ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হারাম আয়ের পরিণাম ভালো হয় না

ধন-সম্পদ উপার্জনের জন্য প্রচেষ্টা মানুষের সহজাত প্রকৃতি। ইসলাম এটিকে মন্দ বলেনি, বরং এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্য জোরালো তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যায়-অন্যায় এবং হালাল-হারামের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়ে অন্যায় ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হলো, দুনিয়ার এই জীবন ক্ষণস্থায়ী। চিরস্থায়ী জীবন হলো মৃত্যুর পরের অনন্ত অসীম আখেরাতের জীবন। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই একজন মুসলমানের উচিত, অনন্ত অসীম আখেরাতের জীবনের জন্য সঞ্চয়কে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সঞ্চয়ের ওপর সবক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এমনটি হওয়ার কথা থাকলেও ঠিক এর বিপরীত চিত্রটাই এখন প্রায় সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আকার ধারণ করতে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, কোনো ধরনের বাছ-বিচার ছাড়াই অবৈধ ধন-সম্পদ অর্জনের যে প্রতিযোগিতা বর্তমানে আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা ক্রমেই মহামারীর আকার ধারণ করছে।

ব্যবসায়ীরা মাপে কম দিয়ে, খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে, সুযোগ বুঝে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে ভোক্তাদের প্রতারিত ও নিষ্পেষিত করছেন। অফিস-আদালতে আমলারা ফাইল আটকে রেখে উেকাচ গ্রহণ করে ফাইলের চাকা সচল করছেন। বিচার-সালিশে, তদবির বাণিজ্যের নামে দেদারসে ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। গ্যামলিং করে শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করে দেয়া হচ্ছে। দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সামান্য একজন রিকশাচালককে পর্যন্ত সুযোগ বুঝে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া হাঁকতে দেখা যাচ্ছে।

টপ টু বটম—সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত। বাদ নেই কোনো ক্ষেত্রই। এগুলোই আমাদের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তব চিত্র। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দাংশও জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না।’ —সূরা বাকারা : ১৮৮

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরকারকরা বলেন, এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তোমরা যখন অন্যের সম্পদ অবৈধভাবে আত্মসাত্ কর, তখন এ কথা চিন্তা করবে যে, অন্যেরও নিজ সম্পদের প্রতি তেমনই ভালোবাসা রয়েছে, যেমন তোমাদের নিজেদের ধন-সম্পদের প্রতি তোমাদের ভালোবাসা রয়েছে। তারা যদি তোমার সম্পদে এমনই অবৈধ হস্তক্ষেপ করে, তাহলে তোমার যেমন কষ্ট অনুভব হবে, তেমনিভাবে তাদের ক্ষেত্রেও তুমি একই রকম কষ্ট অনুভব কর, যেন এটাও তোমারই সম্পদ।

এক হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, হজরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আবেদন করলেন, আমার জন্য দোয়া করে দিন, আমি যাতে ‘মকবুলুদ্দোয়া’ (যার দোয়া কবুল হয়) হতে পারি। আমি যে দোয়াই করব, তাই যেন কবুল হয়ে যায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সা’দ! নিজের খাবারকে হালাল ও পবিত্র করে নাও, তাহলেই ‘মুস্তাজাবুতদাওয়াত’ হয়ে যাবে। আর সে সত্তার কসম করে বলছি, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ—বান্দা যখন নিজের পেটে হারাম লোকমা ঢোকায়, তখন চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার কোনো আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। আর যার শরীর হারাম মাল দিয়ে গঠিত, তার শরীর জাহান্নামেরই উপযুক্ত।—বায়হাকি

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, একবার রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভাষণে ইরশাদ করেছেন, হে মুহাজিরিনের দল! কয়েকটি অভ্যাসের ব্যাপারে আমি আল্লাহর দরবারে পানাহ চাই। সেগুলো যেন তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি না হয়ে যায়! তার একটি হলো, যখন কোনো জাতির মধ্যে মাপে কারচুপি করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়, তখন তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ, মূল্যবৃদ্ধি, রোগ-শোক এবং জনগণের উপর শাসকশ্রেণীর অত্যাচার-নিপীড়ন চাপিয়ে দেয়া হয়।—ইবনে মাজা

আমাদের এই বিচিত্র সমাজে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করে অনেককে দান-সদকা করতেও দেখা যায়। অথচ এ ব্যাপারে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি ওই আল্লাহর শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ—কোনো মানুষ যখন নিজের হারাম সম্পদ থেকে ব্যয় (দান-সদকা) করে, আল্লাহ তার দান কবুল করেন না। যদি সে সম্পদ ভবিষ্যত্ বংশধরদের জন্য রেখে যায়, তবে তা তার জাহান্নামের রাস্তাকেই মসৃণ করবে।—মুসলিম

অবৈধ ধন-সম্পদ অর্জনকারীদের জন্য দুনিয়া এবং আখেরাত উভয়ই কণ্টকাকীর্ণ। অন্যায় কাজ পরিত্যাগের জন্য মানুষের সামান্য সদিচ্ছাই যথেষ্ট। আমরা মুসলমান হিসেবে একটি বারের জন্যও কি চিন্তা করতে পারি না যে, এই জীবনই আমার শেষ জীবন নয়। হাশরের ময়দানে খোদ শাহানশাহ আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমার অর্জিত প্রতিটি পয়সার পাই-পাই হিসাব আমাকে দিতেই হবে। তবুও কি আমরা নিবৃত্ত হব না!