ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সা:-এর দর্শন ও তাৎপর্য

মানুষ ঘুমিয়ে থেকে এমন অনেক কিছু দেখে, যা জাগ্রত অবস্থায় দেখে না। একে খাব বা খোয়াব বলা হয়। খুলাসাতুত তাফসির গ্রন্থে রয়েছে- স্বপ্নে মানুষের রূহ ঊর্ধ্বজগৎ ও নিম্নজগতে ভ্রমণ করে এবং জাগ্রতাবস্থায় যা দেখা যায় না, তা দেখতে থাকে। একে হিছছে রূহানি বা আত্মিক অনুভূতি বলা যায়। হিছছে জিসমানি বা শারীরিক অনুভূতি দ্বারা শুধু দৃশ্যমান বিষয় অনুধাবন করা যায়। পান্তরে হিছছে রূহানির মাধ্যমে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় অবস্থা অনুধাবন ও অনুভব করা যায়।

এ কারণে স্বপ্নে এমন সব অবস্থা সামনে আসে, যা স্বপ্নদর্শনকারীকেই বিস্ময়াভিভূত করে। ফলে কখনো আনন্দদায়ক আবার কখনো ভয়ঙ্কর দৃশ্যাবলি মস্তিষ্কে উদয় হয়। তবে জেগে ওঠার সাথে সাথেই এসব ভাবনা আবার কোথায় যেন মিলে যায়। কুরআন পাকের বিভিন্ন আয়াতে স্বপ্ন প্রসঙ্গে আলোচনা এসেছে। হাদিস শরিফেও রাসূলুল্লাহ সা: স্বপ্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। এসব থেকে জানা যায়, স্বপ্ন একটি বাস্তব বিষয়। নবীদের স্বপ্ন ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের স্বপ্ন যদিও শরিয়তের দলিল হিসেবে বিবেচিত নয়, তবুও তা আসমানি ফয়েজ ও নবুওয়াতি বরকতেরই একটি অংশ।

হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, সুস্বপ্ন নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের এক ভাগ। ‘ইলমে নবুওয়াত’, অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন ইলমে নবুওয়াতের একটি অংশ (বুখারি ও মুসলিম)। ওই বর্ণনার প্রতি ল করলে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সা: ভালো স্বপ্নের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা প্রকাশ করেছেন এবং একে নবুওয়াতের জ্যোতি বলে আখ্যা দিয়েছেন।

উপমহাদেশের সর্বজনমান্য মনীষী হজরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ: সুস্বপ্নের নয়টি প্রকার বর্ণনা করেছেন-
১. নবীজী সা:’কে স্বপ্নে দেখা;

২. জান্নাত বা জাহান্নাম দেখা;

৩. নেককার ব্যক্তিবর্গ বা আম্বিয়ায়ে কেরাম আ:’কে দেখা;

৪. বরকতময় স্থান, যেমন- কাবা শরিফ দেখা;

৫. ভবিষ্যতে ঘটিবত্য কোনো ঘটনা স্বপ্নে দেখা, এরপর তা তেমনই ঘটে যাওয়া। যেমন, কোনো গর্ভবতী নারীর পুত্রসন্তান জন্ম নিতে দেখা এবং পরে তা বাস্তবেও হওয়া।

৬. ঘটে যাওয়া কোনো অজানা ঘটনা স্বপ্নে দেখা, যেমন- কারো মৃত্যু হতে দেখা এবং পরে মৃত্যুর খবর আসা; ৭. কোনো চারিত্রিক দোষের প্রতি সতর্কীকরণমূলক স্বপ্ন দেখা। যেমন- কেউ দেখল তাকে কুকুরে কামড়াচ্ছে। এর তাবির হলো- সে বদমেজাজি। অতএব, তার উচিত ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা;

৮. কোনো জ্যোতির্ময় ও পবিত্র বিষয় স্বপ্নে দেখা। যেমন- দুধ, মধু বা ঘি পান করতে দেখা;

৯. স্বপ্নে কোনো ফেরেশতা দেখা (হুজ্জাতুলাহিল বালিগাহ পৃষ্ঠা-২৫৩)।

হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: রাসূলুল্লাহ সা:-এর ইরশাদ বর্ণনা করেন।
শেষ রাতের স্বপ্ন অধিক সত্য হয়ে থাকে; কেননা এ সময় মনমস্তিষ্ক স্থির ও চিন্তামুক্ত থাকে। এ সময় মানসিক স্থিরতা অর্জন হয়। শুধু তাই নয়, বরং এটা ফেরেশতাগণের অবতীর্ণ হওয়ার, সৌভাগ্য এবং দোয়া কবুল হওয়ার সময়ও বটে। এ জন্যই এ সময়ে দেখা স্বপ্ন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সত্য হয়ে থাকে; তবুও কোনো স্বপ্নের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলা যায় না যে, এ স্বপ্ন সত্য এবং এর বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী। কারণ সুস্বপ্ন আল্লাহ পাকের প থেকে শুধুই পথনিদের্শনা হয়ে থাকে, শরিয়তের দলিল হয় না; স্বপ্নে দেখা বিষয় যখন বাস্তবায়িত হয়ে যায়, তখন দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে স্বপ্নটি সত্য ছিল। তবে মনে রাখা উচিত, যদি কেউ রাসূলুলাহ সা:কে স্বপ্নে দেখে তাহলে সে স্বপ্ন সত্য। এতে মিথ্যা বা শয়তানি প্রবঞ্চণার কোনো অবকাশ নেই।

হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত রাসূলুলল্লাহ সা: বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে প্রকৃতপে আমাকেই দেখল, কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না (মেশকাত : ৩৯৪)।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর পবিত্র শরীরের আকৃতি শয়তান ধারণ করতে পারে না। সুতরাং যে ব্যক্তিই রাসূলুল্লাহ সা:কে স্বপ্নে দেখল, সে বাস্তবেই তাকে দেখল। এটা স্বপ্নদর্শনকারী ব্যক্তির খোদাভীতি, বেলায়াত এবং আল্লাহ পাকের নিকটবর্তিতার দলিল।

আলাহ পাক ওই ব্যক্তির কোনো কাজে সন্তুষ্ট হয়ে দয়া ও অনুগ্রহ করে তাকে নবীজী সা:-এর দিদার নসিব করেছেন। অবশ্য মুহাক্কিক আলেম ও শরিয়তের দুরদর্শী ব্যক্তিরা ‘রাসূলুল্লাহ সা:’কে স্বপ্নে দেখা কখন গ্রহণযোগ্য হবে- এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। কোনো আলেমের মতে, হাদিস শরিফে রাসূল সা:-এর যে শারীরিক আকৃতির বর্ণনা দেয়া হয়েছে, সেই আকৃতিতেই যদি দেখা যায়, তো দৃঢ় বিশ্বাসের সাথেই বলা যায় যে সে রাসূলুল্লাহ সা:কেই দেখেছে। এ কারণে বর্ণিত আছে- মুহাম্মদ ইবনে সিরীনের (যিনি তাবির শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন) কাছে যদি কেউ রাসূলুল্লাহ সা:-এর দর্শন সম্পর্কে নিজের স্বপ্ন বর্ণনা করত, তখন তিনি সে ব্যক্তির দেখা আকার-আকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন। যদি সে বলতে না পারত, তবে তিনি তাকে বলে দিতেন ‘যাও! তুমি রাসূলুল্লাহ সা:কে স্বপ্নে দেখোনি।

এ সম্পর্কে মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইমাম নববি রহ:-এর মত হলো- যে ব্যক্তি রাসূল সা:কে স্বপ্নে দেখল, সে প্রকৃতপে রাসূল সা:কেই দেখেছে, সে হাদিসে বর্ণিত আকৃতিতে দেখে থাকুক কিংবা অন্য কোনো আকৃতিতে দেখে থাকুক। কেননা আকার-আকৃতির পরিবর্তনে মূল ব্যক্তির পরিবর্তন হওয়া অপরিহার্য নয়। এ ছাড়া এ বিষয়ের প্রতিও ল রাখা উচিত যে, আকার-আকৃতির ভিন্নতা স্বপ্নদর্শনকারীর ঈমানের পূর্ণতা ও স্বল্পতার কারণেও হতে পারে। অর্থাৎ কেউ যদি রাসূলুলাহ সা:কে উত্তম আকার-আকৃতিতে দেখে থাকে, তাহলে এটা তার ঈমানের পূর্ণতা ও আকিদা-বিশ্বাসের একনিষ্ঠতার আলামত বলে বিবেচিত হবে। আর কেউ যদি এর বিপরীত দেখে থাকে, তাহলে ঈমানের দুর্বলতা ও আকিদা-বিশ্বাস নিখাদ না হওয়ার আলামত বলে বিবেচিত হবে। তেমনি কোনো ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:কে বার্ধক্যাবস্থায় দেখল, আর কেউ যুবক দেখল, কেউ তাঁকে সন্তুষ্ট দেখল, আর কেউ দেখল অসন্তুষ্ট, একজন দেখল ক্রন্দনরত আর অন্যজন দেখল আনন্দিত; আবার কেউ দেখল দুঃখিত। এসব অবস্থা স্বপ্নদর্শনকারীর ঈমানি অবস্থার ভিন্নতা ও পার্থক্যের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে।

যে ব্যক্তি যে স্তরের ইমানদার সে তার অনুরূপ আকৃতিতে দর্শন করে থাকে। এ বিবেচনায় রাসূল সা:কে স্বপ্নে দেখা নিজের ঈমানের পরিমাপ করার একটি মানদণ্ড। এ কারণে বিষয়টি সালেকিনে তরিকত বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি কার্যকর ও উপকারী বিষয় বলে বিবেচিত হয়- যাতে তারা নিজেদের বাতেনি, অর্থাৎ আত্মিক অবস্থা জেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় ইসলাহ ও সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে (মাজাহিরে হক জাদিদ ৫/৩১৭)।

এ সম্পর্কে আহলে হক আরো স্পষ্ট করেছেন যে- ‘রাসূলুল্লাহ সা:’কে স্বপ্নে দেখার অর্থ এই নয় যে, তার ওপর সেসব হুকুম আরোপিত হবে যা বাস্তবে রাসূলুল্লাহ সা:কে দর্শন করলে এবং তাঁর সংস্পর্শ লাভ করলে হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই ব্যক্তি না কোনো সাহাবির মর্যাদা লাভ করবে আর না তার ওপর ওই নির্দেশ অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক হবে- যা সে রাসূলুল্লাহ সা: থেকে স্বপ্নে শুনেছে।

মোট কথা, সে ব্যক্তি সত্যিই ভাগ্যবান ও খোশ নসিব, যিনি দোজাহানের সরদার মুহাম্মদ সা:কে কমপে স্বপ্নে হলেও দর্র্শন করেছেন। এটা তো তার জন্য মহানেয়ামত ও পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার! একইভাবে অন্যান্য ভালো স্বপ্ন দেখাটাও আনন্দ ও খুশির বিষয়। এটাকে আল্লাহ পাকের প থেকে সুসংবাদ বলে মনে করা উচিত, যা মানুষের মনমস্তিষ্ককে প্রকৃতভাবেই উৎফুল্ল ও আন্দোলিত করে।