ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

শাসকের সামনে সত্যোচ্চারণ উত্তম জিহাদ

সত্ কাজে আদেশ এবং অসত্ কাজে নিষেধ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা শৈথিল্য প্রদর্শন আল্লাহর গজব ত্বরান্বিত করে। ডেকে আনে বহুবিধ আসমানি বিপদ। পবিত্র কোরআনে মুমিনের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শিগগিরই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ {আত-তাওবা : ৭১}

কোনো জাতি যখন সম্মিলিতভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ ছেড়ে দেয়, ব্যস্ত থাকে কেবল নিজেকে নিয়ে; তখন সে জাতির ওপর বিপদ অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জাতির পতন ও চূড়ান্ত ধ্বংস ডেকে এনেছে এই কর্তব্য কাজে অবহেলা। আল্লাহ বনি ইসরাইল সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা থেকে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট।’ (আল মায়িদা : ৭৯)

ন্যায়ের পথে ডাকা আর অন্যায়ে বাধা দেয়ার এই কাজটি চালিয়ে যেতে হয় ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র ও বিশ্বপর্যায়ে। যারা সুশাসক, ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রপরিচালক তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অন্যের মতকে অবদমিত করেন না। তারা অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। অন্যের সদুপদেশকে অর্ঘ্য ভেবে বুকে তুলে নেন। এতে করে তারা যেমন আল্লাহর প্রিয় হন, রাষ্ট্রও তেমন উপকৃত হয়। জনগণ থাকেন শান্তিতে।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র মদিনা প্রজাতন্ত্রের জনগণ নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে তার শাসক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরে চার পুণ্যবান খলিফার সামনে ‘সত্ কাজের আদেশ ও অসত্ কাজের নিষেধের’ অংশ হিসেবে তাদের মত তুলে ধরতে পারতেন। মহানবীর অভ্যাস ছিল তিনি নানা বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের মত নিতেন। শাসকের সামনে মত প্রকাশে উত্সাহিত করতেন। উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ ও বিশিষ্ট সাহাবিদের মত ছিল মদিনা শহরের অভ্যন্তরে অবস্থান করে শত্রুর মোকাবিলা করা। পক্ষান্তরে হামজা (রা.) এবং অপেক্ষাকৃত যুবক সাহাবিরা চাইছিলেন শহরের বাইরে কোনো উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে যুদ্ধ করতে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের এই মত গ্রহণ করে উহুদ প্রান্তরে কুরাইশদের বিপক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।

আবু বকর (রা.) রাসুলের প্রথম খলিফা মনোনীত হওয়ার পর জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাকে অনুসরণ করো যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুসরণ করব। যদি আমি গোমরাহির পথে পরিচালিত হই তবে তোমরা আমাকে সঠিক পথের দিশা দেবে।’ তত্পবর্তী খলিফা উমর (রা.)ও ক্ষমতায় থাকতে বক্তৃতায় জনগণকে বলেন, ‘আমি যদি ভুল পথে পরিচালিত হই তখন তোমরা কী করবে?’ তাত্ক্ষণিকভাবে একজন উত্তর দিলেন, ‘এই তরবারি দিয়ে সোজা পথে নিয়ে আসব’।

পক্ষান্তরে ক্ষমতা যাদের অন্ধ, বধির ও বিবেকপ্রতিবন্ধী বানিয়ে দেয়, তারা অন্যের মতের তোয়াক্কা করেন না। তারা রাষ্ট্রীয় পীড়ন ও জুলুমের বিরুদ্ধে সত্যোচ্চারণকারীর টুঁটি চেপে ধরতে চান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সরকারি বাহিনীর জোরে তারা সত্যকে মাটির নিচে দাফন করতে চান। চান নিজের তল্পিবাহক ও স্তাবকদের সামনে রেখে মিথ্যা ও অন্যায়ের রাজ কামেয় করতে। তথাপি ইতিহাসের নানা বাঁকে কিছু অকুতোভয় সত্যনিষ্ঠ মানুষকে দেখা যায় জালেমের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করতে। তারা নিজের জীবন বিপন্ন আবার কখনও উত্সর্গ করে সবার সামনে সত্য তুলে ধরেন। লাখো-কোটি মিথ্যা পূজারীর সামনে বুক চিতিয়ে সত্যোচারণ করে স্থায়ী জায়গা করে নেন মানুষের মনের মুকুরে এবং ইতিহাসের সোনালি পাতায়। এ দুরূহ কাজ সবাইকে দিয়ে হয় না। হয় তাদের দিয়েই যাদের বক্ষ ঈমান ও সত্ সাহসে টইটুম্বুর।

যারা পার্থিব ভয় ও জাগতিক লোভ সংবরণ করতে পারেন, যারা ক্ষুদ্র পরিবারের মায়া এবং গুটিকয় প্রিয়জনের ভালোবাসা ডিঙে সবার হয়ে উঠতে পারেন, নিজেকে সবার এবং সব সময়ের করে তুলতে পারেন, যারা উজ্জীবিত ও বলীয়ান হন দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বকালের সত্যনিষ্ঠ মানুষের ভালোবাসায়। এ কারণেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায় শাসক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বীর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জালেম শাহির সামনে সত্যোচ্চারণকে আখ্যায়িত করেছেন ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ’ হিসেবে।

সাহাবি আবু উমামা বাহেলি (রা.) থেকে বর্ণিত, বিদায় হজে প্রথম জামারায় পাথর নিক্ষেপের সময় এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কোন জিহাদ সর্বোত্তম? রাসুল তাকে এড়িয়ে গেলেন। দ্বিতীয় জামারায় গিয়েও তিনি একই প্রশ্ন করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও একইভাবে এড়িয়ে গেলেন। তৃতীয় জামারায় গিয়ে পাথর নিক্ষেপের পর রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রশ্নকারী ওই ব্যক্তি কোথায়?’ ওই ব্যক্তি সামনে বেড়ে বললেন, আমি হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, ‘অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।’ [মুসনাদ আহমদ : ১৮৮৩০; নাসাঈ : ৪২০৯]

আমরা সাধারণত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শত অন্যায়-অবিচার দেখেও কথা বলি না। অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানো দূরের কথা, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানান তাদের অন্তত সমর্থন পর্যন্ত করি না। অথচ অন্যায় করা আর অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা একই অপরাধ। সত্য উপলব্ধি করেও তা উচ্চারণ না করা এবং মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়া থেকে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে মিথ্যাকে গোপন করো না। (বাকারা : ৪২)

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় হতে দেখবে সে যেন তা হাত দিয়ে বদলে দিতে চেষ্টা করে। যদি তা না পারে তাহলে তার ভাষা দিয়ে, অন্যথায় অন্তর দিয়ে বদলে দিতে চেষ্টা করবে। আর এটি দুর্বলতম ঈমানের স্তর।’ (মুসলিম : ৭৪)

আল্লাহ আমাদের সত্যোচ্চারণে দৃপ্তশপথে বলীয়ান করুন। মিথ্যার বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ ও রুখে দাঁড়ানোর শক্তি দিন। সব সত্যবাদী ও সত্যোচ্চারণকারীর সহায় হোন এবং সুপথ দান করুন জালিমদের।