ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হারাম সম্পদ থেকে অবমুক্তি

হারাম সম্পদ থেকে অবমুক্তিমহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন : ‘তোমরা পরস্পর একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং এই উদ্দেশ্যে বিচারকের কাছে সে সম্পর্কে মিথ্যা মামলা রুজু করো না যে, মানুষের সম্পদ থেকে কোনো অংশ জেনে-শুনে গ্রাস করার গোনাহে লিপ্ত হবে।’ (সূরা বাকারা : আয়াত-১৮৮)

কোরআনে কারিমের এই আয়াতে হারাম পন্থায় সম্পদ অর্জন এবং তা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা বেশি জোরালো ও পূর্ণাঙ্গ ভাষ্যে বিবৃত হয়েছে।

এমনিতে প্রায় প্রতিটি জাতি ও ধর্মবিশ্বাসেই এ বিষয়ে একমত যে, সম্পদ উপার্জনের একটি জুঁতসই ও বৈধ পদ্ধতি থাকা এবং এক্ষেত্রে কিছু নিষিদ্ধ ও অগ্রহণযোগ্য পদ্ধতি থাকা বাঞ্ছনীয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ চুরি, ডাকাতি, ধোঁকা-প্রতারণাসহ এজাতীয় অপরাধমূলক কর্ম সারা দুনিয়ার কাছে দোষণীয় ও পরিত্যাজ্য। কিন্তু উপার্জন মাধ্যম বৈধ-অবৈধ এবং জায়েজ-নাজায়েজ হওয়ার এমন কোনো মাপকাঠি কোনো সম্প্রদায়ের কাছে থাকতেও পারে যা সমগ্র দুনিয়ার মানুষ একবাক্যে মেনে নিতে পারে। যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও গৃহীত হতে পারে।

এর সঠিক ও যথার্থ মাপকাঠি একমাত্র সেটিই হতে পারে, যা মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছে। কেননা জগতস্রষ্টা আল্লাহ তায়ালাই নিজ বান্দাদের প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল হতে সক্ষম। এ কারণেই শান্তির ধর্ম ইসলাম হালাল-হারাম, জায়েজ-নাজায়েজের যে বিধিবিধান ও নিয়মনীতি দিয়েছে, তা সরাসরি আল্লাহ তায়ালার ওহি থেকেই সংগৃহীত কিংবা কোনো না কোনোভাবে তা ওহির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই বিধিবিধানের পদে পদেই এই বিষয়টির প্রতি গভীর লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, কোনো মানবসত্তাই যেন নিজের চেষ্টা-প্রচেষ্টার আলোকে জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই যেন বঞ্চিত না থাকে।

আবার কোনো ব্যক্তিই যেন অন্যের অধিকার লুণ্ঠন করে অন্যদের যেন ক্ষতির সম্মুখীন করতে না পারে। সেই সঙ্গে সম্পদ যেন কুক্ষিগত হয়ে কিছু মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধও না হয়ে যায়। বরং কারও যে সম্পদই অর্জিত হয় তা যেন খোদায়ি বিধানের আলোকে এবং জায়েজ ও বৈধ তরিকায় হয়। উল্লিখিত আয়াতে ওইসব অবৈধ পন্থার আলোচনাই সুস্পষ্ট ভাষ্যে উচ্চারিত হয়েছে। এতে সুদ, জুয়া, ঘুষ, ভেজাল, ধোঁকা-প্রতারণা, মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমাসহ অবৈধ-নাজায়েজ সব মাধ্যমের আমদানির কথাই বলা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা এসব বিষয়কে নাজায়েজ সাব্যস্ত করে এরশাদ করেছেন : ‘তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ গ্রাস করো না।’আয়াতে একটি বিষয় তো বেশ লক্ষণীয়। কেননা কোরআনে কারিম ‘নিজেদের সম্পদ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার প্রকৃত অর্থ হলো, ‘নিজেদের সম্পদ ভক্ষণ করো না।’ এতে ইঙ্গিত একথার দিকেই করা হয়েছে যে, তোমরা যারা অন্য কারও সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করছ, তো তোমরা এ বিষয়টিও একটু চিন্তা কর যে অন্য ব্যক্তিরও তার নিজের সম্পদের প্রতি ভালোবাসা ও আকর্ষণ তেমনি থাকবে, যেমন তোমার নিজেরও তোমার নিজ সম্পদের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে।

যদি সে তোমার সম্পদে এমনি অবৈধ হস্তক্ষেপ করত তাহলে তোমার যেমন কষ্ট লাগত, ঠিক একইভাবে অন্যেরও সেই কষ্ট হবে। তুমি এই বিষয়টি তখনই যথার্থভাবে অনুধাবন করতে পারবে, যখন সেই সম্পদ তোমার হবে। এছাড়া আয়াতের এই শব্দের দ্বারা সেদিকেও ইঙ্গিত হতে পারে যে, যখন এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ করে থাকে, আর সামাজিকভাবে এমন প্রচলনই বর্তমান যুগে ব্যাপক হারে প্রচলিত, তাহলে এর স্বাভাবিক রেজাল্ট এটিই দাঁড়াবে, অন্য মানুষও তার সম্পদে একইভাবে অবৈধ হস্তক্ষেপে এগিয়ে আসবে। এই হিসেবে যে কারও সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপ বাস্তবে নিজ সম্পদে অবৈধ হস্তক্ষেপের পথকেই খুলে দেয়।

চিন্তা করলেই দেখা যাবে, যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা দেখা দেবে তখন এমনটি হয়ে থাকে যে, এক ব্যক্তি ঘি’র ভেতর চর্বি কিংবা তেল মিশিয়ে অতিরিক্ত পয়সা উপার্জন করে থাকেন, কিন্তু আবার যখন তার দুধ কেনার প্রয়োজন হয় তখন দুধ বিক্রেতা তাতে পানি মিশিয়ে দিয়ে থাকে। মসলার প্রয়োজন হলে তাতেও ভেজাল মিশ্রিত থাকে, ওষুধ কিনতে গেলেও দেখা যায় তাতেও সেই ভেজাল মিশ্রিত। এভাবে সে নিজে ভেজাল মিশিয়ে যে অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন করেছে, অন্যরাও একইভাবে ভেজাল দিয়ে তার চেয়ে আরও বেশি সম্পদ তার কাছ থেকেও নিয়ে নিয়েছে। এই বেচারা নিজে অন্যকে ঠকিয়ে অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন করে খুশিতে আটখানা। কিন্তু পরিণাম ফল কী তা সে কখনোই চিন্তা করে দেখেনি।

তার পকেটও যে উজাড় হয়ে যাচ্ছে, সে তা কখনও অনুভবও করেনি। বাস্তবতা ও প্রকৃত সত্য হলো, যে কেউ অন্যের সম্পদ অবৈধ পন্থায় অর্জন করলে সে যে তার নিজের সম্পদেই অবৈধ হস্তক্ষেপ করে বসেছে, তা সে নিজেও টের পাচ্ছে না। বরং এর দ্বারা কেবল অবৈধ হস্তক্ষেপের দ্বারই উন্মুক্ত হচ্ছে।

এমনিতেই নাজায়েজ মাধ্যমে আমদানি সব সময় এবং সব যুগেই একটি অবৈধ বিষয়। কিন্তু স্বর্ণালি পবিত্র কোনো যুগে এবং পবিত্র কোনো স্থানে তাতে জড়িয়ে গেলে তার অনিষ্টতা ও ভয়াবহতা বহুগুণেই বেড়ে যায়। বিশেষত রমজানের মুবারক মাসে এহেন কর্মে জড়িয়ে যাওয়া মারাত্মক অন্যায়ের কাজ। কেননা এই পবিত্র মাসে একজন মুসলমান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালনের খাতিরে বৈধ এবং জায়েজ কাজকেও (যেমন পানাহার) ছেড়ে দিয়ে থাকে। সুতরাং এটি বড়ই লজ্জার বিষয় যে, যেসব কাজ সবসময়ই হারাম ছিল তা বর্জন না করা। সুতরাং এই পবিত্র মাসে হালাল খাবার গ্রহণে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল উপার্জন করার জন্য কোরআনে কারিমে বিভিন্ন পন্থা ও পদ্ধতিতে সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। এক আয়াতে এ বিষয়ের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মানুষের ক্রিয়াকর্মে এবং আখলাক চরিত্রে হালাল খাবার গ্রহণের বিরাট প্রভাব রয়েছে। যার খাবার হালাল নয় তার সুন্দর আখলাক-চরিত্র এবং উত্তম আমলের আশা করা যায় না। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে : ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তুগুলো থেকে (যা ইচ্ছা) খাও, সত্কর্ম কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আমি সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।’ [সূরা মুমিনুন- আয়াত-৫১)

এই আয়াতে হালাল খাবার গ্রহণের সঙ্গে সত্কর্মের নির্দেশ দিয়ে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সত্কর্ম সম্পাদন তখনই সম্ভব যখন মানুষের পানাহার হালাল হয়। হজরত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদিসে ইরশাদ করেছেন, হারাম খাবার গ্রহণকারীর দোয়া আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না। ইরশাদ করেন, বহু মানুষই কষ্ট স্বীকার করে ইবাদত-বন্দেগিতে রত থাকে; অতঃপর আল্লাহ তায়ালার দরবারে দু’হাত তুলে দোয়া মুনাজাতে লিপ্ত থাকে।

ইয়া রব ইয়া রব বলে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি-আহাজারি করতে থাকে; কিন্তু আহার-খাবার হারাম সম্পদ থেকে অর্জিত, তার পোশাক-আশাক সবকিছু হারাম সম্পদের, তবে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে? হজরত মাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাযি.) মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দরখাস্ত করলেন, আমার জন্য এই দোয়া করে দিন, যেন আমার সব দোয়াই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে মাআদ! নিজের পানাহার ও খাবার-দাবার হালাল এবং পবিত্র বানিয়ে নাও, অবশ্যই তোমার দোয়া কবুল হতে থাকবে। আমি ওই সত্তার শপথ করে বলছি, যার নিয়ন্ত্রণে মুহাম্মদের (সা.) জীবন, বান্দা যখন স্বীয় হারাম লোকমা উদরস্থ করে তখন চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার কোনো দোয়া কবুল হয় না। আর যে ব্যক্তির গোশত হারাম সম্পদ দ্বারা বৃদ্ধি পেয়েছে, ওই গোশতের জন্য তো জাহান্নামের আগুন-ই উপযুক্ত।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হারাম সম্পদ থেকে এবং অন্যের সম্পদ গ্রাস করার মানসিকতা থেকে হেফাজত করুন। আর পুরোপুরি হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন!