ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হজের অবসরে

পবিত্র মক্কা-মদিনায় এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেগুলোর এক দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব, অন্য দিকে সেগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য নবী রাসূলের মহান স্মৃতি। পবিত্র কুরআনের মর্মবাণী উপলব্ধি ও ইতিহাসকে নিখুঁতভাবে বোঝার জন্য এসব জায়গায় ভ্রমণ খুবই উপযোগী। তবে মনে রাখতে হবে, এ ভ্রমণ হজের কোনো আহকাম নয়।

গারে সওর : এখানে মহানবী সা: হিজরতের সময় হজরত আবুবকর রা:-কে নিয়ে তিন দিন আত্মগোপন করে ছিলেন এবং যেখানে মহানবী সা:-কে রক্ষার জন্য অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। মহানবী সা:-কে হত্যার জন্য যখন শত্রুরা নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে হন্যে হয়ে ঘুরছিল, হিজরতের সেই সঙ্কটময় মুহূর্তেও এ গুহায় মহানবী সা: ছিলেন আল্লাহর সাহায্যের ওপর পূর্ণ আস্থাশীল ও দুশ্চিন্তাহীন। এ ঘটনা ও মহানবী সা:-এর চরিত্রের বিবরণ পবিত্র কুরআনে এসেছে এভাবে- ‘তোমরা যদি নবীকে সাহায্য না করো, তাহলে কোনো পরোয়া নেই। আল্লাহ তাকে এমন সময় সাহায্য করেছেন, যখন কাফেররা তাকে বের করে দিয়েছিল, যখন তিনি ছিলেন মাত্র দু’জনের মধ্যে দ্বিতীয় জন, যখন তারা দু’জন গুহার মধ্যে ছিলেন, তখন তিনি তার সাথীকে বলেছিলেন : চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন’ (সূরা আত-তাওবা : ৪০)।

এ পাহাড়ে ওঠা খুব কষ্টসাধ্য। সওয়াবের নিয়তে ওঠা বেদআত। তবে মহানবী সা: দ্বীনের জন্য কত কষ্ট করেছিলেন তা উপলব্ধির জন্য উঠতে পারেন। সুঠাম দেহের অধিকারী না হলে চেষ্টা না করে পাহাড়ের নিচ থেকে দেখাই ভালো।

আরাফাতের বিশাল ময়দান : ৯ জিলহজ এখানে হাজীদের একত্র হতে হয়। ওই দিন এখানে আসা ও অবস্থান করা ফরজ। বিশাল এ ময়দানে দেখতে পারবেন, দেখতে পাবেন মসজিদে নামিরা। এটা একটা বরকতময় ময়দান। হাদিস থেকে জানা যায়, আরাফাতের দিনেই (৯ জিলহজ) সর্বাধিক মানুষকে নাজাত দেয়া হয়।

মুজদালিফা : হাজিরা ৯ জিলহজ এখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন (৯ জিলহজ দিবাগত রাতে)। এখানে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করেন। পবিত্র কুরআনে হজের সময় যে ‘মাসয়ারুল হারামে’র কাছে এসে আল্লাহর জিকির (স্মরণ) করতে বলা হয়েছে তা এই ময়দানেই রয়েছে (দেখুন, সূরা বাকারা, আ: ১৯৮)। হজের সফরে রাতে এ ময়দানকে ভালো করে দেখা যায় না।

মিনা : এটা মক্কার কাছেরই একটি স্থান। হজের ইহরাম বেঁধে এখানে এসে ৮ জিলহজ জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ৯ জিলহজ ফজর আদায় করতে হয় এবং সকালে এখান থেকেই আরাফাতের উদ্দেশে রওনা করতে হয়। আবার ১০ জিলহজ এখানে ফিরে এসে কোরবানি করতে হয় ও জামারায় পাথর মারতে হয়। এখানে ১১ ও ১২ জিলহজও অবস্থান করতে হয় জামারাগুলোতে পাথর মারার জন্য। বর্তমানে এখানে হাজার হাজার স্থায়ী তাঁবু তৈরি করা আছে হাজীদের অবস্থানের জন্য। এখানেই রয়েছে মসজিদে আল খায়ফ। হজের সফরে হাজী সাহেবরা যখন মিনায় অবস্থান করেন, তখন এখানে নামাজের বিশাল জামাত হয়। এ মিনাতেই হজরত ইবরাহিম আ: তাঁর রবের জন্য ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে আল্লাহর বন্ধু (খলিলুল্লাহ) হওয়ার পরম সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, আর তার প্রাণপ্রিয় ছেলে হজরত ইসমাইল আ: আল্লাহর হুকুমের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়ে পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। পিতা-পুত্রের এ অতুলনীয় ত্যাগের ঘটনা আল্লাহ কোরবানির চিরন্তন বিধান ও ওহির মাধ্যমে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন (দেখুন, সূরা সাফফাত, আ: ১০২-১১১)।

মসজিদে জিন : এক দিন এখানে মহানবী সা:- নামাজ আদায়কালে আকাশপথে গমনরত একদল জিন কুরআনের অভিনবত্ব ও সুমধুর সুরে আকৃষ্ট হয়ে থমকে যায় এবং এ ঘটনা তারা তাদের জাতির কাছে গিয়ে ব্যক্ত করে। এরই বিবরণ এসেছে কুরআনে, ‘(হে নবী) বলুন : আমার প্রতি ওহি নাজিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করেছে, অতঃপর (ফিরে গিয়ে নিজ জাতির লোকদের) বলেছে : আমরা এক বিস্ময়কর ‘কুরআন’ শ্রবণ করেছি ; যা সত্য ও সঠিক পথের নির্দেশনা দেয়, তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি এবং আমরা আর কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরিক করব না’ (সূরা জিন : ১-২)।

জাবালে নূর : এ পাহাড়ে আছে প্রথম ওহি নাজিলের সেই ঐতিহাসিক হেরা গুহা। অনেক উঁচুতে এ গুহা, শক্তি ও সময় থাকলে উঠতে পারেন। উঠলে যে কষ্ট হবে তাতে বুঝতে পারবেন মানবতার মুক্তির নিমিত্তে নিবিড় ধ্যানের জন্য মহানবী সা: কত কষ্ট করেছিলেন। এখানে ওহিবাহক জিবরাইল আ: মহানবী সা:-কে প্রথম ওহি পৌঁছে দেন ‘পড়–ন, আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ুন, আপনার রব বড় মেহেরবান, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না’ (সূরা আলাক : ১-৫)।

সময় থাকলে অন্য একদিন মক্কা জাদুঘর, গিলাফ তৈরির কারখানা ও লাইব্রেরি দেখে আসতে পারেন। কোনো একদিন নামাজের পর মসজিদুল হারামের অল্প দূরে পায়ে হেঁটেই জান্নাতুল মা’আলা (কবরস্থান) জিয়ারত করে আসুন। এখানে মা খাদিজাসহ অনেক সাহাবি ও ইসলামি মনীষীর কবর রয়েছে।
মদিনার উল্লেখযোগ্য স্থান : আমাদের দেশের হাজীরা সাধারণত মদিনায় আট দিন অবস্থান করেন এবং মসজিদে নববীতে একাধারে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। তাই কোনো একদিন সকালে মুয়াল্লিমের ব্যবস্থাপনায় অথবা সমমনা কয়েকজন মিলে একজন গাইড নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়তে পারেন। কী দেখবেন?

ওহুদ পাহাড় ও ওহুদ যুদ্ধের স্থান : এখানেই সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ওহুদ যুদ্ধ। সূরা আল ইমরানের একটা উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে এ যুদ্ধের পর্যালোচনা। এখানে হজরত হামজা রা:-এর কবর রয়েছে। ওই তো ওহুদ পাহাড়! ওখানের গিরিপথেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন রাসূল সা: পঞ্চাশজন যোদ্ধাকে। রাসূল সা: বলেছিলেন, জয়-পরাজয়ের সাথে তোমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত জীবন গেলেও এ পথ ছাড়বে না। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে কাফেররা যখন প্রায় হেরে যাচ্ছিল এবং পশ্চাৎপসরণ করছিল, তখন ওই পঞ্চাশজনের অনেকেই দলনেতার আদেশ উপেক্ষা করে বিজয়কে সুনিশ্চিত ভেবে গনিমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি কাফের দলের সেনাপতি। তিনি মুসলমানদের এ দুর্বল অবস্থা দূর থেকে আঁচ করলেন এবং পলায়নের অভিনয় করে পাহাড় ঘুরে মুসলমানদের পেছন দিক থেকে আক্রমণ করলেন। প্রায় নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া হলো মুসলমানদের। রাসূল সা:-এর সত্তরজন প্রিয় সাহাবি শহীদ হলেন, রাসূল সা:-এর চাচা হামজা রা:ও শহীদ হলেন; শুধু তা-ই নয়, রাসূল সা: স্বয়ং আহত হলেন। রাসূল সা:-কে বাঁচাতে জানবাজ সাহাবারা শত্রুদের তীরগুলো ঢালের মতো বুক পেতে নিয়েছিলেন।

খন্দক : এখানে খন্দকের যুদ্ধ হয়েছিল। মহানবী সা: এ যুদ্ধে হজরত সালমান ফারসি রা:-এর প্রস্তাবিত পারস্য যুদ্ধকৌশল (শত্রু আগমনের পথে গভীর খাদ খনন) অবলম্বন করে মক্কার কাফেরদের হতভম্ব ও হতোদ্যম করে দিয়েছিলেন। এ থেকে সাথীদের যুক্তিসঙ্গত মতামত গ্রহণে মহানবী সা:-এর উন্নত মানসিকতা ও তাঁর আধুনিকমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়, একই সাথে যুদ্ধে সর্বাধুনিক কৌশল অবলম্বনও জরুরি বলে বিবেচিত হয়।

মসজিদে কুবা : হিজরতের পরে মহানবী সা: মদিনা শহরে প্রবেশের আগে শহরতলির এ পল্লীতে কয়েক দিন অবস্থান করেছিলেন। মহানবী সা: মদিনার মসজিদে কুবায় নামাজ আদায়কে এক ওমরাহর সমান সওয়াবের সাথে তুলনা করেছেন। তাই এখানে অন্তত একবার যাওয়া ও কিছু নামাজ আদায়ের চেষ্টা একটি বরকতময় কাজ।

মসজিদে কেবলাতাইন : এ মসজিদে দু’টি কেবলার চিহ্ন বর্তমান। একদিন জিবরিল আমিন কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশসংবলিত ওহি নিয়ে এলেন এবং মহানবী সা: তা আমল করলেন। ওই দিন ওই নামাজের জামাতের এক মুসল্লি তার মহল্লায় (মসজিদে কেবলাতাইনে) গিয়ে দেখলেন, সাহাবিরা আগের মতো বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করছেন। তিনি সোৎসাহে সরবে কেবলা পরিবর্তনের ঘোষণা দিলে নামাজরত সাহাবিরা পুরো জামাতসহ বিপরীত দিকে অর্থাৎ কাবার দিকে ঘুরে গেলেন। যেহেতু এ মসজিদে একই নামাজে মুসল্লিরা একদিন দুই দিকে ফিরে নামাজ পড়েছিলেন, এ জন্য এ মসজিদকে বলা হয় মসজিদে কেবলাতাইন (দুই কেবলার মসজিদ)। সূরা বাকারার ১৭ ও ১৮ রুকুতে রয়েছে কেবলা পরিবর্তনসংক্রান্ত নির্দেশনা ও পর্যালোচনা। ফজরের পর বের হলে এসব স্থান দেখে দুপুরে এসে মসজিদে নববীতে জোহরের জামাত ধরতে পারবেন।

জান্নাতুল বাকি : মসজিদে নববীর সন্নিকটেই এ গোরস্থান। এখানে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান রা:, উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা:, মা ফাতেমা রা:সহ অনেক জলিল কদর সাহাবি ও ইসলামি মনীষীর কবর রয়েছে।

মদিনায় কর্মরত আপনার পরিচিত যোগ্য কোনো লোকের মাধ্যমে মসজিদে নববীর প্রশাসনের পদস্থ কোনো কর্মকর্তার সাথে যোগসূত্র তৈরি করতে পারলে সংরক্ষিত বিশেষ কক্ষে প্রিয়নবী সা:-এর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি- জুব্বাহ, পাগড়ি, আংটি, লাঠি, তৎকালীন বিভিন্ন বাদশাহ ও গোত্রপ্রধানদের কাছে লেখা মহানবী সা:-এর চিঠিপত্র ও সন্ধিপত্রের মূল কপিগুলো দেখার দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ করতে পারবেন। উল্লেখ্য, এগুলো সাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।

এ ছাড়া সময় থাকলে এবং উপযুক্ত সাথী পেলে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, খেজুরবাগান, বাদশাহ ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স ঘুরে আসতে পারেন। তবে যেখানেই যান ফরজ নামাজ মসজিদে নববীতেই আদায়ের চেষ্টা করুন। মক্কা-মদিনায় যেখানেই ঘুরতে যাবেন, শিরক ও বিদআত থেকে মুক্ত থাকুন। আমাদের দেশে দেখে দেখে ইসলামের নামে কোনো বদ রসম রপ্ত হয়ে থাকলে, তা ওখানে গিয়ে একেবারে ভুলে যান। শিরক-বেদআতমুক্ত স্বচ্ছ ও মজবুত ঈমান নিয়ে দেশে ফিরে আসুন।