ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত মা

ma1প্রাক-ইসলামি যুগে নারীজাতির স্বাধীনতার সূর্য যখন ছিল প্রায় অস্তমিত, জালিম তথা শোষকের অত্যাচারে যখন নারীজাতি হয়ে পড়েছিল আকুল-ব্যাকুল, ঠিক এমনি এক সন্ধিণে বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি মহানবী সা: ‘মা’ হিসেবে একজন নারীর যে মর্যাদা দিয়েছেন তা সত্যিই অতুলনীয়। ‘মা’ হিসেবে নারীজাতির উন্নয়নে মহানবী সা: যে অবদান রেখেছেন, তা সর্বকালের সর্বযুগের সব মানবসমাজের জন্য অনুসরণযোগ্য উজ্জ্বল ভাস্বর হয়ে থাকবে চিরকাল।

আল্লাহর পরে যার অধিকার : পবিত্র কুরআনের স্থানে স্থানে মহান আল্লাহর অধিকারের সাথে সাথে মা-বাবার অধিকারের কথা বলা হয়েছে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের সাথে সাথে মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ারও নির্দেশ রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘(হে রাসূল সা:) আপনার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া আর কারো ইবাদাত না করতে এবং মা-বাবার সাথে সদাচারণ করতে। মা-বাবার মধ্যে একজন অথবা তারা দু’জনই বৃদ্ধ হয়ে গেলে (অবহেলা, উপো, ক্রোধ ও বিরক্তিতে) তাদেরকে ‘উহ্’ বোলো না, তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বোলো। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তাদের জন্য বিনয়ে দু’বাহু বিছিয়ে (বাড়িয়ে) দাও’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪॥

আয়াতদ্বয় দ্বারা এ কথাই স্পষ্ট হয়েছে যে, মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয়তম রাসূল মুহাম্মদ সা:-এর পর মা ও বাবার অধিকারই সর্বাধিক।

মা-বাবার গুরুত্ব : সন্তান-সন্ততির পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম হচ্ছে তার মা ও বাবা। মা-বাবার গুরুত্ব বুঝাতে যেয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অসীম কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। কাজেই তোমরা আমার প্রতি এবং তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও’ (সূরা লুকমান-১৪)।

হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি বলল : হে আল্লাহর রাসূল, আমার কাছে সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকার সবচেয়ে বেশি কার? মহানবী সা: বললেন, ‘মা’-এর। সে ব্যক্তি বলল, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার ‘মা’-এর। সে বলল, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার ‘মা’-এর। সে বলল, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার ‘বাবা’র (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের উপরিউক্ত বাণীদ্বয় দ্বারা মা-বাবার গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা যায়।

মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণ : আল্লাহর দ্বীন এবং আল্লাহর আনুগত্যের দাবিই হলো মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণ করা, তাদের অনুগত থাকা এবং সেবা করা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা: বলেছেন, আমি মহানবী সা:কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়? মহানবী সা: বললেন, ‘যে নামাজ সময়মতো পড়া হয়।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন কাজ সবচেয়ে বেশি প্রিয়? তিনি বললেন, ‘মা-বাবার সাথে সুন্দর আচরণ’ (বুখারি ও মুসলিম)।

মা-বাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন : সন্তানের অন্যতম কর্তব্য হচ্ছে, সে তার মা-বাবাকে সর্বদাই সম্মান প্রদর্শন করবে। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি মহানবী সা:-এর কাছে এসে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে বের হওয়ার অনুমতি চাইল। মহানবী সা: তাকে বললেন, তোমার কি মা জীবিত আছেন? সে বলল হ্যাঁ, তখন মহানবী সা: বললেন, ‘তার সেবা করো, তার পদতলে জান্নাত’ (সহিহ বুখারি)

মা-বাবার আনুগত্যের চূড়ান্ত রূপ : মহান আল্লাহর আনুগত্যের সাথে সাথে ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় মা-বাবার আনুগত্য করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বর্ণনা করেছেন, মহানবী সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি মা-বাবা সম্পর্কিত আল্লাহর নাজিলকৃত নির্দেশ এবং হেদায়াত অবস্থায় দিন শুরু করল, সে যেন নিজের জন্য জান্নাতের দু’টি দরজা খোলা অবস্থায় দিন শুরু করল। যদি মা-বাবার মধ্যে কোনো একজন হয় তাহলে যেন জান্নাতের একটি দরজা খোলা অবস্থায় পেল। আর যে ব্যক্তি মা-বাবা সম্পর্কিত আল্লাহর নির্দেশ ও হেদায়াত অমান্য করল, তাহলে তার জন্য জাহান্নামের দু’টি দরজা খোলা হবে। যদি মা-বাবার মধ্যে কোনো একজন হয় তাহলে যেন জাহান্নামের একটি দরজা খোলা অবস্থায় পেল। সে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি মা-বাবা তার সাথে বাড়াবাড়ি করে তাহলেও? তিনি বললেন, যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও। যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও। যদি বাড়াবাড়ি করে থাকেন তাহলেও (মিশকাত)।

মা-বাবার বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও সুন্দর আচরণের অর্থ হলো, যদি মা-বাবা কঠোর মেজাজ বা অন্যায়মূলক কোনো কাজের জন্য এমন সব দাবি করতে থাকেন, যা পূরণ করা সন্তানের জন্য কঠিন হয় অথবা সন্তানদের সহ্যের সীমার কথা চিন্তা না করে বেশি বেশি পরিশ্রম করাতে থাকেন অথবা সন্তানদের সামর্থ্যরে বাইরে অতিরিক্ত আর্থিক দাবি করতে থাকেন তাহলেও সন্তানদের উচিত নিজেদের আবেগ দমন করে তাদের সাথে সুন্দর আচরণ অব্যাহত রাখা।

মা-বাবার প্রতি অর্থনৈতিক সাহায্য : কুরআন ও হাদিসে যেভাবে মা-বাবার সেবা, আনুগত্য এবং সুন্দর আচরণের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তেমনি তাদের ওপর খরচ না করে ধনসম্পদ বাঁচানো সঠিক নয় বলেও তাকিদ দেয়া হয়েছে। বরং সর্বপ্রথম তাদের ওপরই খরচ করতে হবে। আর তারা যদি অভাবগ্রস্ত হন তাহলে প্রয়োজনে তারা জোর খাটাতেও পারবেন। যদি কেউ সেবা ও আনুগত্য করেন বটে কিন্তু আর্থিকভাবে সাহায্য না করেন তবে সেটা হবে চরম অন্যায়। যেভাবে সন্তানের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে তেমনি সন্তানের সম্পদের ওপরও তাদের অধিকার আছে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে রাসূল সা:! লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে। আপনি বলুনÑ কল্যাণকর যে ব্যয় তোমরা করবে, তা করবে মাতা-পিতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও পথচারীদের জন্য। (সূরা বাকারা-২১৫)

মা-বাবার অবাধ্যতার পরিণাম : কোনো অবস্থাতেই মা-বাবার অবাধ্য হওয়া যাবে না। অবাধ্য সন্তানের দুঃখজনক পরিণাম হচ্ছে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া। অবাধ্য সন্তানদের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে মহানবী সা: বলেন, ‘তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক’, বলা হলো কার এমন হোক ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি মা-বাবার উভয়কে বা একজনকে পাওয়ার পরও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’

মা-বাবার ইন্তেকালের পর করণীয় : মা-বাবা যেমন শিশু লালন-পালন ও প্রশিণের জন্য কষ্ট স্বীকার করেন এবং দিন-রাত তত্ত্বাবধান করেন তেমনি তাদের ইন্তেকালের পর সন্তানদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যেমন হজরত আবু উসাইদ রা: বলেন, আমরা মহানবী সা:-এর সেবায় উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! মা-বাবার মৃত্যুর পরও কি তাদের সাথে সুন্দর আচরণ অব্যাহত রাখতে পারি?’ মহানবী সা: বললেন, জি হ্যাঁ। চারটি পদ্ধতি রয়েছে-১. মা-বাবার জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার পড়া, ২. তাদের কৃত ওয়াদাগুলো এবং বৈধ ওসিয়ত পূরণ, ৩. পিতার বন্ধু-বান্ধব এবং মাতার বান্ধবীদের সাথে সুন্দর ব্যবহার এবং ৪. তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও সুন্দর আচরণ করা, যারা মা-বাবার দিক থেকে তোমাদের আত্মীয় হন’ (আদাবুল মুফরাদ)।

সর্বোপরি মহান আল্লাহর শেখানো দোয়া পড়া ‘হে প্রভু! শৈশবে তারা আমাদের যেমন লালন-পালন করেছেন, তুমি তাদের প্রতি তেমনি সদয় হও’ (সূরা বনি ইসরাইল-২৪)।

শেষ কথা : মহানবী সা: শুধু নারী জাতির মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিতই করেননি বরং ‘মা’ হিসেবে তাকে এক মহান সম্মানে সম্মানিত করেছেন। বাবা সংসারের অধীশ্বর হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের কাছে মায়ের সম্মান অনেক ঊর্ধ্বে। সন্তানের জন্য মায়ের অনেক কষ্ট করতে হয় বিধায় ইসলাম মাকে এমন মর্যাদা দিয়েছে।