ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্বসময়ের গণ্ডিতে বাঁধা আমাদের জীবন, চালমান সময়ের প্রত্যেক সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সফল জীবন রচনায় প্রয়োজন সঠিক সময় ব্যবস্থাপনার। জীবনকে অর্থবহ, সমৃদ্ধ ও সুখস্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সময় সচেতন ও পরিকল্পিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া। আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ’ আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় সময়ের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন বিষয় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি সূরা আল আসরে বলেছেন : ‘সময়ের কসম। মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে, একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিয়েছে।’

সময় হচ্ছে এমন একটি সম্পদ যা একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। স্মরণ রাখতে হবে, আমরা অনেক কিছুই করতে পারব, কিন্তু সময়কে টেনে লম্বা করতে পারব না। যারা কাজের মধ্য দিয়ে সময় কাটায়, তারা সর্বদা আনন্দের মধ্যে থাকে। যারা অলস বসে থাকে তারা নানা দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার শিকার হয়। সময় এমন একটি বন্ধু, যা নিমেষে নিমেষে রূপ বদলায় এবং চমৎকার সব উপহার-উপঢৌকন তুলে দেয় আমাদের হাতে। আর যদি আমরা তাকে অবজ্ঞা করি তাহলে সে যাবতীয় উপহার-উপঢৌকনসহ চুপিসারে চলে যায় আমাদের কাছ থেকে। আমাদের দেশে সময়ের অপব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আমরা যদি সময়ানুবর্তী না হই দেশ আগাবে না, সময় নষ্ট করা জাতীয় কৃষ্টি হিসেবে গড়ে উঠবে।

আমরা যদি সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে জ্ঞানচর্চা, দেশসেবা, সমাজসেবা, মানবতার জন্য, নিজের ধর্ম ও আদর্শের জন্য কাজ করা। আর রাষ্ট্রেরও সময় ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সুধী পাঠকদের হংকংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় সময় ব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত দিতে চাই, তা হলোÑ হংকং একটি সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে দেখল যে যদি পাহাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তা নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে পাঁচ সেকেন্ড সময় বেশি লাগবে আর যদি পাহাড় কেটে ভেতর দিয়ে রাস্তা নেয়া হয় তাহলে পাঁচ সেকেন্ড সময় কম লাগবে। কিন্তু পাহাড় কেটে রাস্তা করতে রাষ্ট্রের ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকা।

হংকং রাষ্ট্রীয় পাঁচ সেকেন্ড সময় বাঁচানোর জন্য ১০০ কোটি টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রীয় সুষ্ঠু সময় ব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে, মেধা ও জাতীয় জীবনে সময়ের গুরুত্ব কম দিই বলেই আজো আমরা দরিদ্র ও অনুন্নত জাতি। আমরা অনেক সময় দেখতে পাই উচ্চপদের কর্মকর্তা, এমনকি সাধারণ কর্মী প্রায় ১ ঘণ্টা দেরিতে অনুষ্ঠানে বা কর্মস্থলে পৌঁছে। সময় ব্যবস্থাপনার জ্ঞান, কৌশল সচেতনতা সৃষ্টি হলে অবশ্যই আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ও সাফল্য অর্জন দ্রুততর হবে।

তাই সবাইকে সময়ের সঠিক ব্যবহার ও সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অর্জন করে পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তি সাফল্য থেকেই ধাপে ধাপে পরিবার, সমাজ ও দেশের সাফল্য নিশ্চিত হবে। আমরা সময় বাঁচাতে পারি টিভি কম দেখে, নাটকের সিরিয়াল কম দেখে, মোবাইলের ব্যবহার কমিয়ে ও আড্ডায় সময় কম দিয়ে। আমাদের সমাজের তরুণ-তরুণী, গৃহিণী ও ছাত্রছাত্রীদের সময় অনেক বেশি নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি অভিভাবকদেরও ভেবে দেখতে হবে। সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিবস, মাস আর কিছু বছরের সমষ্টি হচ্ছে আমাদের জীবন। এই জীবনকে আলোকিত করতে সময়ের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। চার্লস ডিকেন্স বলেন, ‘বড় হতে হলে সর্বপ্রথম সময়ের মূল্য দিতে হবে।’

সুতরাং আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে হিসাব করে কাজে লাগাতে হবে। আর এ জন্য চাই একটি পরিকল্পিত রুটিন আর গোছালো জীবন। কিন্তু তা কখন থেকে? অবশ্যই এখন থেকে। কেননা প্রবাদ আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়।’ আর জীবনে বড় কিছু করতে হলে তা শুরু করতে হবে উপযুক্ত সময়ে। কারণ, আল্লাহর রাসূল সা: সমাজ সংস্কারে হিলফুল ফুজুল গড়ে তুলেছিলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। আইনস্টাইন ১৬ বছর বয়সেই আপেক্ষিক মতবাদ নিয়ে প্রথম চিন্তা করেন, যা পরবর্তীকালে ২৬ বছর বয়সে প্রমাণ করেন।

১৯৩৫ সালে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে দশম শ্রেণীর ১৪ বছরের যে বালকটি তার ২০-২৫ মিনিটের ভাষণে সব জাঁদরেল বক্তাকে মাত করে দিয়েছিলেন, ৩৭ বছর পর তিনিই হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৩১ সালে সপ্তম শ্রেণীর যে ছেলেটি বোম্বাই ক্রনিক্যাল পত্রিকা আয়োজিত ভারতবর্ষব্যাপী চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনিই পরবর্তীকালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন হয়েছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে আজ যাকে লোকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য উদগ্রীব, কালই তার অবস্থা দেখে অশ্রু বর্ষণ করার প্রয়োজন হতে পারে যদি সে সময়ের অব্যবস্থাপনা করে। সুতরাং হাতে যেই দিনটি আছে সেটিকে কাজে লাগাতে হবে।