ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

শীতবস্ত্র বিতরণ এবং খেদমতে খাল্ক

winter-cllothবিশ্বমানবতার ধর্ম হিসেবে মানবতার ব্যাপক কল্যাণ কামনা ও বাস্তবায়ন ইসলামের নির্দেশনাগুলোর একটি মৌলিক নির্দেশ। বিশ্বমানবতার সংহতি বিধান করা ইসলামী আকিদা, বিশ্বাস ও কর্মনীতির একটি মজ্জাগত বিষয়। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত, বিপদগ্রস্ত ও সাহায্যপ্রার্থী প্রতিটি মানুষের প্রতি এগিয়ে যাওয়া, তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রতি ইসলামের রয়েছে নিরন্তর উৎসাহ। এ মহৎ কর্মে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ ও কার্যকর নীতিমালা। ইসলাম মানুষের প্রতি মানুষের সংহতি প্রকাশের বিষয়টিকে একটি সৎ ও মহৎ কর্ম হিসেবে নির্ধারিত করেছে এবং এ কর্মটিকে ব্যক্তির ঈমান-ইসলামের পরিপূর্ণতার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও মমত্ববোধ প্রদর্শন করাকে ইসলামের মূল স্তম্ভ সালাত-সিয়ামের অনুরূপ মৌলিক ইবাদত হিসেবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বহু সংখ্যক আয়াত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে নি¤œরূপ আয়াতগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণ নিশ্চিত করবে আত্মীয়, এতিম-মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশী, সফরসঙ্গী, পথিক এবং দাস-দাসীদের। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না; যারা কার্পণ্য করে এবং অন্যদের কার্পণ্যের ব্যাপারে আদেশ দিয়ে বেড়ায় তাদের প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত (ধনসম্পদ) গোপন করে …’ (সূরা নিসা : ৩৬-৩৭)।

অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘তাদের এমন কী হতো? যদি তারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক (সম্পদ) থেকে অন্যদের দান-খয়রাত করত, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে সম্যকভাবে জ্ঞাত রয়েছেন’ (সূরা নিসা : ৩৯)।

তিনি অন্যত্র আরো বলেন, ‘প্রকৃত কল্যাণ হচ্ছে আল্লাহ, আখিরাত, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহর মহব্বতে আত্মীয়, এতিম, মিসকিন, পথিক, ভিুক ও দাসত্ব বিমোচনে ধনসম্পদ দান করা …’ (সূরা বাকারা : ১৭৭)।

উল্লিখিত আয়াতগুলোর পাশাপাশি মহানবীর বহু সংখ্যক হাদিসেও মানুষের প্রতি মানুষের সংহতি প্রকাশের বিষয়টি বর্ণিত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে নি¤েœœাক্ত হাদিসগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মহানবী সা: বলেন, ‘মানুষ যতণ পর্যন্ত অন্যের কল্যাণে নিয়োজিত থাকে; ততণ পর্যন্ত আল্লাহ ওই ব্যক্তির কল্যাণে রত থাকবেন’ (মুসলিম)। ইসলামের নীতি-নির্দেশনা হচ্ছে, অন্যের কল্যাণ ও সংহতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত দান-অনুদান ব্যক্তির আর্থিক সচ্ছলতা ও সমতা অনুযায়ী ছোট বা বড় পরিমাণের যে কোনোটিই হতে পারে। কম সচ্ছল ব্যক্তিও এ কাজে পিছিয়ে থাকবে না; বরং সামান্য একটি খেজুর, এক মুষ্ঠি খাদ্য, দু-একটি টাকা হলেও তা নিয়েই এগিয়ে আসবে। প্রয়োজনে নিজের কাছে থাকা সব কিছুই অন্যের উপকারে ও কল্যাণে দান করবে। এ কর্মে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার সাথে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক উদ্যোগও প্রয়োজন।

বিশ্বজগতের স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার সৃষ্ট জগতের সব কিছুই প্রতিপালন করেন। তিনিই ঋতুর পরিবর্তন ঘটান। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ইত্যাদি তাঁরই নির্দেশে আবর্তিত হয়। এসব কিছুর মধ্যেই আল্লাহর বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। মানবজীবন ও বাহ্যপ্রকৃতির ভারসাম্য রার জন্য ঋতুবৈচিত্র্যের দরকার হয়ে পড়ে। প্রত্যেক ঋতুর আলাদা বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য রয়েছে। শীত ঋতু অনেক কল্যাণকর জিনিস আমাদের উপহার দেয়। তথাপিও শীত কিছু সমস্যারও সৃষ্টি করতে পারে। সামর্থ্য নেই বা যাদের ভালোভাবে বসবাস করার মতো ঘরবাড়ি নেই, তাদের জন্য শীতকাল অতি পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে।

নগরের আলোকোজ্জ্বল রাস্তার দুই ধারে জীর্ণবস্ত্র পরে অনেক অসহায় নারী-পুরুষ ও শিশুকে আমরা ল করি, যারা শীতকালকে অত্যন্ত অভিশাপ বলে মনে করে। ফুটপাথে অনেক শিশু খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়। তাদের কাছে শীতের সব ভালো দিকই ম্লান হয়ে যায়। প্রকৃতির এসব দুর্যোগ বা আপাত দুরবস্থা মোকাবেলা করার সামর্থ্য আল্লাহ মানুষকে প্রদান করেছেন। মানুষ যদি আল্লাহর বিধান অনুসারে আল্লাহ প্রদত্তসম্পদ ও সঙ্গতি সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করে, পরস্পর দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে, তাহলে এসব আপাত দুরবস্থা, দুর্ভোগ মোকাবেলা করে কল্যাণকর দিকগুলো অর্জন করতে পারে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারলে শীত ঋতুর অশুভ দিকগুলো মোকাবেলা করে আমরা শুভ দিকগুলো অর্জন করতে পারি।

আল্লাহ যাদের সামর্থ্য দিয়েছেন, তারা যদি সম্পদহীন গরিব, অসহায়-দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন, তাহলে এসব আপাত দুর্ভোগ এড়ানো সম্ভব। আল্লাহ এ অবস্থায় মানুষকে পরীা করেন। মানুষের জন্য আল্লাহ যে জীবনবিধান প্রদান করেছেন সেখানে গরিব, অসহায়, দুর্গতদের সাহায্য করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সম্পদশালীর সম্পদের মধ্যে গরিবদের হক নির্ধারণ করা হয়েছে। গরিব, অসহায়দের সেই অধিকার প্রদান করলেই তাদের আর কোনো দুর্ভোগ থাকতে পারে না।

ইসলাম আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি যেসব কর্তব্য পালনের নির্দেশ প্রদান করেছে, তা সুষ্ঠুভাবে পালন করলেই এ ধরনের যেকোনো প্রাকৃতিক সমস্যাকে যথাসম্ভব মোকাবেলা করা যায়। আর যেসব বিষয় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সে ব্যাপারে কাউকে আল্লাহ দায়ী করবেন না। কিন্তু আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন, সে শীত নিবারণের নামে যথেচ্ছ ফ্যাশন করবেন, বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরবেন, আর তারই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা ন্যূনতম শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পাবে, ইসলাম এ ব্যবস্থা সমর্থন করে না।

একটু ল করলে দেখা যাবে, সমাজে যেসব অভাবী মানুষ শীতে কষ্ট পান, তারা আমাদেরই কারো না কারো আত্মীয়, কারো না কারো প্রতিবেশী। আল্লাহ বলেছেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে তার প্রাপ্য দেবে’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৬)। আত্মীয়স্বজনদের প্রাপ্য বলতে তাদের অভাবে বা দুরবস্থায় সাহায্য করতে হবে। প্রত্যেক বিত্তবান যদি তাদের গরিব আত্মীয়স্বজনদের সাহায্য করেন, তাহলে সমাজে কোনো মানুষেরই দুর্ভোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আমরা ল করি, অনেক ধনী ব্যক্তিই তাদের গরিব আত্মীয়স্বজনদের পরিচয় পর্যন্ত দিতে চান না।

অথচ রাসূল সা: বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)। ইসলাম অনুসারে আমাদের চার পাশের ৪০ ঘরের মধ্যে যারা আছেন, সবাই আমাদের প্রতিবেশী।

রাসূল সা: বলেছেন, ‘জিবরাইল আ: আমাকে প্রতিবেশীদের সম্পর্কে এত বেশি তাগিদ দিয়েছেন যে, আমার মনে হচ্ছিল, তিনি তাদের আমার ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন’ (ইবনে মাজা, মিশকাত)।

প্রতিবেশীদের খোঁজখবর না নিয়ে তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন না করলে কেউ প্রকৃত মুসলমান থাকতে পারে না। তাই এ শীত ঋতুতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি সামর্থ্যবান বা বিত্তবানেরা যদি তাদের ওপর ইসলাম নির্দেশিত কর্তব্য পালন করেন, তাহলে কোনো অসহায় নারী-পুরুষ, শিশুকে শীতের দুর্ভোগ-দুর্দশার শিকার হতে হবে না।