ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

শাসনে আর সোহাগে আল্লাহ আমাদের খুব কাছে

পৃথিবীতে জীবনস্রোত দিগ্বিদিক ছুটে চলেছে—এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত সর্বত্রই সীমাহীন অস্থিরতা। পার্থিব জীবনের প্রাপ্তিকেই মানুষ তার সব আরাধ্য স্থির করে নিয়েছে, সব সাধনা আর ভালোবাসা তাতেই ঢেলে দিয়েছে, আর এক রূঢ় সত্য বিচার দিবসকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে বসে আছে (কিয়ামাহ-৭৫.১৬)। হুশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে : নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত (আছর-১০৩.২)।

পুঁজির দাসত্ব, ভোগের দাসত্ব, সংস্কৃতি নামক এক বিমূর্ত দেবতার দাসত্ব করে করে আমাদের দম ফেলার সময় নেই। আমরা আমাদের সব কিছুকেই পণ্য করেছি—ভেতরে-বাইরে, খোল-নলচে উজাড় করে সবকিছুকে ‘সেলাবল আইটেম’ করে নিয়েছি, যদি কিছু বাড়তি আয় হয়। কেননা, আমরা অর্থকেই আমাদের অভিভাবক বানিয়ে নিয়েছি। আমরা পরস্পর পরস্পরকে ঠকাচ্ছি; এর মধ্যেই আমাদের তৃপ্তি, যদি কিছু বাড়তি আয় হয়, তবে সুখে থাকব।

অথচ এক সময় এই মানুষগুলোর এ ধরায় কোনো অস্তিত্বই ছিল না, (দাহর : ৭৬.১), আবার একদিন তারা থাকবেও না। সব অনিশ্চয়তাকে মাথায় নিয়েও মহান স্রষ্টার আহ্বান, সতর্কবাণী আর মহাকল্যাণের প্রতিশ্রুতিকে পদদলিত করে আমরা এই জীবনের ভোগ-লালসাকেই একমাত্র পূজ্য করে রেখেছি। কদাচিত আলোর ঝলকানি কারও চোখে পড়ে, তাতে মন টানে না। কিন্তু কপালের চুল টেনে ধরে যে আছেন একজন তা বেমালুম ভুলে আছি।

প্রতিটি সত্তার নিয়ত বসবাস সব কিছুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহর খড়গের নিচে। নাছিইয়াতুন (নুন, ছোয়াদ, ইয়া, তা) মানে ললাট ও তার সন্নিহিত কেশ। এর বহুবচন নাঅছিয়ুন (কেশগুচ্ছ)। সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে মহাপরাক্রান্ত আল্লাহর শাসনের খড়গ যে প্রতিটি ব্যক্তিসত্তার অতি সন্নিকটে তার এক অত্যন্ত শক্তিশালী প্রয়োগ আমরা লক্ষ্য করি সূরা হুদে।

‘আদ সমপ্রদায়ের কাছে প্রেরিত তাদের ভাই ও নবী হজরত হুদ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর শেখানো ভাষায় সতর্ক করছেন এই বলে : ইন্নি তাঅক্কালতু ‘আলাল্লাহি রাব্বি অরাব্বিকুম, মা মিন দাব্বাতিন ইল্লা হুয়া আখিযুম্ বিনাছিয়াতিহা, ইন্না রব্বি ‘আলা ছিরাতিম্ মুছতাকিম (১১.৫৬)। ‘আমি আল্লাহর উপর নিশ্চিত ভরসা করেছি যিনি আমার এবং তোমাদের পরওয়ারদেগার। পৃথিবীর বুকে বিচরণকারী এমন কোন প্রাণী নেই যার কপালের ঝুটি  তাঁর করতলে আবদ্ধ নয়। নিশ্চয় আমার প্রতিপালক সরল পথে রয়েছেন। ‘পুনরায় তাদের সতর্ক করছেন এই বলে : ‘তথাপি যদি তোমরা মুখ ফেরাও, তবে আমি তোমাদেরকে তা পৌঁছিয়েছি, যা আমার কাছে তোমাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছে; আর আমার প্রতিপালক অন্য কোনো জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, আর তোমরা তার কিছুই বিগড়াতে পারবে না; নিশ্চয়ই আমার পরওয়ারদেগারই প্রতিটি বস্তুর সংরক্ষণকারী।’

সূরা আর রাহমানে আল্লাহ্ তায়ালা স্বয়ং কিয়ামতের দৃশ্যপট বর্ণনা করছেন : ইয়ু’রফুল মুজরিমুনা বিসিমাহুম ফাইয়ু’খযু বিন্নাঅছি অলআকদাম। ফাবিআয়্যি আলা-ই রব্বিকুমা তুকাজ্যিবান। হাজিহি জাহান্নামুল্লাতি ইউকাজ্যিবু বিহাল মুজরিমুন। ইয়াত্বুফুনা বাইনাহা অবাইনা হামীমিন আন (৫৫.৪১-৪৪)।

‘অপরাধীদের পরিচয় পাওয়া যাবে তাদের চেহারা থেকে; অতঃপর তাদের কপালের চুল (ভড়ত্বষড়পশং) ও পা ধরে টেনে নেয়া হবে। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে? এটাই জাহান্নাম, যাকে অপরাধীরা মিথ্যা বলত। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে প্রদক্ষিণ করবে।’

সেই একই ‘নাছিইয়াতুন’ শব্দের চূড়ান্ত ক্রোধযুক্ত ব্যবহার করেন সূরা আলাকে : আরাআইতা ইন কাজ্যাবা অতাঅল্লা। আলাম ইয়া’লাম বিআন্নাল্লহা ইয়ারা। কাল্লা লায়িল্লাম ইয়ানতাহি লানাছফায়াম্ বিন্নাছিইয়াতি। নাছিইয়াতিন কাযিবাতিন খত্বিয়াহ্ (৯৬.১৩-১৭)। অর্থাত্ তুমি কি দেখেছ, যদি সে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখেন? কখনোই নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি তার মস্তকের সামনের কেশগুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবোই। মিথ্যাচারী, পাপীর কেশগুচ্ছ।’ এখানে লাম-তাকিদযোগে ‘লানাছফায়ান’ জমা’মুতাকাল্লেমের ছিগাহ; অর্থ : আমি অবশ্যই টানব বা হেঁচড়াব।

আমরা এই পর্যায়ক্রমিক ব্যবহারটা বুঝতে চেষ্টা করি। একই ঘটনা আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীর বিবৃতি আকারে সূরা হুদে আমাদের জানিয়ে হুশিয়ার করছেন। সূরা আর-রাহমানে নিজেই বক্তব্যদাতা অথচ তার প্রকাশ কর্মবাচ্যে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ভয়াবহ অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে এই শেষোক্ত উদ্ধৃতিতে সূরা আলাকে। এখানে অপরাধীদের প্রতি তার যারপরনাই আক্রোশ প্রকাশে নিজেকে আর অনোন্মোচিত রাখলেন না, তিনি নিজেকেই এখানে কারক (কর্তৃবাচ্য) হিসেবে ঘোষণা দিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি স্বয়ং চূড়ান্ত আঘাত হেনে সুতীব্র ভর্ত্সনাসূচক তাঁর মন্তব্যও আমাদের জানিয়ে দেন যে, সেই অপরাধীর কেশগুচ্ছ মিথ্যা ও পাপযুক্ত। তিনটি মাত্র শব্দ প্রয়োগে এই যে ক্রোধের সর্বশেষ প্রকাশ : নাছিইয়াতিন কাজিবাতিন খত্বিয়াহ-এর তুলনা কোথায়? একটা পুরো জীবন পার করে দেয়া যায় এর ওপর ফিকির করে। আহ্! নিতান্ত আফসোস!! যদি আমাদের বুঝ আসত।

স্রেফ চুল ধরা নয়, মনের ভেতরকার অনুক্ত চিন্তাগুলোও যে তাঁর নখদর্পণে তাও জানান দিয়েছেন : ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি নিভৃতে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী’ (কাফ : ৫০.১৬)।

আল্লাহতায়ালা সতর্ক করেছেন, ভয় দেখিয়েছেন, আবার স্নেহ-ভালোবাসা মেখেও বলেছেন : ‘আর আমার বান্দারা যখন আমার ব্যাপারে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে; আমি তো কাছেই রয়েছি। প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দিই। তাই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে’ (বাকারাহ : ২.১৮৬)।

আর তিনি সেটা করতেই পারেন, কেননা তিনি আল্লাহ জাল্লাশানুহু। শাসন ও সোহাগের এই পরোয়ানা আমাদের দিকে প্রসারিত, কিন্তু আমরা তা বিস্মৃত হয়েছি, তাই আমাদের কথা ও কাজ, চালচলন সবই বেপরোয়া। শয়তান আমাদের ওপর তার পূর্ণ রাজত্ব কায়েম রেখে চলেছে। কোরআনে প্রত্যাবর্তন আমাদের শয়তানি সেই কবজা থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়ে দিতে পারে।

লেখক : আবু সাঈদ খান