ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হেরা গুহায় মুহাম্মদ সা:

বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: এই সুন্দর পৃথিবীতে আগমনের পর থেকেই বিশ্বমানবতার জন্য এমন সব কাজ শুরু করেন, যা হয়ে উঠতে থাকে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। মাত্র ১৭ বা ২০ বছর বয়সে আরবদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা ভয়ঙ্কর ও মশহুর ফুজ্জারের যুদ্ধে ন্যায়ের পে অবস্থান নিয়ে মহানবী সা: সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটান। যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ও অন্যায়-অবিচারে নিমজ্জিত আরব জাতিকে অশান্তির দাবানল থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে মহানবী সা: হিলফুল ফুজুল সঙ্ঘের মাধ্যমে দুর্বল ও নিপীড়িতদের নিরাপত্তা এবং সমাজ থেকে উচ্ছৃঙ্খলতা দমন ও অসহায়ের ফরিয়াদের প্রতিকারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

৩৫ বছর বয়ঃক্রমকালে কুরাইশদের কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণে নিযুক্ত বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। রক্তারক্তির আশঙ্কাও দেখা দেয়। মহানবী সা:-এর উপস্থিত হস্তেেপর ফলে ব্যাপারটি অতি সহজে মিটমাট হয়ে যায়। তাঁর নম্র স্বভাব, অনাড়ম্বর চালচলন, জীবনযাত্রার কঠোর পবিত্রতা, সুমার্জিত ভদ্রতা, দরিদ্র ও দুর্বলের সাহায্যার্থে সদা প্রস্তুত মন, অটল সততা ও কঠোর কর্তব্যবোধের জন্য স্বদেশবাসীর কাছে তিনি পেয়েছিলেন সম্মানিত ও ঈর্ষনীয় আখ্যা ‘আল আমিন’ বা বিশ্বাসী।

অবর্ণনীয় নৈতিক ও সামাজিক অধঃপতন, বিবদমান ধর্মমত ও গোত্রগুলোর বাড়াবাড়ি ও হাতে তৈরি দেবতার পূজা, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবরস্থকরণ, হিংসাবিদ্বেষ ও বিবাদ-বিসম্বাদে জর্জরিত আরব জাতির ভয়ঙ্কর অবস্থা দর্শন সর্বোপরি গুটিকতক লোক, যারা ভালো হওয়ার প্রত্যয়ে মহানবী সা:-এর সান্নিধ্যে ছিলেন, তাদের হতাশা দর্শনে মহানবী সা: মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙে পড়েছিলেন।

৪০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ধ্যান ও প্রার্থনার জন্য মহানবী সা: নিঃসঙ্গতাপ্রিয় হয়ে উঠলেন। ফলে নির্জনতার অনুসন্ধান করতে গিয়ে হেরাগুহায় উপনীত হন। মক্কা শরিফের পূর্ব দিকে বায়তুল্লাহ শরিফ থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত জাবালে নূরের হেরাগুহায় প্রথমবার গমনকালে কিছু খাদ্যসামগ্রী সাথে করে নিয়ে যান। অতঃপর এটি তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়। তিনি কিছু দিন পর বাড়িতে ফিরতেন এবং দু-এক দিন অবস্থান করে কিছু খাদ্যসামগ্রী সাথে করে ওই গুহায় ফিরে যেতেন। বিভিন্ন পাথরের সমন্বয়ে তৈরী গুহাটি ছিল ছোট। এটি দৈর্ঘ্যে চার গজ, প্রস্থে পৌনে দুই গজ। নিচের দিকে গভীর নয়। ছোট একটি পথের পাশে ওপরের প্রান্তরের সঙ্গমস্থলে এ গুহা অবস্থিত।

মহানবী সা: এই গুহায় যাওয়ার সময় প্রিয়তমা স্ত্রী বিবি খাদিজা রা:ও মাঝে মধ্যে তাঁর সাথে যেতেন এবং কাছাকাছি কোনো জায়গায় অবস্থান করতেন। নবীজী পুরো রমজান মাস এই গুহায় কাটাতেন। যাওয়া-আসার পথে পথচারী মিসকিনদের খাবার খাওয়াতেন এবং গিরিগুহায় মগ্ন থাকতেন গভীর চিন্তায় অদৃশ্য অথচ সর্বব্যাপী বিশ্বপ্রভুর গভীর ধ্যানে। তিনি নিরন্তর রহস্যভেদের চেষ্টা করতেন সৃষ্টির, জীবন ও মরণের, ভালো ও মন্দের আর চেষ্টা করতেন বিশৃঙ্খলার ভেতরে সমন্বয় সাধনের। কিন্তু তাঁর সামনে সুস্পষ্ট কোনো পথ, সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি, প্রচলিত অবস্থার বিপরীত কোনো কর্মসূচি ছিল না, যার ওপর জীবন কাটিয়ে তিনি মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। মহানবী সা:-এর এ নিঃসঙ্গপ্রিয়তা ছিল প্রকৃতপে মহান আল্লাহর হেকমতের একটি অংশ। এমনিভাবে মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের গুরুদায়িত্বভার বহনের জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন।

রাত-দিনের আবর্তনে মহানবী সা: ৪০ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। ২১ রমজান মোতাবেক ১০ আগস্ট ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ সোমবার হেরাগুহায় তিনি যথারীতি ধ্যানমগ্ন ছিলেন। সহসা তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন হজরত জিব্রাইল আ:। তিনি বললেন, ‘পড়–ন’। মহানবী সা: বললেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’ অতঃপর জিব্রাইল আ: মহানবী সা:-কে সজোরে আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, ‘পড়–ন’। কিন্তু তিনি আগের জবাবেরই পুনরুক্তি করলেন। এমনিভাবে জিব্রাইল আ: তিনবার মহানবী সা:-কে আলিঙ্গন করে পড়ার জন্য বললেন। তৃতীয়বার ছেড়ে দিয়ে ‘ইকরা বিইসমি থেকে মালাম ইয়ালাম’ (পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি মানুষকে রক্তপিণ্ড হতে সৃষ্টি করেছেন। পাঠ করুন এবং আপনার প্রতিপালক মহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিা দিয়েছেন, যিনি মানুষকে শিখিয়েছেন সেসব, যা সে জানত না) পর্যন্ত পাঁচটি আয়াত পাঠ করেন এবং মহানবী সা:-কেও পড়তে বলেন। তখন মহানবী সা: ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিব্রাইল আ:-এর সাথে ওই আয়াতগুলো পাঠ করলেন। হজরত জিব্রাইল আ: এ পর্যন্ত শিা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

এই ঘটনার পর মহানবী সা: বাড়ি চলে এলেন। তখন তাঁর পবিত্র অন্তঃকরণে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছিল। তিনি কাঁপতে কাঁপতে হজরত খাদিজা রা:-কে বললেন, ‘আমাকে শিগগিরই কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও।’ খাদিজা রা: তাঁকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। অতঃপর কিছুটা শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে এলে তিনি খাদিজা রা:-এর কাছে সব ঘটনা প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘আমার নিজের জীবন সম্পর্কে ভয় হচ্ছে।’

খাদিজা রা: বললেন, ‘না, কখনোই নয়। আপনার জীবনে কোনো ভয় নেই। মহান আল্লাহ আপনার প্রতি বিমুখ হবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়দের হক আদায় করেন। সত্যবাদী ও নিষ্ঠাবান। অম লোকদের ভার বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নেন। গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করেন, পথিক-মুসাফিরদের মেহমানদারি করেন।’ তিনি আরো বললেন, ‘এ ঘটনাকে আপনি পরম শুভ লণ হিসেবে গ্রহণ করুন এবং অবিচল থাকুন। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণÑ তাঁর শপথ করে বলছি, আপনি এ যুগের মানবজাতির জন্য নবী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস।’ মহানবী সা:-এর জীবনসঙ্গিনীর এই স্যা তাঁর চারিত্রিক মহত্ত্ব, উন্নত চরিত্র এবং তাঁর সুন্দর আচরণেরই উজ্জ্বল প্রমাণ।

হজরত খাদিজা রা: এরপর মহানবী সা:-কে তাঁর চাচাতো ভাই খ্রিষ্টধর্মের পণ্ডিত ওয়ারাকা ইবনে নাওফলের কাছে নিয়ে যান। খাদিজা রা: মহানবী সা:-এর দেখা ও শোনা সব ঘটনা তাঁর কাছে আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। সব শুনে ওয়ারাকা বলে উঠলেন, ‘ইনিই তো সেই মহান মানুষ (দূত), যিনি আল্লাহর তরফ থেকে হজরত মুসা আ:-এর কাছে আগমন করেছিলেন। আমি স্যা দিচ্ছি যে, আপনি সেই নবী, মুসা আ: যার সুসংবাদ দিয়েছিলেন। আহা আমি যদি ততণ পর্যন্ত জীবিত থাকতাম (যখন জাতির) লোকেরা আপনার প্রতি অত্যাচার করবে এবং আপনাকে নিজ শহর থেকে বিতাড়িত করবে। তাহলে আমি আপনাকে পূর্ণ সহযোগিতা দান করতাম।

মহানবী সা: বললেন, ‘সত্যিই কি তারা আমাকে আমার জন্মভূমি থেকে বের করে দেবে?’ ওয়ারাকা বললেন, আল্লাহর কসম! আজ পর্যন্ত যিনিই এই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তাঁর সাথে তাঁর জাতি এরূপ আচরণই করেছে। অতঃপর ওয়ারাকা তাঁর কাছে মাথা এগিয়ে নিয়ে এলেন এবং তাঁর কপালে চুমু খেলেন। এই কয়টি আশা ও আস্থার বাক্য তাঁর বিুব্ধ হৃদয়ে সান্ত্বনা এনে দিয়েছিল। বিদায় নেয়ার পর তাওয়াফ সমাপ্ত করে মহানবী সা: বাড়ি ফিরে গেলেন। এর অল্প দিন পরই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন।

হেরাগুহায় মহানবী সা: যে আধ্যাত্মিক বেদনা, মানসিক সঙ্ঘাত, সন্দেহ, আশা ও আশঙ্কা নিয়ে ধ্যানে মগ্ন হয়েছিলেন, নবুওয়াত লাভে ধন্য হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। তিনি শুনতে পেলেন মহান আল্লাহর সেই বাণী, ‘হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠুন, আর সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।’ তারপর তিনি জেগে উঠলেন এবং যে কর্তব্যের প্রতি তাঁকে আহ্বান করা হয়েছে, তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিলেন