ্ধি তো কেবল সেই ধনসম্পত্তিতেই হয়ে থাকে, যা তোমরা আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে জাকাত বাবদ দিয়ে থাকো।’ সূরা আর রুম : ৩৯।

বর্তমান বিশ্বে সুদ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, একজন নামাজি ব্যক্তির মাথায় ব্যবহৃত টুপিটি পর্যন্ত প্রস্তুতকারী কোম্পানি সুদি লেনদেনের মাধ্যমে প্রস্তুত করেছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ থাকে। ব্যাংকিং বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লেনদেন করতে গিয়ে সহজেই সুদবিহীন কিছু করা যাচ্ছে না। স্কুলের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের সুদের অঙ্ক শেখানো হচ্ছে। অপর দিকে যে যত বেশি অর্থের মালিক সে সমাজে ততই দাপট খাটিয়ে চলছে। সম্মান পাচ্ছে। কিন্তু এই অর্থসম্পদের মালিকদের আয়ের উৎস কি বৈধ পথে না অবৈধ পথে! সেটা রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা জানার চেষ্টা করেন না।

কারণ রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তারা বেশির ভাগই অবৈধ পথে অর্থসম্পদের মালিক হচ্ছেন। কিছু সামাজিক আচার অনুষ্ঠান ব্যতীত তাদের ইসলামের আইন মেনে চলেন না। কুরআনের শিক্ষাকে তারা ভয় করেন। ফলে যে যত প্রভাবশালী তিনি তত অন্যের সম্পদ অবৈধ উপায়ে ভক্ষণ করে চলেছেন। রাষ্ট্রে নেই ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা। অবৈধ অর্থ দিয়ে অন্যের সম্পদ ভক্ষণকারীরা আদালতের রায় পর্যন্ত নিজেদের পক্ষে কিনে নিচ্ছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদার লোকগণ! পরস্পরে অবৈধ উপায়ে একে অপরের ধন ভক্ষণ করো না। সব রকমের লেনদেন হতে হবে পারস্পরিক সন্তোষ ও মর্জি অনুসারে। এবং তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহশীল। যে কেউ স্বীয় কর্মসীমা লঙ্ঘন করে জুলুমসহকারে এরূপ কাজ করবে, তাকেই আমি জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।’ (সূরা আন নিসা : ২৯-৩০)।

মহান আল্লাহর পবিত্র এসব কথা অনুযায়ী মানুষ চলছে না, যার কারণে মানুষ হতাশা ও বিপদগ্রস্ত থেকেই যাচ্ছে। হাজারো মানুষের হক নষ্ট করে অনেকে শিল্পপতি হচ্ছেন। শিল্পপতি হয়ে জাকাতের নামে কমদামি শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করে নিজেদের দানশীল ও সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত করার জন্য এক ধরনের প্রচার প্রচারণা চালান। এসব বিতরণকালে হাজারো দরিদ্রের ভিড় জমে এবং এদের মধ্যে এই ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে অনেকে নিহতও হচ্ছেন।

কিছু মানুষকে দান করে ছবি তুলে রেখে সরকারি-বেসরকারি এবং বিভিন্ন রকমের প্রতিষ্ঠানে তা দেখিয়ে বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও অর্জন করছেন। সেসব চিত্র নির্বাচনী প্রচারকাজেও ব্যবহার করছেন। এরকম শিল্পপতিরা হজ ও ওমরা করছেন। অনেকের দাড়ি-টুপিও আছে। তাদের মধ্যে অনেকে তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে পবিত্র কুরআন-হাদিসের বাণীও বিশেষব্যবস্থায় লেখাগুলো ঝুলিয়ে রাখছে। এর পেছনে উদ্দেশ্যÑ লোকজন এখানে এলে তাদেরকে বড়ই ধার্মিক ভাববে এবং মোটা অঙ্কের লেনদেন করতে দ্বিধায় পড়বে না।

মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের ধনসম্পদে প্রার্থী ও অভাবী লোকদের হক ও অধিকার রয়েছে। (সূরা : আয-যারিয়াত : ১৯)।

বর্তমান সময়ে বড় সম্পদশালীরা ধর্মীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের নামে মাত্র কিছু দানসদকা করলেও তারা কোটি কোটি টাকা ইসলামবিরোধী কাজে ব্যয় করছেন। করপোরেট গোষ্ঠীগুলো তাদের নিম্নমানের বিভিন্ন পণ্য অধিক বিক্রির জন্য সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে অশ্লীল বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে উঠতি বয়সী হাজার হাজার মেয়েকে নষ্ট করছে। ফলে ব্যাপকভাবে অশ্লীলতা-বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর মাধ্যমে নারীদের সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইভটিজিংয়ের মতো অসামাজিক অপকর্ম বেড়ে চলেছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপকর্মও বেড়েছে। এ সব কিছুর পেছনে অর্থনীতির সম্পর্ক আছে। জাকাত উত্তোলনের আইনি ব্যবস্থা না থাকায় সুদভিত্তিক এনজিও বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষÑ সেসবএনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এনজিওকর্মীরা গ্রামের সেসব গরিব মানুষের কাছে সুদের টাকা না পেয়ে ঘরের খুঁটি, গরু-ছাগল এবং অন্যান্য আসবাবপত্র জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। নারীদের নামে ঋণ দিয়ে এনজিওগুলো রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের এবং আন্তর্জাতিক দুষ্ট চক্রের বাহবা পেতে চায়। অথচ নারীদের নামে ঋণ দিয়ে তার সুদ সময়মতো না পেলে তাদেরকে চরম অপমান করা হয়। এমনকি অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের মতো এত বড় মুসলিম দেশে এমন জঘন্য ঘটনারও ইতিহাস আছে। রাষ্ট্রে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে কখনো এমন জঘন্য ঘটনা ঘটত না। জাকাতের মাধ্যমেই ওই সব নারী যথাযথ সম্মান অনুযায়ী অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেতে পারতেন।

সরকারি ব্যাংকগুলোও উচ্চ সুদে ঋণ দিচ্ছে। সাধারণ গরিব মানুষের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ নেই। যদি গরিবদের মধ্যে কেউ সেই সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে চায়, তাহলে তাদের অনেক পথ হাঁটতে হয়, ধমক শুনতে হয়, বিভিন্ন রকমের অপমান সহ্য করতে হয় এবং ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে পুলিশ দিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। বাড়ির মালামাল জব্ধ করা হয়। অথচ বড় বড় ঋণখেলাপিদের সরকারি ওই সব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। অসৎ দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। যে যত মোটা অঙ্কের ঋণ নিবে, তার ঝুঁকি তত কম। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে এমন এক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মালয়েশিয়া অত্যন্ত দরিদ্র রাষ্ট্র ছিল। সেখানে একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে দরিদ্র মালয়েশিয়ানদের মধ্যে ুদ্র বিনিয়োগ দিয়ে মালয়েশিয়াকে অনেক উন্নত করতে সক্ষম হন।আমাদের দেশের ব্যাংকের বড় বড় কর্মকর্তা ব্যাংকে চাকরির জন্য গাইড লিখে তা প্রকাশ করে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। কিন্তু কিভাবে ইসলামি অর্থনীতি চালু করে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই বিষয়ে তারা গাইড লিখছেন না। দু-একজন ইসলামি অর্থনীতিবিদ কিছু বই লিখলেও অনেক ক্ষেত্রে সেসব বইকে জঙ্গি বই বলে প্রচার চালানো হয়। ইসলামি শরিয়াভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকগুলোকে তারা জঙ্গি ব্যাংক বলে প্রপাগান্ডা চালায়।

ফুটপাথে, রেললাইনের বস্তিতে লাখ লাখ শিশু খাবার পাচ্ছে না। মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিল্পপতিদের নিজেদের এবং তাদের সন্তানদের আরাম-আয়েশ, ফুর্তির জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতেও হাত কাঁপে না। অসৎ লোকদের কাছে চলে গেছে বিপুল অর্থ। সৎ লোক এর প্রভাবে অসচ্ছলই থেকে যাচ্ছে। আর সাম্যহীন অর্থনীতির ওপর বর্তমান পৃথিবী চলছে। তাই অশান্তির দাবানলে সারা পৃথিবীতে কান্নার আওয়াজ বাড়ছে। যদি আমরা মহান আল্লাহর বিধান অনুযায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হই, তাহলে অবশ্যই কান্নার বিপরীতে হাসির শব্দ উচ্চারিত হবে।