ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

সঠিক পথের সন্ধানদাতা – মুহাম্মদ সা:

সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য আমি স্বয়ং তোমাদেরই মাঝ থেকে একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, তাঁর কাজ হচ্ছে তোমাদের কাছে আমার আয়াত পাঠ করে শোনাবে, তোমাদের জীবন পরিশুদ্ধ করবে, আমার কিতাবের অন্তর্নিহিত জ্ঞান তোমাদেরকে শিা দেবে, সর্বোপরি তোমরা যেসব বিষয় জানতে না তা তোমাদেরকে জানাবে।’ (সূরা আল বাকারা : ১৫১)।

আল্লাহ তায়ালা আরো ঘোষণা করেন, ‘তিনিই সে মহান সত্তা যিনি তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট হেদায়েত ও সঠিক জীবন বিধান (দ্বীন) সহকারে তাঁর রাসূল সা:-কে পাঠিয়েছেন, যেন তিনি এই জীবন বিধান (দ্বীন)-কে দুনিয়ার সব বিধিবিধানের ওপর প্রতিষ্ঠা বা বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকরা তা যত দুঃসহই মনে করুক না কেন।’ (সূরা আত তাওবা : ৩৩)।

আল্লাহ তায়ালা শুধু মুহাম্মদ সা:-কেই দ্বীন কায়েমের বা জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন তা কিন্তু নয়। অতীতের সব নবী-রাসূলদেরও এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য সে দ্বীনই নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ আমি দিয়েছিলাম নূহকে আর যা আমি তোমাদের কাছে ওহি করে পাঠিয়েছি, উপরন্তু যার আদেশ আমি দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসাকে; এদের সবাইকে আমি বলে ছিলাম তোমরা আমার এ দ্বীন বা জীবনবিধান সমাজে প্রতিষ্ঠা করো আর কখনো অনৈক্য সৃষ্টি করো না, অবশ্য যে দ্বীনের দিকে তুমি লোকদেরকে আহ্বান করছো, এটা মুশরেকদের কাছে একান্ত দুর্বিষহ মনে হয়, মূলত আল্লাহ তায়ালা যাকেই চান তাকে বাছাই করে নিজের দিকে নিয়ে আসেন আর যে ব্যক্তি আল্লাহ অভিমুখী হয় আল্লাহ তাকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করেন।’ (সূরা আশ শুরা : ১৩)। আল্লাহ তায়ালার এ হুকুম মেনে সব নবী-রাসূলই দ্বীন কায়েমের চেষ্টা করেছেন।

তখনো তাওরাত, জাবুর ও ইনজিলের আলেম বা আহবার ও রুহবারগণ আল্লাহর রাসূল সা:-এর নবুওয়াতের বিরোধিতা করেছিল। ওইসব আহবার ও রুহবারের অনুসারীরা কাবাঘরে ৩৬০টি মূর্তি রেখে পূজা করত। ৩৬০টি মূর্তি তাদের বিভিন্ন দেবদেবীর গোত্র ও ধর্মের প্রতীক ছিল। এসব মূর্তিপূজারী সবাই মূর্তি বা দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। অর্থাৎ তারা ছিল ধর্মনিরপে বাদী। আল্লাহর রাসূল সা: মক্কা বিজয়ের পর এসব মূর্তি কাবাঘর থেকে অপসারণ করেছিলেন। আর এখন আমাদের ঘরে ঘরে এমনকি আমাদের পকেটে পকেটে মূর্তি শোভা পাচ্ছে। আমাদের মুসলিম মিল্লাতের জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আ:-কে যে মূর্তি ভাঙার অভিযোগে নমরুদ আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিল আমরা সেই মুসলিম মিল্লাতের জাতির পিতার আদর্শ ভুলে বাতিলের আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।

হজরত মুহাম্মদ সা: মানুষকে শিরকের ভ্রষ্টতা, মূর্তিপূজা, মারামারি, হানাহানি, অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহ তায়ালার রবুবিয়াত ও একত্ববাদের আহ্বান জানান। ক্রমান্বয়ে মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। অনেক ত্যাগ-তিতিার পর, অনেক রক্ত আর শহীদের বিনিময়ে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, শিা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সুবিচারের নিশ্চয়তা পায়। আল্লাহর রাসূল সা: ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা অকান্ত পরিশ্রম করে অনেক রক্ত আর শহীদের বিনিময়ে পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণযুগের উপহার দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাঁর রাসূল সা:-কে তাঁর কাজের মূল্যায়ন করে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন এই বলে, ‘আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য আমার দ্বীনের পরিপূর্ণতা দান করলাম, আর এ দ্বীন হচ্ছে তোমাদের জন্য আমার প থেকে নিয়ামতস্বরূপ, আর আমার প থেকে দ্বীন আল ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করে দিলাম।’ (সূরা আল মায়িদা : ৩)।

রাসূল সা: দীর্ঘ ১০ বছর ইসলামি খিলাফত পরিচালনা করেন। রাসূল সা: দশম হিজরির ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে বিদায় (হজের) ভাষণ দান করেন। তিনি ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।

উম্মতে মুহাম্মদী সা:-এর দায়িত্ব : নবী-রাসূলগণের প্রথম কাজ ছিল মানুষদের আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের দাওয়াত দেয়া। সূরা আর রাদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(অতীতে যেমন আমি নবী-রাসূল পাঠিয়েছি) তেমনি করে আমি আপনাকেও একটি জাতির কাছে নবী করে পাঠিয়েছি, এর আগে অনেক জাতি অতিবাহিত হয়ে গেছে, যাদের কাছে আমি নবী পাঠিয়েছি যাতে করে তাদের কাছে আমার কিতাব শোনাতে পারে, যা আমি আপনার ওপর ওহি করে পাঠিয়েছি, এ সত্ত্বেও তারা অনন্ত করুণাময় আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করে, আপনি তাদের বলে দিন, তিনিই আমার মালিক, তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মাবুদ নেই। সর্বাবস্থায় আমি তাঁর ওপরই ভরসা করি, তাঁর দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন।’ (সূরা আর রাদ : ৩০)।

আল্লাহ তায়ালা আরো ঘোষণা করেছেন, ‘আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি, যাতে করে (তাদের কাছে বলতে পারে) তোমরা এক আল্লাহ তায়ালার এবাদত করো এবং আল্লাহ তায়ালার বিরোধী শক্তিগুলোকে বর্জন করো।’ (সূরা আন নাহল : ৩৬)।

উম্মাতে মুহাম্মদী সা: দুনিয়ার মানুষের জন্য সাী। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছেÑ ‘এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী মানব দলে পরিণত করেছি, যেন তোমরা দুনিয়ার অন্যান্য মানুষের ওপর (হেদায়েতের) সাী হয়ে থাকতে পারো এবং একই ভাবে রাসূল সা:ও তোমাদের ওপর সাী হয়ে থাকতে পারেন, যে কেবলার ওপর তোমরা এত দিন প্রতিষ্ঠিত ছিলে, আমি তা এ উদ্দেশ্যেই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে করে আমি এ কথাটা জেনে নিতে পারি, তোমাদের মধ্যে কে রাসূল সা:-এর অনুসরণ করে আর কে তাঁর কথা থেকে ফিরে যায়। তাদের ওপর এটা ছিল একটা কঠিন পরীা। অবশ্য আল্লাহ তায়ালা যাদের হেদায়েত দান করেছেন তাদের কথা আলাদা; আল্লাহ তায়ালা কখনো তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন না। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য বড় দয়ালু ও মেহেরবান।’ (সূরা আল বাকারা : ১৪৩)।

‘(সে দিনের কথা স্মরণ করো) যে দিন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বয়ং তাদেরই মধ্য থেকে তাদের ওপর সাী উত্থিত করব এবং এ লোকদের ওপর আমি আপনাকেও (রাসূল সা:-কে) সাী হিসেবে নিয়ে আসব, আমি আপনার ওপর কিতাব নাজিল করেছি, মুসলমানদের জন্য কিতাব হচ্ছে দ্বীন সম্পর্কিত সব কিছুর ব্যাখ্যা, আল্লাহ তায়ালার হেদায়েত ও মুসলমানের জন্য (জান্নাতের) সুসংবাদ স্বরূপ।’(সূরা আন নাহল : ৮৯)।

উম্মতের কাজ হচ্ছে আল্লাহর দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকা বা দাওয়াত দেয়া। সূরা আল ইমরানের ২০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যাশা করছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা প্রয়োজন যারা মনুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে আর অন্যায় ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।’ আল্লাহ তায়ালা ওই সূরার ১১০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম জাতি তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মনবতার কল্যাণের জন্য, তোমাদের কাজ হলো তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে আর অন্যায় ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।’ আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একটি দল আছে, যারা মানুষকে সঠিক পথের দিকে ডাকে এবং নিজেদের জীবনে ইনসাফ কায়েম করে।’ (সূরা আল আরাফ : ১৮১)।

আমরা যারা মুহাম্মদ সা:-এর উম্মত বা তাঁর দলের লোক বলে নিজেদেরকে দাবি করছি তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, মুহাম্মদ সা: যে কাজ যেভাবে করেছেন, যে আদর্শ জীবনবিধান বা আইনকানুন রেখে গেছেন, সে আদর্শ জীবনবিধান বা আইনকানুন মেনে চলা, সে আদর্শ জীবনবিধান বা আইনকানুন প্রতিষ্ঠা করা আর অন্যদের তা মানানোর চেষ্টা করা ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য আহ্বান করা ও উদ্বুদ্ধ করা। আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জানার জন্য ও সে মোতাবেক আমল করার জন্য রাসূল সা: আমাদের জন্য দুটো জিনিস রেখে গেছেন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি আর তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা কিতাব বা কুরআন ও আমার সুন্নাহ বা হাদিস।’(মাজহারি)।

আমরা যারা সালাত আদায় করি প্রতি ওয়াক্ত সালাতের প্রতি রাকাতে আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা প্রার্থনা করি, ‘ইহদ্বীনাসসিরাতাল মুস্তাকিম।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাদের সঠিক সহজ ও সরল পথ দেখাও।’ (সূরা আল ফাতিহা : ৬)।

রাসূল সা: এ ‘সিরাতাল মুস্তাকিম’ পাওয়ার জন্যই ওই দুটো জিনিসের কথা বলেছেন। তা ছাড়া আল্লাহ তায়ালাও কুরআনের শুরুতেই বলেছেন, ‘এই সে গ্রন্থ যার মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই, এটি যারা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে চলবে তাদেরকে সঠিক, সহজ ও সরল পথ দেখাবে।’ (সূরা আল বাকারা : ২)।

আর এ সঠিক, সহজ ও সরল পথ পাওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছেÑ ‘গায়েব (আল্লাহ)-কে বিশ্বাস করতে হবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে, আল্লাহ তায়ালা যে রিজিক দান করেছেন তার থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে হবে, রাসূল সা:-এর ওপর যা নাজিল করা হয়েছে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, আর আগের নবীদের ওপর যা কিছু নাজিল করা হয়েছিল তার ওপরও বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, আর বিশ্বাস করতে হবে পরকালের বা শেষ বিচারের দিবসের প্রতি।’ (সূরা আল বাকারা : ৩-৪)।

এ রকম বিশ্বাস ও কুরআন ও হাদিসের পথ অনুসরণ করলেই আমরা রাসূল সা:-এর অনুসারী বা উম্মত হতে পারব। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তোমরা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সা:-এর কথা মেনে চলো; আশা করা যায় তোমাদের ওপর দয়া করা হবে।’ (সূরা আল ইমরান : ১৩২)।