ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত

মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশতএই পৃথিবীর আলো আমরা যাদের মাধ্যমে অবলোকন করেছি তারা হলেনÑ আমারে পিতা-মাতা। রক্তের আত্মীয়ের প্রথম সদস্য হলো পিতা-মাতা। জন্মের আগ থেকে পিতা-মাতার অনুগ্রহ শুরু। একজন শিশুকে পূর্ণ বয়সে পৌঁছাতে কী অবর্ণনীয় কষ্ট পিতা-মাতাকে সহ্য করতে হয় তা একমাত্র পিতা-মাতাই জানেন। শীতের কনকনে রাতের মধ্যভাগ বিছানায় প্রস্রাব কতোটা অসহনীয় তা বর্ণনাতীত। এমন সময়ও অতিক্রম হয় যে, পিতা-মাতা নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। কোলেপিঠে করে একজন আদর্শ মানুষ গড়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।

কুরআনের একস্থানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।’ লক্ষণীয় বিষয় যে, আল্লাহ তায়ালা নিজের ইবাদতের পাশাপাশি পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, ইবাদতের পরপরই তার উল্লেখ। এর একটু আগে বেড়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাদের (পিতা-মাতা) কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়। তবে তাদেরকে ‘উহ্’ শব্দটি বোলো না এবং তাদেরকে ধমকও দিও না। এবং তাদের সাথে ভালো ভালো কথা বলো।’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ২৩) আয়াতের বিষয়বস্তু ও বর্ণনা এতটাই সুস্পষ্ট যে, ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না।

সূরা লোকমানেও আল্লাহ তায়ালা নিজের শোকর আদায়ের সাথে সাথে পিতা-মাতার শোকর আদায়ের বিষয়টি এনেছেন। ঘোষণা হচ্ছে, ‘আমার শোকর আদায় করো, সাথে সাথে পিতামাতারও’। এতে প্রমাণিত হয় ইবাদতের পর পিতা-মাতার সেবাযতœ গুরুত্বের বিচারে অগ্রগামী। সহিহ বোখারীর একটি রেওয়াতের পক্ষে প্রমাণ হতে পারে। বর্ণিত আছে কোনো এক ব্যক্তি রাসূল সা: কে প্রশ্ন করল, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয়বস্তু কোনটি? রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘(মুস্তাহাব) সময় হলে নামাজ পড়া।’ সে আবার প্রশ্ন করল তারপর কোনটি? তিনি বললেন, ‘পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা।’

পিতা-মাতার সেবার ক্ষেত্রে পিতা-মাতা মুসলমান হওয়া জরুরি নয়। বোখারীর একটি রেওয়াত আছে। হজরত আসমা বিনতে আবু বকর রা: বর্ণনা করেন, ‘আমার মা আমার কাছে আসত, সে ছিল মুশরিক। এ ঘটনা ওই সময় যখন কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপিত হয়েছিল। আমি রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে আরজ করলাম ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার জননী আমার কাছে আসে আমি তার সাথে কী রূপ আচরণ করব। সে দ্বীন ইসলামের প্রতি অসন্তুষ্ট। আমি কী তার সাথে সদাচরণ করব? রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘হ্যাঁ! তার সাথে উত্তম আচরণ করবে।’

সূরা লোকমানের পনের আয়াতে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের বিষয়টি এভাবে এসেছে, ‘পিতা-মাতা যদি আল্লাহর সাথে শরিক করার আদেশ দেয় বা জবরদস্তি করে তাহলে এ আদেশ মানা যাবে না। তবে এ কারণে তাদের সাথে অসাধু ব্যবহার করা যাবে না।’ ঘোষণা হচ্ছে, ‘পিতা-মাতা তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয় শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে যে এ সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবসহ অবস্থান করবে।’ (সূরা লোকমান আয়াত : ১৫)

হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার অবাধ্যতার পরিণতি : হজরত রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘তার নাসিকা ধুলোয় মলিন হোক। এভাবে তিন বার বললেন (এটা একটি আরব) কথ্যরূপ এর দ্বারা কখনো সতর্ক করা হয় কখনো তিরস্কার করা) সাহাবায়ে কেরাম বললেন কার নাসিকা ধুলোয় মলিন হোক ইয়া রাসূলুল্লাহ? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতা কোনো একজনকে পেল অথবা উভয়জনকে পেল অথচ (তাদের খেদমত করে) যে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (মুসলিম)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা:  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, নিজের পিতামাতাকে গালি দেয়া কবিরা গোনাহ। সাহাবারা আরজ করলেন হে আল্লাহর রাসূল সা: মানুষ কি পিতা-মাতকে গালি দেয়? রাসূলুল্লাহ বললেন, ‘হ্যাঁ যে কোনো ব্যক্তি পিতা-মাতাকে গাল দিলো। সেও তার পিতা-মাকে গালি দিলো।’ (বোখারী মুসলিম)।

আল্লাহর সন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতা-মাতার সন্তুষ্টির ওপর। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ‘প্রতিপালক আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির ওপর এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির ওপর’ (তিরমিজি)। উল্লেখ্য, হাদিসে শুধু পিতার কথা উল্লেখ ছিল। হাদিসবিশারদরা এর পিতা-মাতা উদ্দেশ্য নিয়েছেন।

পিতা-মাতার অবাধ্যকারী বেহেশতে প্রবেশ করবে না। যদিও নিম্নোক্ত হাদিস নিয়ে ওলামাদের মধ্যে মতানৈক্য আছে তবে উপদেশ গ্রহণে বাধা নেই। ইবনে ওমর  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, উপকার খোটাদানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্যকারী, সদা মদ্যপ বেহেশতে যাবে না।’ ইবনে আব্বাস রা:  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় ভোর করল যে সে তার পিতা-মাতার ব্যাপারে আল্লাহর আদেশের অনুগত রয়েছে। তখন তার ওই ভোর এমতাবস্থায় হলো  যেন তার বেহেশতের দুটি দরজা খোলা থাকে। যদি একজন হয় তাহলে বেহেশতের একটি দরজা খোলা থাকে। আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় ভোর করল যে, সে তার পিতা-মাতার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে অপরাধী। তবে সে যেন এমনভাবে ভোর করল যে তার জন্য দোজখের দুটি দরজা খোলা থাকে। একজন হলে একটি দরজা খোলা থাকে। এমন সময় এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল যদি পিতা-মাতা সন্তানের প্রতি অত্যাচার করে। জবাবে রাসূল সা: যদিও তারা সন্তানের প্রতি অত্যাচার করে। যদিও তারা সন্তানের প্রতি অত্যাচার করে। যদিও তারা সন্তানের প্রতি অত্যাচার করে।’

হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার খেদমতের ফজিলত : হজরত আনাস রা:  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি স্বীয় জীবনের প্রশস্ততা ও মরণের বিলম্ব কামনা করে, সে যেন আত্মীয়স্বজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করে।’ (বোখারী মুসলিম) হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে বিশেষ করে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারে রিজিকের প্রশস্ততা ও মরণে বিলম্ব হয়।

মুসনাদে আহমদ তিরমিজি ইবনে মাজায় বিশুদ্ধ সনদে হজরত আবু দারদা  থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ যা বলেন, ‘পিতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা এখন তোমাদের ইচ্ছা এর হেফাজত কর বা বিনষ্ট করো।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত এমনটি রয়েছে। 

ইবনে আব্বাস  থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ যা বলেছেন, ‘যে সন্তান পিতা-মাতার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবে তার প্রত্যেক দৃষ্টিতে একটি মাকবুল হজের সওয়াব পাবে।  লোকেরা প্রশ্ন করল ইয়া রাসূলুল্লাহ যদি দিনে একশতবার দৃষ্টিপাত করে? জবাবে তিনি বললেন, দৈনিক একশতবার দৃষ্টি দিলেও প্রত্যেক দৃষ্টিতে একটি মাকবুল হজের সওয়াব পাবে।’ (তাফসিরে মারেফুল কুরআন বাংলা) 

পিতা-মাতার সেবাযতœ করার ক্ষেত্রে বয়সের কোনো সীমারেখা নেই। সদা সর্বদা তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা, সেবাযতœ করা, বিশেষ করে বৃদ্ধ সময়ে পিতা-মাতা সন্তানের সেবাযতেœর বেশি মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন। তখন সন্তানের পক্ষ  থেকে কোনো বিমুখতা প্রকাশ তাদের অন্তরে বড় ক্ষত পড়ে। এর সাথে সাথে বার্ধক্যের উপসর্গগুলো স্বভাবগতভাবে মানুষকে খিটখিট করে তোলে। বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে যখন বুদ্ধি-বিবেক আকল লোপ পায় তখন পিতা-মাতার সেবাযতœ সন্তানদের জন্য কঠিন হয়ে সৃষ্টি করে। কুরআন এসব অবস্থায় পিতা-মাতার খেদমত করার জোর তাগিদ দেয়ার সাথে সাথে শৈশবকালীন সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন তোমাদের বুদ্ধি-আকল লোপ ছিল তারাও তোমাদের যথেষ্ট পরিমাণ আদরযতœ করেছে।